চলতি বছর চীনের মুসলিমরা একই সময়ে পালন করছেন পবিত্র রমজান মাস ও চীনের চান্দ্র নববর্ষ। চীনা চান্দ্র ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৮ ফেব্রুয়ারি দেশটিতে ছিল নববর্ষের দ্বিতীয় দিন। একই সময় মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শুরু হয় পবিত্র রমজান মাস।
কয়েক দশকের মধ্যে চীনে এই প্রথম দুই গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উপলক্ষ একসঙ্গে উদযাপিত হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর ফলে দেশটির বিভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতির এক ভিন্ন মাত্রা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। চীনে শীতকালীন অয়ন (২১ ডিসেম্বর) পর দ্বিতীয় নতুন চাঁদ ওঠার সঙ্গে চান্দ্র নববর্ষ উদযাপন শুরু হয়। সাধারণত ২১ জানুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যেকোনো একদিন এ উৎসব পালিত হয়, যা বসন্ত উৎসব নামেও পরিচিত। এ উপলক্ষে দেশজুড়ে প্রায় সপ্তাহব্যাপী উৎসব চলে।
বহুজাতিক রাষ্ট্র চীনে এই সময়ের মিলন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। দেশটিতে মোট ৫৬টি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ১০টি মুসলিম জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ হান জাতিগোষ্ঠীর পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য মুসলিম সংখ্যালঘু হলো হুই সম্প্রদায়, যারা সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় এবং সারা দেশে বিস্তৃতভাবে বসবাস করে।
দক্ষিণ চীনের শেনজেন শহরের একটি মসজিদের ইমাম হাজি ইসহাক ঝং গণমাধ্যম দ্য নিউ আরবকে বলেন, চীনের মুসলমানদের কাছে রমজান অত্যন্ত পবিত্র মাস। এ সময় তারা ৩০ দিন রোজা রেখে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করেন এবং ধৈর্য, সহমর্মিতা ও আত্মশুদ্ধির চর্চা করেন। তিনি বলেন, রোজা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হলেও রমজানের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, কারণ এই মাসের ইবাদত মুসলিম পরিচয় ও সংস্কৃতিকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
হাজি ইসহাক জানান, চীনে একসময় রমজান ‘সংযমের মাস’ ও ‘ফেং জাই’ নামে পরিচিত ছিল, যার অর্থ রোজা সম্পন্ন করার মাস। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জিনজিয়াং অঞ্চলের তুর্কিভাষী মুসলিম জাতিগোষ্ঠীগুলো এই মাসকে ‘রো জি’ নামে ডাকে। প্রতি বছরই রমজান আনন্দ ও উৎসাহের সঙ্গে বরণ করা হয় এবং মুসলমানরা একে অপরকে ইবাদতে উৎসাহিত করেন।
রমজানে তারাবির নামাজ ও পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। হাজি ইসহাক বলেন, রমজান শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম নয়; এটি মানুষের আচরণ, চিন্তা ও আত্মসংযমের মাস। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মিথ্যা, অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা মানুষকে আত্মশুদ্ধির পথে পরিচালিত করে এবং আল্লাহভীতি ও মানবিক সহমর্মিতা জাগ্রত করে।
চীনা মুসলমানদের কাছে দান-সদকা রমজানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ সময় তারা একে অপরের বাড়িতে যাতায়াত করেন, খাবার বিনিময় করেন এবং দরিদ্র ও অসহায়দের সহায়তায় এগিয়ে আসেন। বিধবা, এতিম, বৃদ্ধ, অসুস্থ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের খোঁজখবর নেওয়া হয়। এ কারণেই অনেকেই রমজানকে ‘দরিদ্র ও বিপন্নদের স্বস্তির মাস’ বলে অভিহিত করেন।
