ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

জমির লোভে জঠরছেঁড়া সম্পর্ক শেষ, মাকে খুনে ফাঁসাতে চেয়েছিলেন প্রতিপক্ষকে, মেয়ে চম্পা গ্রেফতার।


সৈয়দ মইনুল হোসেন
সৈয়দ মইনুল হোসেন
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৬

জমির লোভে জঠরছেঁড়া সম্পর্ক শেষ, মাকে খুনে ফাঁসাতে চেয়েছিলেন প্রতিপক্ষকে, মেয়ে চম্পা গ্রেফতার।
হত্যা রহস্য উম্মোচনে কিশোরগঞ্জে সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই।

​জমিই কি মানুষের বিবেক, নৈতিকতা আর ব্লাড-রিলেশন বা রক্তের বাঁধন কেড়ে নেয়? কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের এক লোমহর্ষক ও পৈশাচিক ঘটনা সেই প্রশ্নকেই আবারও নতুন করে সামনে নিয়ে এল। প্রতিপক্ষকে হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে বিতর্কিত সাড়ে তিন শতাংশ জমির মালিকানা চিরতরে পাকা করতে নিজের জন্মদাত্রী মাকেই নির্মমভাবে হত্যা করলেন মেয়ে। শুধু তা-ই নয়, হত্যার পর নিখোঁজ নাটক তৈরি করে, পরবর্তীতে নিজে বাদী হয়ে প্রতিপক্ষের পাঁচজনের নামে হত্যা মামলা ঠুকে দিয়ে যেন তৈরি করেছিলেন এক নিখুঁত চিত্রনাট্য। কিন্তু আইনের চোরাবালি থেকে শেষরক্ষা হয়নি শেষ পর্যন্ত। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সুচতুর ও দীর্ঘ তদন্তে ফাঁস হয়ে গেছে সেই নৃশংস জালিয়াতি ও হত্যাকাণ্ডের আসল নেপথ্য।

​বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুরে কিশোরগঞ্জ জেলা পিবিআই কার্যালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই শিউরে ওঠার মতো চাঞ্চল্যকর খবরের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ। এর আগেই এ ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ও নিহতের গর্ভজাত মেয়ে চম্পা বেগমকে (৪৮) গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের জালে ধরা পড়ার পর আদালত চত্বরে বিচারকের সামনে ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নিজের জন্মদাত্রী মাকে নিজ হাতে শ্বাসরোধ করে হত্যার রোমহর্ষক বিবরণ দিয়েছেন তিনি।

