ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের নামে সমকামী পরিচয় ব্যবহার করে আবেদন


আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬

যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের নামে সমকামী পরিচয় ব্যবহার করে আবেদন

যুক্তরাজ্যে আশ্রয় বা বসবাসের অনুমতি পেতে বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের কিছু অভিবাসী ভুয়া সমকামী পরিচয় ব্যবহার করছেন—এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে বিবিসির এক আন্ডারকভার অনুসন্ধানে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক শ্রেণির অসাধু আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বা ‘ল ফার্ম’ মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এসব ভুয়া আশ্রয় আবেদন তৈরিতে সহায়তা করছে।

বিবিসি জানায়, যেসব অভিবাসীর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে কিংবা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, তাদের লক্ষ্য করেই এই প্রতারণার নেটওয়ার্ক সক্রিয়। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের নাগরিকদের টার্গেট করা হচ্ছে, কারণ এসব দেশে সমকামিতা সামাজিক ও আইনি জটিলতার বিষয় হওয়ায় সেই প্রেক্ষাপট ব্যবহার করে আশ্রয়ের আবেদনকে বিশ্বাসযোগ্য করার চেষ্টা করা হয়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আবেদনকারীদের শেখানো হচ্ছে কীভাবে সাক্ষাৎকারে কথা বলতে হবে, কী ধরনের ব্যক্তিগত গল্প বলতে হবে এবং কীভাবে নিজ দেশে ফিরে গেলে প্রাণনাশের আশঙ্কা রয়েছে—এমন বয়ান দিতে হবে। শুধু তাই নয়, নকল ছবি, সুপারিশপত্র, চিকিৎসা নথি ও সম্পর্কের প্রমাণপত্রও তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিবিসির ছদ্মবেশী সাংবাদিকরা বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পরিচয়ে কয়েকটি আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ সময় একটি প্রতিষ্ঠান ভুয়া আশ্রয় আবেদনের পুরো প্রক্রিয়ার জন্য সাত হাজার পাউন্ড পর্যন্ত দাবি করে। তারা আশ্বাস দেয়, এভাবে আবেদন করলে হোম অফিস থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঝুঁকি খুবই কম।

একজন ইমিগ্রেশন পরামর্শক দাবি করেন, তিনি গত ১৭ বছর ধরে এ ধরনের আবেদন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে আসছেন। এমনকি আবেদনকারীকে সমকামী সম্পর্কের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে ভুয়া সঙ্গী জোগাড় করে দেওয়ার কথাও বলেন তিনি। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, কেউ কেউ চিকিৎসকদের কাছে বিষণ্ণতার অভিনয় করছেন বা এইচআইভি পজিটিভ বলে মিথ্যা তথ্য দিচ্ছেন, যাতে আবেদন আরও শক্তিশালী দেখায়।

বিবিসির অনুসন্ধানে পূর্ব লন্ডনের বেকটনে ‘ওরচেস্টার এলজিবিটি’ নামের একটি সংগঠনের কার্যক্রমও উঠে আসে। সংগঠনটি নিজেদের সমকামী ও লেসবিয়ান আশ্রয়প্রার্থীদের সহায়তা গোষ্ঠী হিসেবে পরিচয় দিলেও অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কয়েকজন জানান, সেখানে থাকা অধিকাংশ মানুষ প্রকৃতপক্ষে সমকামী নন।

তানিসা খান নামের এক পরামর্শদাতার কথোপকথনও প্রকাশ করেছে বিবিসি। ছদ্মবেশী সাংবাদিক তাকে জানালে যে তিনি প্রকৃতপক্ষে সমকামী নন, তখন তানিসা বলেন, এখানে কেউই আসল নয়, টিকে থাকার জন্য সবাই এই পথ নিচ্ছে। তিনি আরও দাবি করেন, কারও যৌন পরিচয় যাচাইয়ের নির্দিষ্ট পরীক্ষা নেই; সবকিছু নির্ভর করে সাক্ষাৎকারে কী বলা হচ্ছে তার ওপর।

তানিসা একটি ‘কম্প্রেহেনসিভ প্যাকেজ’-এর প্রস্তাব দেন, যেখানে ভুয়া ক্লাবে যাওয়ার ছবি, চিঠি ও সম্পর্কের প্রমাণপত্র দেওয়ার কথা বলা হয়। এর বিনিময়ে তিনি প্রাথমিকভাবে দুই হাজার ৫০০ পাউন্ড দাবি করেন।

এই অনুসন্ধানের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আশ্রয়ব্যবস্থার অপব্যবহার রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যারা প্রতারণার মাধ্যমে আশ্রয় পাওয়ার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে দেশত্যাগে বাধ্য করা হবে।

অভিবাসন আইনজীবীরা বলছেন, এ ধরনের জালিয়াতি প্রকৃত শরণার্থী ও নির্যাতনের শিকার মানুষের জন্য বড় ক্ষতির কারণ। কারণ মিথ্যা আবেদন বাড়লে সত্যিকারের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের আবেদনও সন্দেহের চোখে দেখা হয় এবং পুরো আশ্রয়ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু প্রতারণার চিত্রই নয়, বরং অভিবাসন ব্যবস্থায় তদারকি, যাচাই এবং আইনি পরামর্শক খাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড় প্রশ্নও সামনে এনেছে।

