কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলায় টিকটক ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে ১৫ বছরের কিশোর মোনায়েম। আজ শনিবার (১৮ জুলাই) দুপুর ১টার দিকে উপজেলার কারপাশা ইউনিয়নের বাগখালী এলাকার নানশ্রী ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। বৈদ্যুতিক খুঁটিতে উঠে টিকটক করার সময় হঠাৎ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে সে নিচে থাকা গভীর পানিতে তলিয়ে যায়। ঘটনার পর বেশ কয়েক ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও এখনও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। নিখোঁজ মোনায়েম উপজেলার নানশ্রী গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে। বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলের সমন্বয়ে উদ্ধার অভিযান চললেও সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিকে হয়ে আসছে অলৌকিক কিছুর আশা। পরিবার ও এলাকায় এখন চলছে কান্নার রোল।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আজ দুপুরে মোনায়েম তার কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে নানশ্রী ব্রিজের পাশে ঘুরতে গিয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে নতুন এবং রোমাঞ্চকর ভিডিও আপলোড করার এক ধরনের তীব্র ঝোঁক ছিল তার। সেই উন্মাদনা থেকেই বন্ধুদের ক্যামেরা সচল রেখে সে ব্রিজের পাশের একটি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে বেয়ে উঠতে শুরু করে। উদ্দেশ্য ছিল খুঁটির ওপর থেকে সরাসরি নিচে নদীতে লাফ দেওয়ার একটি দৃশ্য ধারণ করা। কিন্তু মুহূর্তের অসতর্কতায় ঘটে যায় জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। খুঁটির ওপরে পৌঁছানোর পর অসাবধানতাবশত লাইভ বৈদ্যুতিক তারের সংস্পর্শে চলে আসে মোনায়েম। প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক শক খেয়ে সে মুহূর্তের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিচে নদীর উত্তাল পানিতে পড়ে যায়। পানিতে পড়ার পর আর তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। চোখের সামনে বন্ধুকে এভাবে তলিয়ে যেতে দেখে পাড়ে থাকা অন্য কিশোররা চিৎকার শুরু করলে আশেপাশের মানুষ ছুটে আসেন।
ঘটনার পরপরই নানশ্রী ও বাগখালী এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তারা নিজস্ব উদ্যোগে নৌকা ও জাল নিয়ে নদীতে তল্লাশি শুরু করেন। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসে নিকলী থানা পুলিশ। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তাৎক্ষণিকভাবে খবর দেওয়া হয় ফায়ার সার্ভিসকে। বিকেলের দিকে ফায়ার সার্ভিসের একটি বিশেষ ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিখোঁজ কিশোরকে উদ্ধারে সর্বাত্মক অভিযান শুরু করে। তবে নদীর তীব্র স্রোত এবং পানির গভীরতার কারণে উদ্ধার কাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে জানা গেছে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (সন্ধ্যা) মোনায়েমের কোনো হদিস মেলেনি। নদীর পাড়ে হাজারো উৎসুক এবং শোকাতুর মানুষের ভিড় জমেছে, সবার চোখে-মুখে শুধুই উৎকণ্ঠা।
এ বিষয়ে নিকলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, "ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। খবর পাওয়ার সাথে সাথেই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়েছে। নিখোঁজ কিশোর মোনায়েমকে উদ্ধারে আমরা স্থানীয় জনগণের সাথে সমন্বয় করে কাজ করছি। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। আমাদের টিম সার্বক্ষণিক ঘটনাস্থলে মোতায়েন রয়েছে।" তিনি আরও জানান, উদ্ধার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে বর্ষাকালীন নদীর পানির বেগ ও গভীরতা বেশি হওয়ায় ডুবুরিদের বেগ পেতে হচ্ছে।
