মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সংঘাত এবং ইরান কেন্দ্রিক উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি তেলের বাজারে টানাপোড়েন, সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত এবং বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার প্রভাবে বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড (আইএমএফ)।
সংস্থাটি তাদের সর্বশেষ বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩.৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩.১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে চলতি বছরে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ৪.৪ শতাংশে পৌঁছাবে এবং আগামী বছরে তা কমে ৩.৭ শতাংশে নামতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ শুরু না হলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আরও ইতিবাচক হতো। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আর্থিক বাজারে স্থিতিশীলতার কারণে আগে অর্থনীতিতে কিছুটা ইতিবাচক ধারা দেখা গিয়েছিল। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই সম্ভাবনাকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
আইএমএফের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত এবং পাল্টা সামরিক প্রতিক্রিয়ার ফলে পরিস্থিতি দ্রুত পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নেয়। এর প্রভাব সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রবাহে পড়েছে। এই কারণে সংস্থাটি প্রচলিত পূর্বাভাস পদ্ধতির পরিবর্তে বিকল্প পূর্বাভাস ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে।
এই বিকল্প পূর্বাভাসে ধারণা করা হয়েছে, সংঘাত ধীরে ধীরে সীমিত হবে এবং ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত কিছুটা কমে আসবে। তবে সতর্ক করে বলা হয়েছে, যদি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশে নেমে যেতে পারে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের ওপরে উঠতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, যুদ্ধের প্রভাব সব দেশ সমানভাবে অনুভব করবে না। উন্নয়নশীল দেশগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে। চলতি বছরে এসব দেশের প্রবৃদ্ধি গড়ে ০.৩ শতাংশ পয়েন্ট কমে যেতে পারে। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর ওপর প্রভাব তুলনামূলক কম হলেও সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগবে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকোচনের পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। ইরানের অর্থনীতি চলতি বছরে ৬.১ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি কাতার, ইরাক, কুয়েত ও বাহরাইনের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এই অঞ্চলের আর্থিক স্থিতিশীলতা আরও দুর্বল হতে পারে।
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রেও এর প্রভাব পড়বে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি কমে ২.৩ শতাংশে নামতে পারে। যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে পূর্বাভাস কমিয়ে ০.৮ শতাংশ করা হয়েছে, যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হ্রাস। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান অর্থনীতিগুলো—জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেন—সবখানেই প্রবৃদ্ধি কমার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এশিয়ার ক্ষেত্রে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। চীনের প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে ৪.৪ শতাংশ হতে পারে। ভারতের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে থেকে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। অন্যদিকে তুরস্ক ও রাশিয়ার অর্থনীতিতেও সীমিত প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস রয়েছে।
আইএমএফ সতর্ক করে বলেছে, বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য উত্তেজনা বাড়ছে, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন সংকট তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির কারণে স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক ভারসাম্যহীনতা বাড়বে।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে অনিশ্চিত বিনিয়োগ এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি বাজার ভবিষ্যতে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিনিয়োগ প্রত্যাশা হঠাৎ পরিবর্তিত হলে শেয়ারবাজারে বড় ধস নামার আশঙ্কাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক অর্থনীতি নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে মনে করছে আইএমএফ, যা আগামী কয়েক বছরে বিশ্ব অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
#আরএ
বিষয় : আইএমএফ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ এপ্রিল ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সংঘাত এবং ইরান কেন্দ্রিক উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি তেলের বাজারে টানাপোড়েন, সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত এবং বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার প্রভাবে বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড (আইএমএফ)।
সংস্থাটি তাদের সর্বশেষ বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩.৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩.১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে চলতি বছরে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ৪.৪ শতাংশে পৌঁছাবে এবং আগামী বছরে তা কমে ৩.৭ শতাংশে নামতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ শুরু না হলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আরও ইতিবাচক হতো। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আর্থিক বাজারে স্থিতিশীলতার কারণে আগে অর্থনীতিতে কিছুটা ইতিবাচক ধারা দেখা গিয়েছিল। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই সম্ভাবনাকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
আইএমএফের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত এবং পাল্টা সামরিক প্রতিক্রিয়ার ফলে পরিস্থিতি দ্রুত পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নেয়। এর প্রভাব সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রবাহে পড়েছে। এই কারণে সংস্থাটি প্রচলিত পূর্বাভাস পদ্ধতির পরিবর্তে বিকল্প পূর্বাভাস ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে।
এই বিকল্প পূর্বাভাসে ধারণা করা হয়েছে, সংঘাত ধীরে ধীরে সীমিত হবে এবং ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত কিছুটা কমে আসবে। তবে সতর্ক করে বলা হয়েছে, যদি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশে নেমে যেতে পারে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের ওপরে উঠতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, যুদ্ধের প্রভাব সব দেশ সমানভাবে অনুভব করবে না। উন্নয়নশীল দেশগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে। চলতি বছরে এসব দেশের প্রবৃদ্ধি গড়ে ০.৩ শতাংশ পয়েন্ট কমে যেতে পারে। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর ওপর প্রভাব তুলনামূলক কম হলেও সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগবে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকোচনের পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। ইরানের অর্থনীতি চলতি বছরে ৬.১ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি কাতার, ইরাক, কুয়েত ও বাহরাইনের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এই অঞ্চলের আর্থিক স্থিতিশীলতা আরও দুর্বল হতে পারে।
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রেও এর প্রভাব পড়বে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি কমে ২.৩ শতাংশে নামতে পারে। যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে পূর্বাভাস কমিয়ে ০.৮ শতাংশ করা হয়েছে, যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হ্রাস। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান অর্থনীতিগুলো—জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেন—সবখানেই প্রবৃদ্ধি কমার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এশিয়ার ক্ষেত্রে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। চীনের প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে ৪.৪ শতাংশ হতে পারে। ভারতের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে থেকে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। অন্যদিকে তুরস্ক ও রাশিয়ার অর্থনীতিতেও সীমিত প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস রয়েছে।
আইএমএফ সতর্ক করে বলেছে, বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য উত্তেজনা বাড়ছে, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন সংকট তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির কারণে স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক ভারসাম্যহীনতা বাড়বে।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে অনিশ্চিত বিনিয়োগ এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি বাজার ভবিষ্যতে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিনিয়োগ প্রত্যাশা হঠাৎ পরিবর্তিত হলে শেয়ারবাজারে বড় ধস নামার আশঙ্কাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক অর্থনীতি নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে মনে করছে আইএমএফ, যা আগামী কয়েক বছরে বিশ্ব অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
#আরএ

আপনার মতামত লিখুন