একসময়ের প্রমত্তা নরসুন্দা আজ সময়ের নির্মম পরিক্রমায় ক্ষীণকায়, শান্ত ও নিথর। যে নদীর বুক চিরে একদা পালতোলা নৌকার গর্জন শোনা যেত, ঢেউয়ের তালে তালে চলত জীবন ও জীবিকার কোলাহল, সেই নরসুন্দাই আজ ধীর পায়ে যেন নিজের অস্তিত্ব রক্ষার আকুতি জানাচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতির এই রূপান্তরের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকা নদীপাড়ের মেহনতি মানুষেরা হাহাকার করে হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। নদী তার স্রোত ও যৌবন হারিয়ে যে কচুরিপানার স্তূপ উপহার হিসেবে রেখে গেছে, তাকেই তারা বানিয়ে নিয়েছে নিজেদের ঘুরে দাঁড়ানোর হাতিয়ার। জল ও মাটির এই মায়াবী মেলবন্ধনে নরসুন্দার জলে আজ ভেসে উঠছে এক একটি সবুজ স্বপ্নের ক্যানভাস—কচুরিপানার ভাসমান বেডে শাকসবজির বাম্পার ফলন ঘটিয়ে কিশোরগঞ্জের নদীপাড়ের খেটে খাওয়া কৃষকেরা লিখছেন কৃষি বিপ্লবের এক নতুন ও অভাবনীয় মহাকাব্য।
যে কচুরিপানাকে একসময় নদীর বুকে বিষফোড়া, অভিশাপ কিংবা পচনশীল বর্জ্য হিসেবে গণ্য করা হতো, নদীর প্রবাহকে আটকে দেওয়ার অপরাধে যার দিকে আঙুল তুলত সবাই, আজ সেই নদীর বর্জ্যই কৃষকের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। নদীর বুকের কুচকুচে কালো জলে যখন কচুরিপানার জটলা ভেসে থাকে, তখন সেই কচুরিপানাকে কেটে, ধাপে ধাপে স্তরীভূত করে পরম মমতায় তৈরি করা হয় একেকটি ভাসমান বেড বা ধাপ। এটি যেন প্রকৃতির বুকে মানুষের এক নিজস্ব ও সজীব দ্বীপমালা। এই ধাপে কোনো রাসায়নিক সারের ব্যবহার নেই, নেই কোনো কৃত্রিম ওষুধের নির্মম ছোঁয়া। পচে যাওয়া কচুরিপানাই এখানে নিজেই নিজের পুষ্টি যোগায়, প্রাকৃতিক জৈব সারের সুনিপুণ কাজ সম্পন্ন করে। প্রকৃতিই যেন এখানে মায়ের মতো নিজের কোলে তুলে নিয়েছে কৃষকের প্রতিটি বীজ, জল থেকে শোষণ করা সুধা দিয়ে তৈরি করছে সম্পূর্ণ বিষমুক্ত, তরতাজা ও সতেজ শাকসবজি।
আজ থেকে প্রায় এক দশক আগেও কিশোরগঞ্জের বিস্তৃত জনপদে ভাসমান বীজতলা বা ভাসমান বেডে চাষাবাদের এমন চোখজুড়ানো রূপ সচরাচর চোখে পড়ত না। এখানকার কৃষকেরা চিরাচরিত প্রথায় সমতল মাটিতেই চাষাবাদে অভ্যস্ত ছিলেন, যেখানে বন্যার পানি কিংবা টানা বর্ষণে প্রায়শই ফসল ডুবে গিয়ে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় নিমজ্জিত হতে হতো কৃষকদের। কিন্তু গত কয়েক বছরে নরসুন্দার বুকে সূচিত হওয়া এই নতুন কৃষিব্যবস্থা সমগ্র জেলার দৃশ্যপট এক নিমেষে বদলে দিয়েছে। রূপালী জলের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ধান, পালং, লালশাক, পুইশাক, টমেটো, মরিচ আর হরেক রকমের বেগুন ও লাউয়ের ডগা যেন পথচারী ও আশপাশের মানুষদের নজর কাড়ছে অপার বিস্ময়ে। নরসুন্দার এই পরিবর্তন এখন আর কেবল কয়েকটি কৃষক পরিবারের জীবনযুদ্ধের গল্পে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি হয়ে উঠেছে কিশোরগঞ্জের একটি বহুল আলোচিত ও উদ্দীপনা জাগানো অনুকরণীয় সাফল্যগাথা।