​ঘটনার সূত্রপাত ২০২৩ সালের মার্চে। করিমগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত সিন্ড্রিফ গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী হালিমা বেগম ও তার প্রতিবেশী বিল্লাল হোসেনের মধ্যে মাত্র সাড়ে তিন শতাংশ জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র বিরোধ ও চরম রক্তক্ষয়ী শত্রুতা চলছিল। স্থানীয় সালিশ-দরবার এমনকি থানা-পুলিশ পর্যন্ত গড়ায় এই বিরোধ। ​ঘটনার ঠিক ১৫ দিন আগে জমি সংক্রান্ত ওই বিরোধের জেরে বিল্লাল ও তার লোকজনের সঙ্গে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে হালিমা বেগম শারীরিক লাঞ্ছনা ও হামলার শিকার হন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মায়ের অবস্থা দেখেই মাথায় শয়তানি বুদ্ধি খেলে যায় মেয়ে চম্পা বেগমের। তিনি বুঝতে পারেন, এই মুহূর্তটিকেই যদি কাজে লাগানো যায়, তবে এক ঢিলে দুই পাখি মারা সম্ভব— একদিকে শত্রু বিল্লাল চিরতরে জেলখানায় পচবে, অন্যদিকে বিরোধপূর্ণ জমির শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত হয়ে যাবে চম্পার নামে। ​পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ রাতে করিমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন মা হালিমা বেগমকে ‘জমি বিরোধের মীমাংসা করার কথা’ বলে হাসপাতাল থেকে বাড়ি নিয়ে আসার ছলনা করেন চম্পা ও তার গোপন সহযোগীরা। সেদিন রাত নেমে এলে রহস্যজনকভাবে নিজের বাড়ি থেকেই হালিমা বেগম উধাও হয়ে যান। চারদিকে রটে যায়, প্রতিপক্ষ বিল্লাল হয়তো চড়াও হয়ে তাকে গুম করেছে। পরদিন, অর্থাৎ ১৪ মার্চ সকালে বাড়ি থেকে মাত্র ৩০০ গজ দূরের নির্জন একটি পতিত জমিতে পড়ে থাকতে দেখা যায় হালিমা বেগমের রক্তাক্ত নিথর দেহ। স্থানীয়দের দেয়া খবরের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে যখন মরদেহ উদ্ধার করে, তখন দৃশ্যটি ছিল অতীব করুণ। হালিমার গলায় শক্ত করে পেঁচানো ছিল রশি এবং মুখমণ্ডল ও মাথায় ছিল গুমোট আঘাতের চিহ্ন।​ঘটনার পরপরই কান্নাকাটিতে ভেঙে পড়ার অভিনয় করেন নিহতের মেয়ে চম্পা বেগম। মায়ের 'নৃশংস খুনের সুবিচার' চেয়ে তিনি নিজেই বাদী হয়ে থানায় ছুটে যান এবং প্রতিবেশী বিল্লালসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর এলাকায় চম্পার প্রতি সহানুভূতি বাড়ে, অন্যদিকে মূল আসামি হিসেবে অভিযুক্ত বিল্লাল ও তার পরিবার গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। প্রথম দৃষ্টিতে সবাই ধরে নিয়েছিল, প্রতিপক্ষ বিল্লালের সন্ত্রাসী বাহিনীই হালিমা বেগমকে হত্যা করে প্রতিশোধ নিয়েছে। ​হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট বিচার নিশ্চিত করতে ও প্রকৃত অপরাধীদের সনাক্ত করতে মামলাটির তদন্তের দায়িত্বভার দেওয়া হয় পিবিআই কিশোরগঞ্জ জেলা শাখাকে। তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মো. আশরাফুল আলমের নেতৃত্বে একটি চৌকস দল ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটনে মাঠে নামে।্য​তদন্তভার গ্রহণের পর থেকেই পিবিআই কর্মকর্তারা মামলার বাদীর (চম্পা বেগম) বয়ান এবং তার সার্বিক আচার-আচরণে সূক্ষ্ম কিছু অসংগতি ও অস্বাভাবিকতা লক্ষ করেন। একজন মা খুন হওয়ার পর মামলার বাদী হিসেবে চম্পা যেভাবে তথ্য দিচ্ছিলেন, তার সাথে সংগৃহীত আলামত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছিল না। বিশেষ করে, হাসপাতাল থেকে রিলিজ না নিয়ে হালিমা বেগমকে গভীর রাতে কেন গোপন স্থানে নেওয়া হলো, সে বিষয়ে চম্পার উত্তর ছিল অস্পষ্ট ও সন্দেহজনক। ​পিবিআইয়ের তদন্ত দল সুনির্দিষ্ট কিছু বৈজ্ঞানিক ও তথ্যপ্রযুক্তিগত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হয় যে, এটি সাধারণ কোনো শত্রুতামূলক হত্যাকাণ্ড নয়; বরং এতে বাদীর নিজস্ব পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ যোগসাজশ রয়েছে।​সন্দেহের দানা বাঁধার পর চম্পা বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পিবিআই কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া হয়। নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়ে চম্পা আর তার মিথ্যার জাল বজায় রাখতে পারেননি। পিবিআইয়ের পোড় খাওয়া কর্মকর্তাদের একের পর এক প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়ে একপর্যায়ে ভেঙে পড়েন তিনি এবং কান্নাভেজা কণ্ঠে স্বীকার করেন— প্রতিপক্ষ বিল্লালকে ফাঁসিয়ে জমি নিজের নামে নিশ্চিত করার লোভেই তিনি নিজ জন্মদাত্রী মাকে সহযোগীদের নিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেছেন!​পরবর্তীতে তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে তোলা হলে তিনি বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি দিতে রাজি হন। চম্পা বেগম বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে বলেন,​"হাসপাতাল থেকে মাকে বাড়ি নিয়ে আসার পথেই সহযোগীদের সাথে কথা পাকা হয়। প্রতিপক্ষ বিল্লালের ওপর ইতোমধ্যে যেহেতু হামলার অভিযোগ ছিল, তাই এই মুহূর্তে মা মারা গেলে পুরো দায় বিল্লালের কাঁধে গিয়ে পড়বে। এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইনি। রাতে গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে মা-কে মেরে ফেলা হয়, তারপর মুখমণ্ডলে আঘাত করে লাশ পতিত জমিতে ফেলে আসা হয়।"

