দক্ষিণ এশিয়ায় ন্যূনতম দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হারে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। ইউনেস্কোর সাম্প্রতিক বিশ্ব শিক্ষা পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে এমন উদ্বেগজনক তথ্য। শিক্ষাবিদরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে কম বেতন, সীমিত সুযোগ-সুবিধা, সামাজিক মর্যাদার অভাব এবং নীতিগত দুর্বলতার কারণে শিক্ষকতা পেশা মেধাবীদের কাছে আকর্ষণ হারাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায়।
রাজধানীর একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাত বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন মেহেরুন্নেসা মুন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দিলেও তিনি বলেন, অনেক সহকর্মী এই পেশায় টিকে থাকতে পারেননি। চাকরির শুরুতে তার বেতন ছিল ১৭ হাজার টাকা।
মেহেরুন্নেসা মুন বলেন, শিক্ষাগত যোগ্যতার তুলনায় শিক্ষকরা পর্যাপ্ত বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পান না। ফলে অনেকে ভালো জীবনমানের আশায় অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
শুধু কর্মরত শিক্ষকই নন, নতুন প্রজন্মের চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যেও শিক্ষকতা নিয়ে আগ্রহ কম দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা শিক্ষকতার চেয়ে প্রশাসন, করপোরেট চাকরি কিংবা বিসিএস ক্যাডার পেশাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এক শিক্ষার্থী বলেন, অন্যান্য পেশার তুলনায় শিক্ষকদের বেতন অনেক কম। আরেকজন বলেন, শিক্ষকতার সামাজিক সম্মান আগের মতো নেই। শ্রেণিকক্ষে সম্মান থাকলেও সামাজিক বাস্তবতায় সেই মর্যাদা অনেক সময় প্রতিফলিত হয় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অনাগ্রহের প্রভাব ইতোমধ্যে শ্রেণিকক্ষে দৃশ্যমান। দক্ষ শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষ কার্যকর ও আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে এখনও শিক্ষকদের গুরুত্ব যথাযথভাবে উপলব্ধি করা হয়নি।
তার ভাষ্য, “শিক্ষকদের বেতন, মর্যাদা এবং পেশাগত উন্নয়নের বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। ফলে সম্মানজনক এই পেশাটি ধীরে ধীরে অনাগ্রহের জায়গায় চলে যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, মেধাবীদের শিক্ষকতায় আনতে হলে বেতন কাঠামো পুনর্বিবেচনা, সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি এবং পেশাগত ক্ষমতায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্তের পরিবর্তে একটি কার্যকর শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠনের মাধ্যমে যুগোপযোগী শিক্ষা নীতি প্রণয়ন জরুরি।
এদিকে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্যও শিক্ষার মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কর্মক্ষেত্রে চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং পেশাগত হতাশা শিক্ষাদানের দক্ষতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
শিক্ষা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশের উন্নয়ন ও মানবসম্পদ গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিহার্য। তবে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে শিক্ষা খাতে সংকট আরও গভীর হতে পারে। তাই এখনই শিক্ষক পেশাকে আকর্ষণীয় ও সম্মানজনক করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠছে।
বিষয় : শিক্ষক

শনিবার, ০২ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ মে ২০২৬
দক্ষিণ এশিয়ায় ন্যূনতম দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হারে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। ইউনেস্কোর সাম্প্রতিক বিশ্ব শিক্ষা পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে এমন উদ্বেগজনক তথ্য। শিক্ষাবিদরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে কম বেতন, সীমিত সুযোগ-সুবিধা, সামাজিক মর্যাদার অভাব এবং নীতিগত দুর্বলতার কারণে শিক্ষকতা পেশা মেধাবীদের কাছে আকর্ষণ হারাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায়।
রাজধানীর একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাত বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন মেহেরুন্নেসা মুন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দিলেও তিনি বলেন, অনেক সহকর্মী এই পেশায় টিকে থাকতে পারেননি। চাকরির শুরুতে তার বেতন ছিল ১৭ হাজার টাকা।
মেহেরুন্নেসা মুন বলেন, শিক্ষাগত যোগ্যতার তুলনায় শিক্ষকরা পর্যাপ্ত বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পান না। ফলে অনেকে ভালো জীবনমানের আশায় অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
শুধু কর্মরত শিক্ষকই নন, নতুন প্রজন্মের চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যেও শিক্ষকতা নিয়ে আগ্রহ কম দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা শিক্ষকতার চেয়ে প্রশাসন, করপোরেট চাকরি কিংবা বিসিএস ক্যাডার পেশাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এক শিক্ষার্থী বলেন, অন্যান্য পেশার তুলনায় শিক্ষকদের বেতন অনেক কম। আরেকজন বলেন, শিক্ষকতার সামাজিক সম্মান আগের মতো নেই। শ্রেণিকক্ষে সম্মান থাকলেও সামাজিক বাস্তবতায় সেই মর্যাদা অনেক সময় প্রতিফলিত হয় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অনাগ্রহের প্রভাব ইতোমধ্যে শ্রেণিকক্ষে দৃশ্যমান। দক্ষ শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষ কার্যকর ও আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে এখনও শিক্ষকদের গুরুত্ব যথাযথভাবে উপলব্ধি করা হয়নি।
তার ভাষ্য, “শিক্ষকদের বেতন, মর্যাদা এবং পেশাগত উন্নয়নের বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। ফলে সম্মানজনক এই পেশাটি ধীরে ধীরে অনাগ্রহের জায়গায় চলে যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, মেধাবীদের শিক্ষকতায় আনতে হলে বেতন কাঠামো পুনর্বিবেচনা, সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি এবং পেশাগত ক্ষমতায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্তের পরিবর্তে একটি কার্যকর শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠনের মাধ্যমে যুগোপযোগী শিক্ষা নীতি প্রণয়ন জরুরি।
এদিকে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্যও শিক্ষার মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কর্মক্ষেত্রে চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং পেশাগত হতাশা শিক্ষাদানের দক্ষতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
শিক্ষা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশের উন্নয়ন ও মানবসম্পদ গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিহার্য। তবে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে শিক্ষা খাতে সংকট আরও গভীর হতে পারে। তাই এখনই শিক্ষক পেশাকে আকর্ষণীয় ও সম্মানজনক করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠছে।

আপনার মতামত লিখুন