বিশেষ করে, এবারের মৌসুমে হাওরের বুক চিরে বোরো ধানের চারা রোপণে পুরুষের পাশাপাশি অভাবনীয় কর্মচাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে নারীদের মাঝে। সকালের সোনাঝরা রোদ থেকে শুরু করে সন্ধ্যার নরম আলোছায়া পর্যন্ত হাওরকন্যাদের হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় রূপালী কাদা রূপ নিচ্ছে সবুজ সম্ভাবনায়। বর্ষার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে ইটনা, মিঠামইন, অস্টগ্রাম, নিকলী, তাড়াইল ও করিমগঞ্জের বিস্তৃত হাওরে এখন শুধুই কর্মযজ্ঞের কোলাহল। প্রতি বছর এই সময়টায় নতুন জীবনের বার্তা আসে হাওরবাসীর ঘরে। যে জল এতদিন হাওরবাসীকে একাকী, বিচ্ছিন্ন ও গৃহবন্দি করে রেখেছিল, সেই জল সরে যেতেই ভেসে উঠেছে তাদের জীবিকার মূল ভিত্তি—সোনার ফসল ফলানোর উর্বর জমি।হাওরের কৃষি মানেই সময়ের সঙ্গে এক কঠিন লড়াই। অকাল বন্যা বা পাহাড়ি ঢল আসার আগেই ফসল ঘরে তোলা চাই। তাই পানি কমার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় বোরো ধান রোপণের মহোৎসব। কাক ডাকা ভোরে থোকা থোকা ধানের সবুজ চারা কাঁধে তুলে নেন পুরুষেরা, আর হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে সেই চারা একের পর এক সারিবদ্ধভাবে রোপণ করে চলেন নারীরা। রোদে পিঠ পুড়ে তামাটে হয়ে যায়, পায়ের নিচে কনকনে কাদা আর ঠান্ডা পানি—তবুও তাদের মুখে ভাসে তৃপ্তির হাসিরেখা। কারণ, এই চারাই কিছুদিন পর রঙ বদলে সোনালী হয়ে উঠবে, ভরিয়ে দেবে শূন্য গোলা।
ইটনা উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের হাওরে হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে রোদে ভিজে ধানের চারা রোপণ করছিলেন চল্লিশোর্ধ্ব জমিলা খাতুন। কপালে জমে থাকা ঘাম শাড়ির আঁচলে মুছে মুখে অমলিন হাসি ফুটিয়ে তিনি বললেন,"বর্ষার কয় মাস তো হাত-পা বান্ধা ঘরে বইয়া থাহন লাগে। হাওরের পানি যহন নামন শুরু করে, আমডার জিওনে (জীবনে) নতুন আশা আহে। পুরুষ মানুষরা জমি তদারকি করে, হাল বায়, চারা তোলে; আর আমরা নারীরা সারাদিন কাদা-পানিতে থাইকা চারা রোপণ করি। পলি মাডিতে চারাডা বসাইলেই মনে হয় নিজের ছাওয়ালডারে কোলে নিলাম। খাটুনি অয় ঠিকই, কিন্তু গাঙের পানি শুকাইলে ঘরের কষ্টও দূর অওনের পথ খোলে।"একসময় হাওরাঞ্চলের নারীরা কেবল হাঁস-মুরগি পালন আর ঘরের রান্নাবান্নার কাজেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তারা নিজেদের শামিল করেছেন মূলধারার কৃষিকাজে। পুরুষদের পাশাপাশি শক্ত হাতে হাল ধরছেন পরিবারের আয়ের চাকার। ধান রোপণ থেকে শুরু করে নিড়ানো, আর পরবর্তীতে ধান কাটা ও মাড়াই—সবখানেই এখন হাওরের নারী শ্রমিকদের সরব ও অগ্রণী ভূমিকা।