​বৃহস্পতিবার দুপুরে কিশোরগঞ্জ পিবিআই কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ বলেন,​"জমি পাওয়ার পথ সুগম করতে এবং প্রতিপক্ষকে চিরতরে শেষ করে বা শায়েস্তা করতে চম্পা বেগম নিজের মাকে নির্মমভাবে বলির পাঁঠা হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। একটি সুপরিকল্পিত চিত্রনাট্যের মাধ্যমে তিনি খুনের পর মামলাটি দায়ের করেন। কিন্তু অপরাধী যত চতুরই হোক না কেন, সত্য কখনোই চিরতরে ঢাকা থাকে না। পিবিআইয়ের নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক তদন্তের মাধ্যমে আজ এই পৈশাচিক সত্য উন্মোচিত হয়েছে।" ​সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই কর্মকর্তা আরও জানান, এই হত্যাকাণ্ডে চম্পার সঙ্গে আর কোন কোন সহযোগী বা ভাড়াটে অপরাধী যুক্ত ছিল, তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তদন্তের সার্বিক অগ্রগতি শেষে খুব শীঘ্রই আদালতে চার্জশীট জমা দেওয়া হবে। সংবাদ সম্মেলনে তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিদর্শক মো. আশরাফুল আলমসহ অন্যান্য পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

​সামান্য সাড়ে তিন শতাংশ জমির লালসায় মেয়ের হাতে মায়ের এই মর্মান্তিক ও পৈশাচিক খুনের ঘটনা প্রকাশিত হওয়ার পর কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জসহ পুরো জেলা জুড়ে চরম ক্ষোভ, ঘৃণা ও থমথমে নীরবতা বিরাজ করছে। স্থানীয় অধিবাসীরা বলছেন, রক্তের সম্পর্ক যেখানে নিরাপদ নয়, সেখানে সমাজের নৈতিক মূল্যবোধ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে! তারা এই নির্মম ঘাতক চম্পা ও তার দোসরদের দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোরতম শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


জমির লোভে জঠরছেঁড়া সম্পর্ক শেষ, মাকে খুনে ফাঁসাতে চেয়েছিলেন প্রতিপক্ষকে, মেয়ে চম্পা গ্রেফতার।

প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

​জমিই কি মানুষের বিবেক, নৈতিকতা আর ব্লাড-রিলেশন বা রক্তের বাঁধন কেড়ে নেয়? কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের এক লোমহর্ষক ও পৈশাচিক ঘটনা সেই প্রশ্নকেই আবারও নতুন করে সামনে নিয়ে এল। প্রতিপক্ষকে হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে বিতর্কিত সাড়ে তিন শতাংশ জমির মালিকানা চিরতরে পাকা করতে নিজের জন্মদাত্রী মাকেই নির্মমভাবে হত্যা করলেন মেয়ে। শুধু তা-ই নয়, হত্যার পর নিখোঁজ নাটক তৈরি করে, পরবর্তীতে নিজে বাদী হয়ে প্রতিপক্ষের পাঁচজনের নামে হত্যা মামলা ঠুকে দিয়ে যেন তৈরি করেছিলেন এক নিখুঁত চিত্রনাট্য। কিন্তু আইনের চোরাবালি থেকে শেষরক্ষা হয়নি শেষ পর্যন্ত। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সুচতুর ও দীর্ঘ তদন্তে ফাঁস হয়ে গেছে সেই নৃশংস জালিয়াতি ও হত্যাকাণ্ডের আসল নেপথ্য।

​বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুরে কিশোরগঞ্জ জেলা পিবিআই কার্যালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই শিউরে ওঠার মতো চাঞ্চল্যকর খবরের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ। এর আগেই এ ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ও নিহতের গর্ভজাত মেয়ে চম্পা বেগমকে (৪৮) গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের জালে ধরা পড়ার পর আদালত চত্বরে বিচারকের সামনে ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নিজের জন্মদাত্রী মাকে নিজ হাতে শ্বাসরোধ করে হত্যার রোমহর্ষক বিবরণ দিয়েছেন তিনি।

