পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনা শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। টানা ২১ ঘণ্টা বৈঠকের পরও দুই পক্ষের মধ্যে মতৈক্য না হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আলোচনার ব্যর্থতার জন্য ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একটি ফোনকলকে দায়ী করেছে তেহরান।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বার্তায় দাবি করেন, বৈঠকের মাঝপথে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচক দলের প্রধান জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে নেতানিয়াহুর ফোনালাপ হয়। ওই ফোনকলের পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক থেকে সরে গিয়ে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও স্বার্থের দিকে মোড় নেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আরাকচি বলেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আয়োজিত আলোচনায় ইরান আন্তরিকভাবে অংশ নিয়েছিল এবং উত্তেজনা প্রশমনে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজতে প্রস্তুত ছিল। তবে বৈঠক শেষে ভ্যান্সের সংবাদ সম্মেলনকে তিনি ‘অপ্রয়োজনীয়’ ও ‘উসকানিমূলক’ বলে মন্তব্য করেন।
যদিও ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত নেতানিয়াহুর ফোনকলের বিষয়টি নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকেও আলোচনার বিস্তারিত ফলাফল নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো অবস্থান জানানো হয়নি। ফলে ইরানের অভিযোগকে ঘিরে নতুন করে কূটনৈতিক জল্পনা শুরু হয়েছে।
ইরানি কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের দাবি, ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র যে শর্ত উপস্থাপন করেছে তা ছিল একতরফা এবং অগ্রহণযোগ্য। তেহরানের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র শুধু হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিজেদের ও মিত্রদের জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায়নি, একই সঙ্গে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা, বিদ্যমান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত হস্তান্তর এবং পারমাণবিক সক্ষমতা সীমিত করার দাবি জানিয়েছে।
ইরানের মতে, এসব শর্তকে ‘চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম প্রস্তাব’ হিসেবে উপস্থাপন করেন জেডি ভ্যান্স। তবে তেহরান মনে করে, এ ধরনের প্রস্তাব আলোচনার ভিত্তি নয়, বরং চাপ প্রয়োগের কৌশল। ফলে আলোচনা এগোনোর পথ সেখানেই আটকে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় ইসরায়েলের অবস্থান সবসময়ই বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। তেলআবিব দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখে আসছে। তাই ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতায় ইসরায়েল সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে—এমন ধারণা নতুন নয়।
আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। ৯ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার আগে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৯ ডলারের ওপরে উঠেছিল, যা হরমুজ সংকট শুরুর পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি। পরে কূটনৈতিক বিরতির কারণে দাম নেমে প্রায় ৯৫ ডলারে এলেও এখন আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এ দিকে বিশ্ববাজারে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে যদি নতুন কোনো সমঝোতা না হয়, তাহলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আবারও বিঘ্নিত হতে পারে। বিশ্বের বড় অংশের তেল পরিবহন এই রুটের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় নতুন অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইসলামাবাদের আলোচনা অনেকের কাছে সম্ভাবনার জানালা ছিল। কিন্তু সেই আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় এখন নজর পরবর্তী কূটনৈতিক উদ্যোগের দিকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত নতুন সংলাপ শুরু না হলে অঞ্চলটি আবারও সংঘাতের দিকে এগোতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
#আরএ
বিষয় : ইরান

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনা শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। টানা ২১ ঘণ্টা বৈঠকের পরও দুই পক্ষের মধ্যে মতৈক্য না হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আলোচনার ব্যর্থতার জন্য ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একটি ফোনকলকে দায়ী করেছে তেহরান।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বার্তায় দাবি করেন, বৈঠকের মাঝপথে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচক দলের প্রধান জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে নেতানিয়াহুর ফোনালাপ হয়। ওই ফোনকলের পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক থেকে সরে গিয়ে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও স্বার্থের দিকে মোড় নেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আরাকচি বলেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আয়োজিত আলোচনায় ইরান আন্তরিকভাবে অংশ নিয়েছিল এবং উত্তেজনা প্রশমনে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজতে প্রস্তুত ছিল। তবে বৈঠক শেষে ভ্যান্সের সংবাদ সম্মেলনকে তিনি ‘অপ্রয়োজনীয়’ ও ‘উসকানিমূলক’ বলে মন্তব্য করেন।
যদিও ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত নেতানিয়াহুর ফোনকলের বিষয়টি নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকেও আলোচনার বিস্তারিত ফলাফল নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো অবস্থান জানানো হয়নি। ফলে ইরানের অভিযোগকে ঘিরে নতুন করে কূটনৈতিক জল্পনা শুরু হয়েছে।
ইরানি কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের দাবি, ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র যে শর্ত উপস্থাপন করেছে তা ছিল একতরফা এবং অগ্রহণযোগ্য। তেহরানের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র শুধু হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিজেদের ও মিত্রদের জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায়নি, একই সঙ্গে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা, বিদ্যমান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত হস্তান্তর এবং পারমাণবিক সক্ষমতা সীমিত করার দাবি জানিয়েছে।
ইরানের মতে, এসব শর্তকে ‘চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম প্রস্তাব’ হিসেবে উপস্থাপন করেন জেডি ভ্যান্স। তবে তেহরান মনে করে, এ ধরনের প্রস্তাব আলোচনার ভিত্তি নয়, বরং চাপ প্রয়োগের কৌশল। ফলে আলোচনা এগোনোর পথ সেখানেই আটকে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় ইসরায়েলের অবস্থান সবসময়ই বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। তেলআবিব দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখে আসছে। তাই ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতায় ইসরায়েল সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে—এমন ধারণা নতুন নয়।
আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। ৯ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার আগে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৯ ডলারের ওপরে উঠেছিল, যা হরমুজ সংকট শুরুর পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি। পরে কূটনৈতিক বিরতির কারণে দাম নেমে প্রায় ৯৫ ডলারে এলেও এখন আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এ দিকে বিশ্ববাজারে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে যদি নতুন কোনো সমঝোতা না হয়, তাহলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আবারও বিঘ্নিত হতে পারে। বিশ্বের বড় অংশের তেল পরিবহন এই রুটের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় নতুন অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইসলামাবাদের আলোচনা অনেকের কাছে সম্ভাবনার জানালা ছিল। কিন্তু সেই আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় এখন নজর পরবর্তী কূটনৈতিক উদ্যোগের দিকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত নতুন সংলাপ শুরু না হলে অঞ্চলটি আবারও সংঘাতের দিকে এগোতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
#আরএ

আপনার মতামত লিখুন