মোনায়েমের নিখোঁজ হওয়ার খবর নানশ্রী গ্রামে পৌঁছামাত্রই তার পরিবারে নেমে আসে অন্ধকার। মোনায়েমের মা বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন, আর বাবা রফিকুল ইসলাম নির্বাক হয়ে নদীর পাড়ে বসে আছেন ছেলের অপেক্ষায়। যে ছেলে সকালে হাসিমুখে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল, সে এখন নদীর অতল তলে—এই নিষ্ঠুর সত্য যেন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না পরিবারটি। প্রতিবেশীরা জানান, মোনায়েম শান্ত স্বভাবের হলেও ইদানীং মোবাইল ফোনের প্রতি তার আসক্তি বেড়েছিল। বিশেষ করে ছোট পর্দায় তারকা হওয়ার কিংবা বন্ধুদের মাঝে একটু আলাদাভাবে জাহির করার এই 'টিকটক সংস্কৃতি' আজ তার জীবনকে খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিওর মূল্য যে জীবনের চেয়েও বেশি হয়ে উঠতে পারে, তা ভাবতেই শিউরে উঠছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
নিকলীর এই ঘটনাটি দেশের সার্বিক কিশোর ও যুবসমাজের একটি বিপজ্জনক চিত্রকে আবারও সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রিলস বা টিকটকে সস্তা জনপ্রিয়তার আশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভিডিও বানানোর প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। চলন্ত ট্রেনের সামনে দাঁড়িয়ে ভিডিও করা, উঁচু ভবন বা বৈদ্যুতিক খুঁটিতে চড়া কিংবা উত্তাল নদীতে ঝুঁকিপূর্ণ স্ট্যান্ট দেখানোর মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তরুণ প্রজন্ম।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সস্তা হাততালি, ভিউ আর লাইক পাওয়ার এই মানসিকতা তরুণদের মনস্তত্ত্বকে গ্রাস করছে। সন্তানরা প্রযুক্তির ভালো দিক গ্রহণ করছে নাকি ঝুঁকির মুখে পড়ছে, সে বিষয়ে বাবা-মা ও অভিভাবক মহলের আরও বেশি নজরদারি প্রয়োজন।
আজকের এই দুর্ঘটনা কেবল নিকলীর একটি পরিবারের গল্প নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা। প্রযুক্তি বিনোদনের মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু তা যেন কখনো জীবনের চেয়ে বড় না হয়ে ওঠে—নিকলীর নানশ্রী ব্রিজের পাশে কান্নারত রফিকুল ইসলামের নীরব চোখের জল আজ যেন এই প্রশ্নই ছুড়ে দিচ্ছে সমাজের বিবেকবান প্রতিটি মানুষের কাছে।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুলাই ২০২৬
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলায় টিকটক ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে ১৫ বছরের কিশোর মোনায়েম। আজ শনিবার (১৮ জুলাই) দুপুর ১টার দিকে উপজেলার কারপাশা ইউনিয়নের বাগখালী এলাকার নানশ্রী ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। বৈদ্যুতিক খুঁটিতে উঠে টিকটক করার সময় হঠাৎ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে সে নিচে থাকা গভীর পানিতে তলিয়ে যায়। ঘটনার পর বেশ কয়েক ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও এখনও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। নিখোঁজ মোনায়েম উপজেলার নানশ্রী গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে। বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলের সমন্বয়ে উদ্ধার অভিযান চললেও সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিকে হয়ে আসছে অলৌকিক কিছুর আশা। পরিবার ও এলাকায় এখন চলছে কান্নার রোল।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আজ দুপুরে মোনায়েম তার কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে নানশ্রী ব্রিজের পাশে ঘুরতে গিয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে নতুন এবং রোমাঞ্চকর ভিডিও আপলোড করার এক ধরনের তীব্র ঝোঁক ছিল তার। সেই উন্মাদনা থেকেই বন্ধুদের ক্যামেরা সচল রেখে সে ব্রিজের পাশের একটি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে বেয়ে উঠতে শুরু করে। উদ্দেশ্য ছিল খুঁটির ওপর থেকে সরাসরি নিচে নদীতে লাফ দেওয়ার একটি দৃশ্য ধারণ করা। কিন্তু মুহূর্তের অসতর্কতায় ঘটে যায় জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। খুঁটির ওপরে পৌঁছানোর পর অসাবধানতাবশত লাইভ বৈদ্যুতিক তারের সংস্পর্শে চলে আসে মোনায়েম। প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক শক খেয়ে সে মুহূর্তের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিচে নদীর উত্তাল পানিতে পড়ে যায়। পানিতে পড়ার পর আর তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। চোখের সামনে বন্ধুকে এভাবে তলিয়ে যেতে দেখে পাড়ে থাকা অন্য কিশোররা চিৎকার শুরু করলে আশেপাশের মানুষ ছুটে আসেন।