মিঠামইন হাওরের এক প্রান্তরের কৃষক রইচ উদ্দিন (৫৫) স্ত্রীর এই কর্মনিষ্ঠার প্রশংসা করে বলেন, "নারীরা জমিতে নামায় আমডার কাজের গতি দ্বিগুণ হইয়া গেছে। আগে বাইরের থাইকা বাড়তি মজুর দিয়া কাম করাইতে যে টাহা লাগতো, এহন ঘরের নারী ও আশেপাশের কিষাণীরা মিলে কাজ করায় সেই খরচ অনেকাংশে বাইচা যায়। তাছাড়া ধানের চারা রোপণে নারীদের হাত খুব নিপুণ। তারা যেভাবে গুছিয়া সারিবদ্ধভাবে চারা লাগায়, তাতে ফলনও ভালো অয়।"
হাওরে কৃষি খাতে নারীদের এই জোয়ার ও ব্যাপক অংশগ্রহণকে অত্যন্ত ইতিবাচক ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও সমাজবিজ্ঞানীরা। নিকলী সরকারি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ও হাওর বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, "হাওরের জীবন সংগ্রাম অত্যন্ত কঠিন ও চরম প্রকৃতির সাথে লড়াইভিত্তিক। এতদিন নারীদের গৃহস্থালি কাজ ছাড়া মাঠে অদৃশ্য ভাবা হতো। কিন্তু বর্তমানে পানি কমার সাথে সাথে ধান রোপণে নারীদের এই বিশাল অংশগ্রহণ শুধু যে হাওরের অর্থনীতিকে সচল রাখছে তা নয়, বরং এটি গ্রামীণ নারী ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল ও জীবন্ত উদাহরণ। তারা এখন আর শুধু সহযোগী নন, তারা হাওরের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম মূল কারিগর।"
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জানান, হাওরাঞ্চলে অকাল বন্যার চরম ঝুঁকি থাকে। তাই পানি শুকানোর সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুতাতিদ্রুত ধান রোপণ শেষ করাটা অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, "পানি কমার এই স্বল্প সময়ে জমিতে চারা রোপণের কাজ শেষ করা পুরুষ কৃষকদের একার পক্ষে বেশ কঠিন। নারীরা মাঠে নামায় কৃষি কাজের গতি ত্বরান্বিত হচ্ছে। আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নারীদের আধুনিক রোপণ পদ্ধতি ও সার ব্যবস্থাপনায় সচেতন করতে নিয়মিত পরামর্শ প্রদান করছি। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে হাওরের ফসল ঘরে তুলতে নারীদের এই যোগদান প্রশংসনীয়।"হাওরের এই কাদা-মাটি ও জলের সঙ্গে কৃষকের সম্পর্ক কেবল অর্থনীতির নয়, এ যেন এক আত্মিক ও রক্তের বন্ধন। বর্ষায় যে হাওর রুদ্রমূর্তি ধারণ করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এক জনপদে পরিণত হয়, হেমন্তের সূচনালগ্নে পানি নামতেই সেই হাওর আবার পরম মমতায় অন্ন জোগানোর সুজলা-সুফলা ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। নারীদের হাতের ছোঁয়ায় পলির স্তরে স্তরে প্রোথিত হচ্ছে লাখো পরিবারের জীবিকা আর স্বপ্নের গোড়াপত্তন।
সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ে, হাওরের পানিতে রাঙা রোদ ঝিলমিল করে ওঠে, তখনো দূর হাওরে সারি বেঁধে রোপণকাজ চালিয়ে যান হাওরকন্যারা। কাদার গন্ধ, রোদের তোপ আর পরিশ্রমে ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন তারা ঘরের পথ ধরেন, তখন তাদের চোখের কোনায় থাকে এক বুক প্রত্যাশা—আগামী চৈত্র-বৈশাখ মাসে এই মাটির বুক চিরেই হেসে উঠবে কাঙ্ক্ষিত সোনালী বোরো ধান।