এই সম্ভাবনাময় ও অভিনব চাষাবাদ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কিশোরগঞ্জের উপপরিচালক ডঃ মোঃ সাদিকুর রহমান অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন যে, ভাসমান বেডে চাষাবাদের এই বিশেষ পদ্ধতিটি ধীরে ধীরে সমগ্র কিশোরগঞ্জ জেলায় এক দারুণ প্রসার লাভ করছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, সাধারণ প্রথাগত কৃষির তুলনায় এই পদ্ধতিতে কৃষি উৎপাদন খরচ অবিশ্বাস্য রকমের কম। কারণ এতে মাটির গভীর তদারকি করতে হয় না, দামি রাসায়নিক সার কেনার কোনো প্রয়োজন পড়ে না, বললেই চলে কোনো বাড়তি খরচ নেই; অথচ এর বিপরীতে শস্যের ফলন পাওয়া যায় বহুগুণ বেশি। প্রাকৃতিক উপায়ে পুষ্টি পাওয়ার কারণে শস্যের গুণগত মান ও স্বাদ হয় অনন্যসাধারণ। তিনি আরও যোগ করে বলেন, দেশের কৃষি খাতের সার্বিক উন্নয়ন ও প্রান্তিক কৃষকদের জীবিকা সুসংহত করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনায় এই ভাসমান বেড চাষের প্রসারে জেলা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সময়োপযোগী, যুগান্তকারী ও আধুনিক কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। কৃষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদান থেকে শুরু করে প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করায় প্রতিদিন আরও অনেক কৃষক উৎসাহিত হয়ে এই পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন।
নরসুন্দার শীতল হাওয়ায় দাঁড়িয়ে পরম তৃপ্তি ও আনন্দের সাথে নিজের এই সবুজ বিপ্লবের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন প্রবীণ কৃষক মোঃ হোসেন। তিনি জানান যে, গত প্রায় চার বছর ধরে তিনি নিয়মিতভাবে নদীর বুকে এই ভাসমান বেডে বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদ করে আসছেন। তার ভাষায়, যেখানে জল জমে থাকত আর কচুরিপানা পচে দুর্গন্ধ ছড়াত, সেখানে আজ তিনি নিজ হাতে তৈরি করেছেন সবজির স্বর্গরাজ্য। বর্ষা কি শরৎ—কোনো ঋতুতেই তার ফসলের জমি ডুবে যাওয়ার ভয় থাকে না। হরেক রকম তরতাজা শাক, শসা, ঢ্যাঁড়শ ও নানান প্রজাতির সবজি ফলিয়ে তিনি কেবল পরিবারের চাহিদা মোটাচ্ছেন না, বাজারে চড়া দামে তা বিক্রি করে আজ অত্যন্ত স্বাবলম্বী ও লাভে আছেন। সামান্য শ্রম আর প্রকৃতির দেয়া কচুরিপানাকে বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজে লাগিয়েই তিনি এখন নিজের ভাগ্য বদলে ফেলেছেন।
কিশোরগঞ্জের বুকে বোনা এই নীরব সবুজ বিপ্লব প্রমাণ করে দেয় যে, মানুষের ইচ্ছা আর প্রকৃতির সঠিক মেলবন্ধন ঘটলে অভিশাপকেও পরম আশীর্বাদে রূপান্তর করা সম্ভব। যে নরসুন্দা তার প্রমত্তা রূপ হারিয়ে নীরব ও ব্যথিত হৃদয়ে বয়ে চলেছে, সেই নরসুন্দার বুকেই আজ নতুন করে বেঁচে থাকার প্রাণশক্তি খুঁজে পাচ্ছেন হাজারও সাধারণ কৃষক। কচুরিপানার নরম শয্যায় বেড়ে ওঠা এই সবুজ শস্য কেবল কৃষক পরিবারের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই আনছে না, বরং রাসায়নিকমুক্ত সুস্থ ও নিরাপদ খাবারের নিশ্চয়তা দিয়ে সমগ্র অঞ্চলের জন্য গড়ে তুলছে এক টেকসই, সুন্দর ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। নরসুন্দার জলে ভেসে ওঠা এই সবুজের ভেলা যেন কেবল সবজি চাষের ভেলা নয়, এটি কিশোরগঞ্জের জল-মাটির মানুষের অপরাজেয় মনোবল আর ঘুরে দাঁড়ানোর এক অবিনশ্বর প্রতীক।
tapashmainul70@gmail.com
কচুরিপানায় বদলাচ্ছে কৃষকের ভাগ্য, নরসুন্দায় ভাসছে সবুজ স্বপ্ন
শাকসবজির বাম্পার ফলন ঘটিয়ে কিশোরগঞ্জের নদীপাড়ের খেটে খাওয়া কৃষকেরা লিখছেন কৃষি বিপ্লবের এক নতুন ও অভাবনীয় মহাকাব্য।