​ঘটনার সূত্রপাত ২০২৩ সালের মার্চে। করিমগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত সিন্ড্রিফ গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী হালিমা বেগম ও তার প্রতিবেশী বিল্লাল হোসেনের মধ্যে মাত্র সাড়ে তিন শতাংশ জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র বিরোধ ও চরম রক্তক্ষয়ী শত্রুতা চলছিল। স্থানীয় সালিশ-দরবার এমনকি থানা-পুলিশ পর্যন্ত গড়ায় এই বিরোধ। ​ঘটনার ঠিক ১৫ দিন আগে জমি সংক্রান্ত ওই বিরোধের জেরে বিল্লাল ও তার লোকজনের সঙ্গে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে হালিমা বেগম শারীরিক লাঞ্ছনা ও হামলার শিকার হন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মায়ের অবস্থা দেখেই মাথায় শয়তানি বুদ্ধি খেলে যায় মেয়ে চম্পা বেগমের। তিনি বুঝতে পারেন, এই মুহূর্তটিকেই যদি কাজে লাগানো যায়, তবে এক ঢিলে দুই পাখি মারা সম্ভব— একদিকে শত্রু বিল্লাল চিরতরে জেলখানায় পচবে, অন্যদিকে বিরোধপূর্ণ জমির শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত হয়ে যাবে চম্পার নামে। ​পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ রাতে করিমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন মা হালিমা বেগমকে ‘জমি বিরোধের মীমাংসা করার কথা’ বলে হাসপাতাল থেকে বাড়ি নিয়ে আসার ছলনা করেন চম্পা ও তার গোপন সহযোগীরা। সেদিন রাত নেমে এলে রহস্যজনকভাবে নিজের বাড়ি থেকেই হালিমা বেগম উধাও হয়ে যান। চারদিকে রটে যায়, প্রতিপক্ষ বিল্লাল হয়তো চড়াও হয়ে তাকে গুম করেছে। পরদিন, অর্থাৎ ১৪ মার্চ সকালে বাড়ি থেকে মাত্র ৩০০ গজ দূরের নির্জন একটি পতিত জমিতে পড়ে থাকতে দেখা যায় হালিমা বেগমের রক্তাক্ত নিথর দেহ। স্থানীয়দের দেয়া খবরের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে যখন মরদেহ উদ্ধার করে, তখন দৃশ্যটি ছিল অতীব করুণ। হালিমার গলায় শক্ত করে পেঁচানো ছিল রশি এবং মুখমণ্ডল ও মাথায় ছিল গুমোট আঘাতের চিহ্ন।​ঘটনার পরপরই কান্নাকাটিতে ভেঙে পড়ার অভিনয় করেন নিহতের মেয়ে চম্পা বেগম। মায়ের 'নৃশংস খুনের সুবিচার' চেয়ে তিনি নিজেই বাদী হয়ে থানায় ছুটে যান এবং প্রতিবেশী বিল্লালসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর এলাকায় চম্পার প্রতি সহানুভূতি বাড়ে, অন্যদিকে মূল আসামি হিসেবে অভিযুক্ত বিল্লাল ও তার পরিবার গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। প্রথম দৃষ্টিতে সবাই ধরে নিয়েছিল, প্রতিপক্ষ বিল্লালের সন্ত্রাসী বাহিনীই হালিমা বেগমকে হত্যা করে প্রতিশোধ নিয়েছে। ​হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট বিচার নিশ্চিত করতে ও প্রকৃত অপরাধীদের সনাক্ত করতে মামলাটির তদন্তের দায়িত্বভার দেওয়া হয় পিবিআই কিশোরগঞ্জ জেলা শাখাকে। তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মো. আশরাফুল আলমের নেতৃত্বে একটি চৌকস দল ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটনে মাঠে নামে।্য​তদন্তভার গ্রহণের পর থেকেই পিবিআই কর্মকর্তারা মামলার বাদীর (চম্পা বেগম) বয়ান এবং তার সার্বিক আচার-আচরণে সূক্ষ্ম কিছু অসংগতি ও অস্বাভাবিকতা লক্ষ করেন। একজন মা খুন হওয়ার পর মামলার বাদী হিসেবে চম্পা যেভাবে তথ্য দিচ্ছিলেন, তার সাথে সংগৃহীত আলামত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছিল না। বিশেষ করে, হাসপাতাল থেকে রিলিজ না নিয়ে হালিমা বেগমকে গভীর রাতে কেন গোপন স্থানে নেওয়া হলো, সে বিষয়ে চম্পার উত্তর ছিল অস্পষ্ট ও সন্দেহজনক। ​পিবিআইয়ের তদন্ত দল সুনির্দিষ্ট কিছু বৈজ্ঞানিক ও তথ্যপ্রযুক্তিগত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হয় যে, এটি সাধারণ কোনো শত্রুতামূলক হত্যাকাণ্ড নয়; বরং এতে বাদীর নিজস্ব পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ যোগসাজশ রয়েছে।​সন্দেহের দানা বাঁধার পর চম্পা বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পিবিআই কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া হয়। নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়ে চম্পা আর তার মিথ্যার জাল বজায় রাখতে পারেননি। পিবিআইয়ের পোড় খাওয়া কর্মকর্তাদের একের পর এক প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়ে একপর্যায়ে ভেঙে পড়েন তিনি এবং কান্নাভেজা কণ্ঠে স্বীকার করেন— প্রতিপক্ষ বিল্লালকে ফাঁসিয়ে জমি নিজের নামে নিশ্চিত করার লোভেই তিনি নিজ জন্মদাত্রী মাকে সহযোগীদের নিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেছেন!​পরবর্তীতে তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে তোলা হলে তিনি বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি দিতে রাজি হন। চম্পা বেগম বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে বলেন,​"হাসপাতাল থেকে মাকে বাড়ি নিয়ে আসার পথেই সহযোগীদের সাথে কথা পাকা হয়। প্রতিপক্ষ বিল্লালের ওপর ইতোমধ্যে যেহেতু হামলার অভিযোগ ছিল, তাই এই মুহূর্তে মা মারা গেলে পুরো দায় বিল্লালের কাঁধে গিয়ে পড়বে। এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইনি। রাতে গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে মা-কে মেরে ফেলা হয়, তারপর মুখমণ্ডলে আঘাত করে লাশ পতিত জমিতে ফেলে আসা হয়।"