#আরএ

বিষয় : যুক্তরাজ্য

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের নামে সমকামী পরিচয় ব্যবহার করে আবেদন

প্রকাশের তারিখ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

যুক্তরাজ্যে আশ্রয় বা বসবাসের অনুমতি পেতে বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের কিছু অভিবাসী ভুয়া সমকামী পরিচয় ব্যবহার করছেন—এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে বিবিসির এক আন্ডারকভার অনুসন্ধানে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক শ্রেণির অসাধু আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বা ‘ল ফার্ম’ মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এসব ভুয়া আশ্রয় আবেদন তৈরিতে সহায়তা করছে।

বিবিসি জানায়, যেসব অভিবাসীর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে কিংবা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, তাদের লক্ষ্য করেই এই প্রতারণার নেটওয়ার্ক সক্রিয়। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের নাগরিকদের টার্গেট করা হচ্ছে, কারণ এসব দেশে সমকামিতা সামাজিক ও আইনি জটিলতার বিষয় হওয়ায় সেই প্রেক্ষাপট ব্যবহার করে আশ্রয়ের আবেদনকে বিশ্বাসযোগ্য করার চেষ্টা করা হয়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আবেদনকারীদের শেখানো হচ্ছে কীভাবে সাক্ষাৎকারে কথা বলতে হবে, কী ধরনের ব্যক্তিগত গল্প বলতে হবে এবং কীভাবে নিজ দেশে ফিরে গেলে প্রাণনাশের আশঙ্কা রয়েছে—এমন বয়ান দিতে হবে। শুধু তাই নয়, নকল ছবি, সুপারিশপত্র, চিকিৎসা নথি ও সম্পর্কের প্রমাণপত্রও তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিবিসির ছদ্মবেশী সাংবাদিকরা বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পরিচয়ে কয়েকটি আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ সময় একটি প্রতিষ্ঠান ভুয়া আশ্রয় আবেদনের পুরো প্রক্রিয়ার জন্য সাত হাজার পাউন্ড পর্যন্ত দাবি করে। তারা আশ্বাস দেয়, এভাবে আবেদন করলে হোম অফিস থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঝুঁকি খুবই কম।

একজন ইমিগ্রেশন পরামর্শক দাবি করেন, তিনি গত ১৭ বছর ধরে এ ধরনের আবেদন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে আসছেন। এমনকি আবেদনকারীকে সমকামী সম্পর্কের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে ভুয়া সঙ্গী জোগাড় করে দেওয়ার কথাও বলেন তিনি। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, কেউ কেউ চিকিৎসকদের কাছে বিষণ্ণতার অভিনয় করছেন বা এইচআইভি পজিটিভ বলে মিথ্যা তথ্য দিচ্ছেন, যাতে আবেদন আরও শক্তিশালী দেখায়।

বিবিসির অনুসন্ধানে পূর্ব লন্ডনের বেকটনে ‘ওরচেস্টার এলজিবিটি’ নামের একটি সংগঠনের কার্যক্রমও উঠে আসে। সংগঠনটি নিজেদের সমকামী ও লেসবিয়ান আশ্রয়প্রার্থীদের সহায়তা গোষ্ঠী হিসেবে পরিচয় দিলেও অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কয়েকজন জানান, সেখানে থাকা অধিকাংশ মানুষ প্রকৃতপক্ষে সমকামী নন।

তানিসা খান নামের এক পরামর্শদাতার কথোপকথনও প্রকাশ করেছে বিবিসি। ছদ্মবেশী সাংবাদিক তাকে জানালে যে তিনি প্রকৃতপক্ষে সমকামী নন, তখন তানিসা বলেন, এখানে কেউই আসল নয়, টিকে থাকার জন্য সবাই এই পথ নিচ্ছে। তিনি আরও দাবি করেন, কারও যৌন পরিচয় যাচাইয়ের নির্দিষ্ট পরীক্ষা নেই; সবকিছু নির্ভর করে সাক্ষাৎকারে কী বলা হচ্ছে তার ওপর।

তানিসা একটি ‘কম্প্রেহেনসিভ প্যাকেজ’-এর প্রস্তাব দেন, যেখানে ভুয়া ক্লাবে যাওয়ার ছবি, চিঠি ও সম্পর্কের প্রমাণপত্র দেওয়ার কথা বলা হয়। এর বিনিময়ে তিনি প্রাথমিকভাবে দুই হাজার ৫০০ পাউন্ড দাবি করেন।

এই অনুসন্ধানের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আশ্রয়ব্যবস্থার অপব্যবহার রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যারা প্রতারণার মাধ্যমে আশ্রয় পাওয়ার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে দেশত্যাগে বাধ্য করা হবে।

অভিবাসন আইনজীবীরা বলছেন, এ ধরনের জালিয়াতি প্রকৃত শরণার্থী ও নির্যাতনের শিকার মানুষের জন্য বড় ক্ষতির কারণ। কারণ মিথ্যা আবেদন বাড়লে সত্যিকারের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের আবেদনও সন্দেহের চোখে দেখা হয় এবং পুরো আশ্রয়ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু প্রতারণার চিত্রই নয়, বরং অভিবাসন ব্যবস্থায় তদারকি, যাচাই এবং আইনি পরামর্শক খাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড় প্রশ্নও সামনে এনেছে।

#আরএ


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