হাজি ইসহাকের মতে, এবারের রমজান বিশেষভাবে ব্যতিক্রমী, কারণ চীনা চান্দ্র নববর্ষ ও রমজান একই সময়ে শুরু হয়েছে। এতে দেশের প্রধান জাতিগোষ্ঠীগুলোর উৎসবের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি আরও জোরদার হয়েছে। চীনা নববর্ষে যেমন রঙিন লণ্ঠন দিয়ে ঘরবাড়ি ও রাস্তা সাজানো হয় এবং পারিবারিক ভোজের আয়োজন করা হয়, তেমনি সদাচরণ ও সহমর্মিতার যে মূল্যবোধ চর্চা করা হয়, মুসলমানরাও রমজানে তা লালন করেন। ফলে এই মিলন নতুন বছরের শুরুতে কল্যাণ ও সুসংবাদের বার্তা বহন করছে বলে তিনি মনে করেন।
চীনে ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা নীতিগতভাবে স্বীকৃত উল্লেখ করে হাজি ইসহাক জানান, সংবিধান ও আইনের আওতায় নাগরিকরা নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারেন। অধিকাংশ মুসলমান স্বাধীনভাবে ইবাদত করার সুযোগ পান এবং আইন তাদের ধর্মীয় আচার রক্ষায় ভূমিকা রাখে। রমজান মাসে সরকারও বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দেয় এবং ধর্মীয় বিষয়ক দপ্তরগুলো নিরাপত্তা ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করে।
রমজানকে সম্মান জানাতে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় বসবাসকারী অমুসলিমদেরও সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়। ইবাদতস্থলের আশপাশে প্রকাশ্যে খাবার, পানীয় বা ধূমপান এড়িয়ে চলতে বলা হয় এবং রোজাদারদের প্রতি সম্মান দেখাতে উৎসাহ দেওয়া হয়।
চীনে মোট ১০টি মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে হুই ও উইঘুর সবচেয়ে বড়। এ ছাড়া কাজাখ, দোংশিয়াং, কিরগিজ, উজবেক, সালার, তাজিক, বনান ও তাতার জাতিগোষ্ঠীর মুসলমানরা দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করেন। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জিনজিয়াং অঞ্চলকে উইঘুর জনগোষ্ঠীর প্রধান আবাসভূমি হিসেবে ধরা হয়, যেখানে তাদের সংখ্যা প্রায় এক কোটি। অন্যদিকে হুই মুসলমানরা নিংজিয়া, রাজধানী বেইজিং এবং দক্ষিণের গুয়াংজুসহ বিভিন্ন শহরে বসবাস করছেন।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
চলতি বছর চীনের মুসলিমরা একই সময়ে পালন করছেন পবিত্র রমজান মাস ও চীনের চান্দ্র নববর্ষ। চীনা চান্দ্র ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৮ ফেব্রুয়ারি দেশটিতে ছিল নববর্ষের দ্বিতীয় দিন। একই সময় মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শুরু হয় পবিত্র রমজান মাস।
কয়েক দশকের মধ্যে চীনে এই প্রথম দুই গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উপলক্ষ একসঙ্গে উদযাপিত হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর ফলে দেশটির বিভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতির এক ভিন্ন মাত্রা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। চীনে শীতকালীন অয়ন (২১ ডিসেম্বর) পর দ্বিতীয় নতুন চাঁদ ওঠার সঙ্গে চান্দ্র নববর্ষ উদযাপন শুরু হয়। সাধারণত ২১ জানুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যেকোনো একদিন এ উৎসব পালিত হয়, যা বসন্ত উৎসব নামেও পরিচিত। এ উপলক্ষে দেশজুড়ে প্রায় সপ্তাহব্যাপী উৎসব চলে।
বহুজাতিক রাষ্ট্র চীনে এই সময়ের মিলন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। দেশটিতে মোট ৫৬টি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ১০টি মুসলিম জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ হান জাতিগোষ্ঠীর পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য মুসলিম সংখ্যালঘু হলো হুই সম্প্রদায়, যারা সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় এবং সারা দেশে বিস্তৃতভাবে বসবাস করে।