​বৃহস্পতিবার দুপুরে কিশোরগঞ্জ পিবিআই কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ বলেন,​"জমি পাওয়ার পথ সুগম করতে এবং প্রতিপক্ষকে চিরতরে শেষ করে বা শায়েস্তা করতে চম্পা বেগম নিজের মাকে নির্মমভাবে বলির পাঁঠা হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। একটি সুপরিকল্পিত চিত্রনাট্যের মাধ্যমে তিনি খুনের পর মামলাটি দায়ের করেন। কিন্তু অপরাধী যত চতুরই হোক না কেন, সত্য কখনোই চিরতরে ঢাকা থাকে না। পিবিআইয়ের নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক তদন্তের মাধ্যমে আজ এই পৈশাচিক সত্য উন্মোচিত হয়েছে।" ​সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই কর্মকর্তা আরও জানান, এই হত্যাকাণ্ডে চম্পার সঙ্গে আর কোন কোন সহযোগী বা ভাড়াটে অপরাধী যুক্ত ছিল, তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তদন্তের সার্বিক অগ্রগতি শেষে খুব শীঘ্রই আদালতে চার্জশীট জমা দেওয়া হবে। সংবাদ সম্মেলনে তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিদর্শক মো. আশরাফুল আলমসহ অন্যান্য পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

​সামান্য সাড়ে তিন শতাংশ জমির লালসায় মেয়ের হাতে মায়ের এই মর্মান্তিক ও পৈশাচিক খুনের ঘটনা প্রকাশিত হওয়ার পর কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জসহ পুরো জেলা জুড়ে চরম ক্ষোভ, ঘৃণা ও থমথমে নীরবতা বিরাজ করছে। স্থানীয় অধিবাসীরা বলছেন, রক্তের সম্পর্ক যেখানে নিরাপদ নয়, সেখানে সমাজের নৈতিক মূল্যবোধ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে! তারা এই নির্মম ঘাতক চম্পা ও তার দোসরদের দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোরতম শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