ইরানের আধুনিক রাজনীতি, সামরিক কৌশল এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তেহরানের চিরস্থায়ী দ্বন্দ্বের প্রধান কারিগর ছিলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের পবিত্র নগরী মাশহাদে জন্ম নেওয়া এই নেতা ১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির উত্তরসূরি হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দেশটিকে আমূল বদলে দেন। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক যৌথ হামলায় তাঁর মৃত্যুর সংবাদের পর এখন বিশ্বজুড়ে আলোচিত হচ্ছে তাঁর দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক পরিক্রমা।
খামেনির রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি রচিত হয়েছিল গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে। ১৯৫৩ সালে সিআইএ ও এমআই-সিক্স সমর্থিত অভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে অপসারণের পর শাহের শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন তিনি। প্রখ্যাত আলেমদের সান্নিধ্যে ধর্মতত্ত্ব শিক্ষার পাশাপাশি তিনি আয়াতুল্লাহ খোমেনির ঘনিষ্ঠ অনুসারী হয়ে ওঠেন। শাহবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তৎকালীন গোয়েন্দা সংস্থা ‘সাভাক’ তাঁকে একাধিকবার কারারুদ্ধ ও নির্বাসিত করে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে পাহলভি শাসনের পতনে তিনি সম্মুখসারির ভূমিকা পালন করেন।
বিপ্লবোত্তর ইরানে খামেনির উত্থান ছিল দ্রুত। ১৯৮০ সালে তিনি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালে ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) তদারকির গুরুভার পান। ১৯৮১ সালে ‘মোজাহিদিন-ই-খালক’ (এমইকে) গোষ্ঠীর এক বোমা হামলায় তিনি অল্পের জন্য বেঁচে গেলেও তাঁর ডান হাত অকেজো হয়ে যায়। একই বছর তিনি ইরানের প্রথম ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর এক বিশেষ সাংবিধানিক পরিষদের মাধ্যমে খামেনিকে ‘সুপ্রিম লিডার’ বা সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হয়। তাঁর শাসনামলে আইআরজিসি কেবল একটি সামরিক বাহিনীই নয়, বরং ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মোকাবিলায় তিনি ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’র (Resistance Economy) ধারণা প্রবর্তন করেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল স্বনির্ভরতা অর্জন।
বিশ্লেষক ভ্যালি নাসর-এর মতে, ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা খামেনির মনে এই বিশ্বাস গেঁথে দিয়েছিল যে, পশ্চিমারা সবসময় ইরানের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তিনি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরান-পন্থি গোষ্ঠীগুলোর একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন, যা ‘অক্ষশক্তি’ বা ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ নামে পরিচিত।
তবে খামেনির দীর্ঘ শাসনামল চ্যালেঞ্জমুক্ত ছিল না। ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচন-পরবর্তী বিক্ষোভ, ২০২২ সালে নারী অধিকার নিয়ে আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক চরম অর্থনৈতিক সংকট তাঁর কর্তৃত্বকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে গত জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক অসন্তোষ ১৯৭৯ সালের পর দেশটিতে সবচেয়ে সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
সমালোচকদের মতে, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও পশ্চিমবিরোধী অনমনীয় অবস্থানের কারণে ইরানের সাধারণ মানুষকে চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য দিতে হয়েছে। অন্যদিকে, সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন এক আপসহীন নেতা, যিনি বিদেশি শক্তির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ইরানের মর্যাদা রক্ষা করেছেন। তাঁর প্রয়াণ মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতা ও নতুন অনিশ্চয়তার জন্ম দিল।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ মার্চ ২০২৬
ইরানের আধুনিক রাজনীতি, সামরিক কৌশল এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তেহরানের চিরস্থায়ী দ্বন্দ্বের প্রধান কারিগর ছিলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের পবিত্র নগরী মাশহাদে জন্ম নেওয়া এই নেতা ১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির উত্তরসূরি হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দেশটিকে আমূল বদলে দেন। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক যৌথ হামলায় তাঁর মৃত্যুর সংবাদের পর এখন বিশ্বজুড়ে আলোচিত হচ্ছে তাঁর দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক পরিক্রমা।
খামেনির রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি রচিত হয়েছিল গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে। ১৯৫৩ সালে সিআইএ ও এমআই-সিক্স সমর্থিত অভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে অপসারণের পর শাহের শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন তিনি। প্রখ্যাত আলেমদের সান্নিধ্যে ধর্মতত্ত্ব শিক্ষার পাশাপাশি তিনি আয়াতুল্লাহ খোমেনির ঘনিষ্ঠ অনুসারী হয়ে ওঠেন। শাহবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তৎকালীন গোয়েন্দা সংস্থা ‘সাভাক’ তাঁকে একাধিকবার কারারুদ্ধ ও নির্বাসিত করে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে পাহলভি শাসনের পতনে তিনি সম্মুখসারির ভূমিকা পালন করেন।
বিপ্লবোত্তর ইরানে খামেনির উত্থান ছিল দ্রুত। ১৯৮০ সালে তিনি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালে ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) তদারকির গুরুভার পান। ১৯৮১ সালে ‘মোজাহিদিন-ই-খালক’ (এমইকে) গোষ্ঠীর এক বোমা হামলায় তিনি অল্পের জন্য বেঁচে গেলেও তাঁর ডান হাত অকেজো হয়ে যায়। একই বছর তিনি ইরানের প্রথম ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর এক বিশেষ সাংবিধানিক পরিষদের মাধ্যমে খামেনিকে ‘সুপ্রিম লিডার’ বা সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হয়। তাঁর শাসনামলে আইআরজিসি কেবল একটি সামরিক বাহিনীই নয়, বরং ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মোকাবিলায় তিনি ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’র (Resistance Economy) ধারণা প্রবর্তন করেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল স্বনির্ভরতা অর্জন।
বিশ্লেষক ভ্যালি নাসর-এর মতে, ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা খামেনির মনে এই বিশ্বাস গেঁথে দিয়েছিল যে, পশ্চিমারা সবসময় ইরানের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তিনি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরান-পন্থি গোষ্ঠীগুলোর একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন, যা ‘অক্ষশক্তি’ বা ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ নামে পরিচিত।
তবে খামেনির দীর্ঘ শাসনামল চ্যালেঞ্জমুক্ত ছিল না। ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচন-পরবর্তী বিক্ষোভ, ২০২২ সালে নারী অধিকার নিয়ে আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক চরম অর্থনৈতিক সংকট তাঁর কর্তৃত্বকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে গত জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক অসন্তোষ ১৯৭৯ সালের পর দেশটিতে সবচেয়ে সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
সমালোচকদের মতে, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও পশ্চিমবিরোধী অনমনীয় অবস্থানের কারণে ইরানের সাধারণ মানুষকে চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য দিতে হয়েছে। অন্যদিকে, সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন এক আপসহীন নেতা, যিনি বিদেশি শক্তির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ইরানের মর্যাদা রক্ষা করেছেন। তাঁর প্রয়াণ মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতা ও নতুন অনিশ্চয়তার জন্ম দিল।

আপনার মতামত লিখুন