কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের একরামপুর মোড় থেকে স্টেশন রোড হয়ে গাইটাল পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার সড়ক পাড়ি দিতে এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগছে। বৈধ-অবৈধ যানবাহনের চাপ, সড়কের ওপর গড়ে ওঠা স্ট্যান্ড, ফুটপাত দখল এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় প্রতিদিনই দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন শহরের বাসিন্দারা।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন জরুরি রোগী ও তাদের স্বজনরা। শহরতলির যশোদলে অবস্থিত শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাওয়ার প্রধান সড়কেও দীর্ঘ যানজট লেগে থাকায় মুমূর্ষু রোগী নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স কিংবা অটোরিকশায় চলাচল করতে হচ্ছে চরম ঝুঁকি নিয়ে।
রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরে শহরের একরামপুর মোড়ে যানজটে আটকে থাকা অটোরিকশায় বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন ইদ্রিছ আলী। দীর্ঘ সময় একই জায়গায় আটকে থাকার পর তিনি বলেন, “বাবাকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। ডাক্তার দেখানোর সময়ও শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জ্যামের কারণে কোনোভাবেই সামনে এগোতে পারছি না। শহরে ঢোকার পর থেকেই মনে হচ্ছে আমরা আটকে আছি। মেডিকেল রোডে যাতায়াত এখন খুবই কষ্টের।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিশোরগঞ্জের চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হলেও সেখানে যাওয়ার সড়কটি তুলনামূলক সরু এবং সবসময় যানজটপ্রবণ। জরুরি মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্সও অনেক সময় যানজটে আটকে যায়। এতে হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় রোগীর স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।
শহরের যানজটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে সরেজমিনে দেখা গেছে। শহরের সড়কের ধারণক্ষমতার তুলনায় ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার সংখ্যা অনেক বেশি। এর পাশাপাশি একরামপুর, স্টেশন রোড ও গাইটালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সড়কের ওপরই গড়ে উঠেছে অটোরিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড। এতে সড়কের বড় একটি অংশ দখল হয়ে যাওয়ায় যান চলাচলের জায়গা আরও সংকুচিত হচ্ছে।
শুধু যানবাহনের চাপই নয়, শহরের প্রধান সড়কের দুই পাশের ফুটপাতও নানা স্থাপনা, দোকান ও হকারদের দখলে রয়েছে। ফলে পথচারীদের অনেকেই ফুটপাত ব্যবহার করতে না পেরে মূল সড়ক দিয়ে হাঁটছেন। এতে যানবাহন ও পথচারীর চলাচল একই জায়গায় এসে যানজট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এদিকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্রাফিক আইন না মানা, যত্রতত্র গাড়ি থামানো এবং চালকদের অসচেতনতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সময়ে এসব সড়কে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।
জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, শহরের সরু সড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ সামলানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে অবৈধ অটোরিকশার সংখ্যা বেশি হওয়ায় নিয়মিত নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হচ্ছে। বিভিন্ন সময় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও স্থায়ী সমাধানের জন্য পৌরসভা ও জেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
কিশোরগঞ্জ পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, যানজট কমাতে বিভিন্ন সময়ে অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদে অভিযান চালানো হয়েছে। তবে শহরের মানুষের যাতায়াতের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় একসঙ্গে সব রিকশা বা অটোরিকশা বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। পর্যায়ক্রমে বৈধ ও নিবন্ধিত যানবাহনকে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। শহরের ভেতর দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ, সড়কের ওপর থেকে অবৈধ স্ট্যান্ড সরানো, ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং হাসপাতালের সংযোগ সড়কগুলো প্রশস্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীরাও বলছেন, প্রতিদিনের যানজটে তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছাতেও তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা।
কিশোরগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা, শুধু অভিযান আর আশ্বাস নয়, যানজট নিরসনে দ্রুত কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হবে। বিশেষ করে হাসপাতালমুখী সড়কগুলোকে জরুরি যান চলাচলের উপযোগী করতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ আগস্ট ২০২৬
কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের একরামপুর মোড় থেকে স্টেশন রোড হয়ে গাইটাল পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার সড়ক পাড়ি দিতে এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগছে। বৈধ-অবৈধ যানবাহনের চাপ, সড়কের ওপর গড়ে ওঠা স্ট্যান্ড, ফুটপাত দখল এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় প্রতিদিনই দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন শহরের বাসিন্দারা।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন জরুরি রোগী ও তাদের স্বজনরা। শহরতলির যশোদলে অবস্থিত শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাওয়ার প্রধান সড়কেও দীর্ঘ যানজট লেগে থাকায় মুমূর্ষু রোগী নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স কিংবা অটোরিকশায় চলাচল করতে হচ্ছে চরম ঝুঁকি নিয়ে।
রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরে শহরের একরামপুর মোড়ে যানজটে আটকে থাকা অটোরিকশায় বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন ইদ্রিছ আলী। দীর্ঘ সময় একই জায়গায় আটকে থাকার পর তিনি বলেন, “বাবাকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। ডাক্তার দেখানোর সময়ও শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জ্যামের কারণে কোনোভাবেই সামনে এগোতে পারছি না। শহরে ঢোকার পর থেকেই মনে হচ্ছে আমরা আটকে আছি। মেডিকেল রোডে যাতায়াত এখন খুবই কষ্টের।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিশোরগঞ্জের চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হলেও সেখানে যাওয়ার সড়কটি তুলনামূলক সরু এবং সবসময় যানজটপ্রবণ। জরুরি মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্সও অনেক সময় যানজটে আটকে যায়। এতে হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় রোগীর স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।
শহরের যানজটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে সরেজমিনে দেখা গেছে। শহরের সড়কের ধারণক্ষমতার তুলনায় ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার সংখ্যা অনেক বেশি। এর পাশাপাশি একরামপুর, স্টেশন রোড ও গাইটালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সড়কের ওপরই গড়ে উঠেছে অটোরিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড। এতে সড়কের বড় একটি অংশ দখল হয়ে যাওয়ায় যান চলাচলের জায়গা আরও সংকুচিত হচ্ছে।
শুধু যানবাহনের চাপই নয়, শহরের প্রধান সড়কের দুই পাশের ফুটপাতও নানা স্থাপনা, দোকান ও হকারদের দখলে রয়েছে। ফলে পথচারীদের অনেকেই ফুটপাত ব্যবহার করতে না পেরে মূল সড়ক দিয়ে হাঁটছেন। এতে যানবাহন ও পথচারীর চলাচল একই জায়গায় এসে যানজট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এদিকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্রাফিক আইন না মানা, যত্রতত্র গাড়ি থামানো এবং চালকদের অসচেতনতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সময়ে এসব সড়কে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।
জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, শহরের সরু সড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ সামলানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে অবৈধ অটোরিকশার সংখ্যা বেশি হওয়ায় নিয়মিত নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হচ্ছে। বিভিন্ন সময় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও স্থায়ী সমাধানের জন্য পৌরসভা ও জেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
কিশোরগঞ্জ পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, যানজট কমাতে বিভিন্ন সময়ে অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদে অভিযান চালানো হয়েছে। তবে শহরের মানুষের যাতায়াতের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় একসঙ্গে সব রিকশা বা অটোরিকশা বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। পর্যায়ক্রমে বৈধ ও নিবন্ধিত যানবাহনকে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। শহরের ভেতর দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ, সড়কের ওপর থেকে অবৈধ স্ট্যান্ড সরানো, ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং হাসপাতালের সংযোগ সড়কগুলো প্রশস্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীরাও বলছেন, প্রতিদিনের যানজটে তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছাতেও তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা।
কিশোরগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা, শুধু অভিযান আর আশ্বাস নয়, যানজট নিরসনে দ্রুত কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হবে। বিশেষ করে হাসপাতালমুখী সড়কগুলোকে জরুরি যান চলাচলের উপযোগী করতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

আপনার মতামত লিখুন