ঘটনার পরপরই নানশ্রী ও বাগখালী এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তারা নিজস্ব উদ্যোগে নৌকা ও জাল নিয়ে নদীতে তল্লাশি শুরু করেন। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসে নিকলী থানা পুলিশ। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তাৎক্ষণিকভাবে খবর দেওয়া হয় ফায়ার সার্ভিসকে। বিকেলের দিকে ফায়ার সার্ভিসের একটি বিশেষ ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিখোঁজ কিশোরকে উদ্ধারে সর্বাত্মক অভিযান শুরু করে। তবে নদীর তীব্র স্রোত এবং পানির গভীরতার কারণে উদ্ধার কাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে জানা গেছে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (সন্ধ্যা) মোনায়েমের কোনো হদিস মেলেনি। নদীর পাড়ে হাজারো উৎসুক এবং শোকাতুর মানুষের ভিড় জমেছে, সবার চোখে-মুখে শুধুই উৎকণ্ঠা।
এ বিষয়ে নিকলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, "ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। খবর পাওয়ার সাথে সাথেই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়েছে। নিখোঁজ কিশোর মোনায়েমকে উদ্ধারে আমরা স্থানীয় জনগণের সাথে সমন্বয় করে কাজ করছি। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। আমাদের টিম সার্বক্ষণিক ঘটনাস্থলে মোতায়েন রয়েছে।" তিনি আরও জানান, উদ্ধার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে বর্ষাকালীন নদীর পানির বেগ ও গভীরতা বেশি হওয়ায় ডুবুরিদের বেগ পেতে হচ্ছে।
মোনায়েমের নিখোঁজ হওয়ার খবর নানশ্রী গ্রামে পৌঁছামাত্রই তার পরিবারে নেমে আসে অন্ধকার। মোনায়েমের মা বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন, আর বাবা রফিকুল ইসলাম নির্বাক হয়ে নদীর পাড়ে বসে আছেন ছেলের অপেক্ষায়। যে ছেলে সকালে হাসিমুখে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল, সে এখন নদীর অতল তলে—এই নিষ্ঠুর সত্য যেন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না পরিবারটি। প্রতিবেশীরা জানান, মোনায়েম শান্ত স্বভাবের হলেও ইদানীং মোবাইল ফোনের প্রতি তার আসক্তি বেড়েছিল। বিশেষ করে ছোট পর্দায় তারকা হওয়ার কিংবা বন্ধুদের মাঝে একটু আলাদাভাবে জাহির করার এই 'টিকটক সংস্কৃতি' আজ তার জীবনকে খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিওর মূল্য যে জীবনের চেয়েও বেশি হয়ে উঠতে পারে, তা ভাবতেই শিউরে উঠছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
নিকলীর এই ঘটনাটি দেশের সার্বিক কিশোর ও যুবসমাজের একটি বিপজ্জনক চিত্রকে আবারও সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রিলস বা টিকটকে সস্তা জনপ্রিয়তার আশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভিডিও বানানোর প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। চলন্ত ট্রেনের সামনে দাঁড়িয়ে ভিডিও করা, উঁচু ভবন বা বৈদ্যুতিক খুঁটিতে চড়া কিংবা উত্তাল নদীতে ঝুঁকিপূর্ণ স্ট্যান্ট দেখানোর মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তরুণ প্রজন্ম।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সস্তা হাততালি, ভিউ আর লাইক পাওয়ার এই মানসিকতা তরুণদের মনস্তত্ত্বকে গ্রাস করছে। সন্তানরা প্রযুক্তির ভালো দিক গ্রহণ করছে নাকি ঝুঁকির মুখে পড়ছে, সে বিষয়ে বাবা-মা ও অভিভাবক মহলের আরও বেশি নজরদারি প্রয়োজন।
আজকের এই দুর্ঘটনা কেবল নিকলীর একটি পরিবারের গল্প নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা। প্রযুক্তি বিনোদনের মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু তা যেন কখনো জীবনের চেয়ে বড় না হয়ে ওঠে—নিকলীর নানশ্রী ব্রিজের পাশে কান্নারত রফিকুল ইসলামের নীরব চোখের জল আজ যেন এই প্রশ্নই ছুড়ে দিচ্ছে সমাজের বিবেকবান প্রতিটি মানুষের কাছে।

আপনার মতামত লিখুন