দক্ষিণ চীনের শেনজেন শহরের একটি মসজিদের ইমাম হাজি ইসহাক ঝং গণমাধ্যম দ্য নিউ আরবকে বলেন, চীনের মুসলমানদের কাছে রমজান অত্যন্ত পবিত্র মাস। এ সময় তারা ৩০ দিন রোজা রেখে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করেন এবং ধৈর্য, সহমর্মিতা ও আত্মশুদ্ধির চর্চা করেন। তিনি বলেন, রোজা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হলেও রমজানের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, কারণ এই মাসের ইবাদত মুসলিম পরিচয় ও সংস্কৃতিকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
হাজি ইসহাক জানান, চীনে একসময় রমজান ‘সংযমের মাস’ ও ‘ফেং জাই’ নামে পরিচিত ছিল, যার অর্থ রোজা সম্পন্ন করার মাস। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জিনজিয়াং অঞ্চলের তুর্কিভাষী মুসলিম জাতিগোষ্ঠীগুলো এই মাসকে ‘রো জি’ নামে ডাকে। প্রতি বছরই রমজান আনন্দ ও উৎসাহের সঙ্গে বরণ করা হয় এবং মুসলমানরা একে অপরকে ইবাদতে উৎসাহিত করেন।
রমজানে তারাবির নামাজ ও পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। হাজি ইসহাক বলেন, রমজান শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম নয়; এটি মানুষের আচরণ, চিন্তা ও আত্মসংযমের মাস। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মিথ্যা, অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা মানুষকে আত্মশুদ্ধির পথে পরিচালিত করে এবং আল্লাহভীতি ও মানবিক সহমর্মিতা জাগ্রত করে।
চীনা মুসলমানদের কাছে দান-সদকা রমজানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ সময় তারা একে অপরের বাড়িতে যাতায়াত করেন, খাবার বিনিময় করেন এবং দরিদ্র ও অসহায়দের সহায়তায় এগিয়ে আসেন। বিধবা, এতিম, বৃদ্ধ, অসুস্থ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের খোঁজখবর নেওয়া হয়। এ কারণেই অনেকেই রমজানকে ‘দরিদ্র ও বিপন্নদের স্বস্তির মাস’ বলে অভিহিত করেন।
হাজি ইসহাকের মতে, এবারের রমজান বিশেষভাবে ব্যতিক্রমী, কারণ চীনা চান্দ্র নববর্ষ ও রমজান একই সময়ে শুরু হয়েছে। এতে দেশের প্রধান জাতিগোষ্ঠীগুলোর উৎসবের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি আরও জোরদার হয়েছে। চীনা নববর্ষে যেমন রঙিন লণ্ঠন দিয়ে ঘরবাড়ি ও রাস্তা সাজানো হয় এবং পারিবারিক ভোজের আয়োজন করা হয়, তেমনি সদাচরণ ও সহমর্মিতার যে মূল্যবোধ চর্চা করা হয়, মুসলমানরাও রমজানে তা লালন করেন। ফলে এই মিলন নতুন বছরের শুরুতে কল্যাণ ও সুসংবাদের বার্তা বহন করছে বলে তিনি মনে করেন।
চীনে ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা নীতিগতভাবে স্বীকৃত উল্লেখ করে হাজি ইসহাক জানান, সংবিধান ও আইনের আওতায় নাগরিকরা নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারেন। অধিকাংশ মুসলমান স্বাধীনভাবে ইবাদত করার সুযোগ পান এবং আইন তাদের ধর্মীয় আচার রক্ষায় ভূমিকা রাখে। রমজান মাসে সরকারও বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দেয় এবং ধর্মীয় বিষয়ক দপ্তরগুলো নিরাপত্তা ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করে।
রমজানকে সম্মান জানাতে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় বসবাসকারী অমুসলিমদেরও সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়। ইবাদতস্থলের আশপাশে প্রকাশ্যে খাবার, পানীয় বা ধূমপান এড়িয়ে চলতে বলা হয় এবং রোজাদারদের প্রতি সম্মান দেখাতে উৎসাহ দেওয়া হয়।
চীনে মোট ১০টি মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে হুই ও উইঘুর সবচেয়ে বড়। এ ছাড়া কাজাখ, দোংশিয়াং, কিরগিজ, উজবেক, সালার, তাজিক, বনান ও তাতার জাতিগোষ্ঠীর মুসলমানরা দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করেন। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জিনজিয়াং অঞ্চলকে উইঘুর জনগোষ্ঠীর প্রধান আবাসভূমি হিসেবে ধরা হয়, যেখানে তাদের সংখ্যা প্রায় এক কোটি। অন্যদিকে হুই মুসলমানরা নিংজিয়া, রাজধানী বেইজিং এবং দক্ষিণের গুয়াংজুসহ বিভিন্ন শহরে বসবাস করছেন।

আপনার মতামত লিখুন