মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে সৌদি আরবের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সৌদি একাডেমিক ও লেখক ড. আহমদ আল-তুওয়াইজরি সম্প্রতি এক নিবন্ধে ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক কৌশল নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেন।
ওই নিবন্ধে আল-তুওয়াইজরি অভিযোগ করেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাসকগোষ্ঠী ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে পুরো অঞ্চলের জন্য একটি “ট্রয়ের ঘোড়া” হিসেবে কাজ করছে, যা বৃহৎ ইসরাইল প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ সুগম করতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, আরব বসন্তের পর ইয়েমেন, মিসর, লিবিয়া, তিউনিসিয়া ও সিরিয়ায় গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের প্রচেষ্টা দমনে সৌদি আরব ও আমিরাত দীর্ঘ সময় যৌথভাবে কাজ করেছে।
নিবন্ধটি সৌদি সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলেও প্রকাশের পরপরই তা সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে দাবি করা হয়, এটি কখনোই প্রত্যাহার করা হয়নি। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবাদের পাশাপাশি আমিরাত-সমর্থিত নেটওয়ার্কগুলো লেখককে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগে অভিযুক্ত করে। ইসরাইলপন্থি সংগঠন অ্যান্টি-ডিফেমেশন লিগ তাদের প্রচারণার ফলে নিবন্ধটি সরানো হয়েছে বলে দাবি করে।
আল-তুওয়াইজরির মতে, সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যে বর্তমান মতভেদ শুধু কূটনৈতিক নয়, বরং গভীর কৌশলগত বিরোধের প্রতিফলন। তিনি বলেন, গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন এবং ইয়েমেনসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ঘটনায় এই বিরোধের সূচনা হয়েছে। গাজায় যুদ্ধ চলাকালেও সৌদি আরবে আন্তর্জাতিক উৎসব ও বিভিন্ন আয়োজন অব্যাহত থাকলেও ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল।
তিনি আরও বলেন, ইসরাইলের বর্তমান নীতির কারণে সৌদি আরব উপলব্ধি করেছে যে শান্তির কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই। ইসরাইলের সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নতুন নয়; ১৯৮০ সালে প্রকাশিত সাবেক ইসরাইলি নেতা অ্যারিয়েল শ্যারনের উপদেষ্টা ওদেদ ইননের কৌশলগত নথিতেও মুসলিম আরব দেশগুলোকে বিভক্ত করার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ ছিল।
বর্তমান ইসরাইলি নীতিতেও প্রতিবেশী সিরিয়া ও লেবাননে সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের কথা বলা হচ্ছে, যা অঞ্চলকে খণ্ডিত করার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে সিরিয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং যুক্তরাষ্ট্রের দূতদের অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন ইসরাইলের পরিকল্পনাকে আংশিকভাবে ব্যাহত করেছে।
আল-তুওয়াইজরি অভিযোগ করেন, আমিরাত ইয়েমেন, সুদান ও সোমালিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বিভাজনমূলক কর্মকাণ্ডে সমর্থন দিয়ে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা উসকে দিচ্ছে। তিউনিসিয়ায় বিরোধী দলের জন্য সামরিক যান পাঠানোর চেষ্টা এবং সোমালিল্যান্ডের বিচ্ছিন্নতাকে সমর্থনের বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।
এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব এখন আমিরাত থেকে দূরে সরে তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে এবং ইরানের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালাচ্ছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতির মধ্যেও তেহরানের সঙ্গে আলোচনা শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার অংশ হিসেবে ওমানের মাস্কাটে কূটনৈতিক সংলাপ শুরু হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাপ্রবাহ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন শক্তির সমীকরণ তৈরি করতে পারে এবং সৌদি আরবের পররাষ্ট্রনীতিতে উল্লেখযোগ্য কৌশলগত পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে সৌদি আরবের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সৌদি একাডেমিক ও লেখক ড. আহমদ আল-তুওয়াইজরি সম্প্রতি এক নিবন্ধে ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক কৌশল নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেন।
ওই নিবন্ধে আল-তুওয়াইজরি অভিযোগ করেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাসকগোষ্ঠী ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে পুরো অঞ্চলের জন্য একটি “ট্রয়ের ঘোড়া” হিসেবে কাজ করছে, যা বৃহৎ ইসরাইল প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ সুগম করতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, আরব বসন্তের পর ইয়েমেন, মিসর, লিবিয়া, তিউনিসিয়া ও সিরিয়ায় গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের প্রচেষ্টা দমনে সৌদি আরব ও আমিরাত দীর্ঘ সময় যৌথভাবে কাজ করেছে।
নিবন্ধটি সৌদি সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলেও প্রকাশের পরপরই তা সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে দাবি করা হয়, এটি কখনোই প্রত্যাহার করা হয়নি। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবাদের পাশাপাশি আমিরাত-সমর্থিত নেটওয়ার্কগুলো লেখককে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগে অভিযুক্ত করে। ইসরাইলপন্থি সংগঠন অ্যান্টি-ডিফেমেশন লিগ তাদের প্রচারণার ফলে নিবন্ধটি সরানো হয়েছে বলে দাবি করে।
আল-তুওয়াইজরির মতে, সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যে বর্তমান মতভেদ শুধু কূটনৈতিক নয়, বরং গভীর কৌশলগত বিরোধের প্রতিফলন। তিনি বলেন, গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন এবং ইয়েমেনসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ঘটনায় এই বিরোধের সূচনা হয়েছে। গাজায় যুদ্ধ চলাকালেও সৌদি আরবে আন্তর্জাতিক উৎসব ও বিভিন্ন আয়োজন অব্যাহত থাকলেও ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল।
তিনি আরও বলেন, ইসরাইলের বর্তমান নীতির কারণে সৌদি আরব উপলব্ধি করেছে যে শান্তির কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই। ইসরাইলের সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নতুন নয়; ১৯৮০ সালে প্রকাশিত সাবেক ইসরাইলি নেতা অ্যারিয়েল শ্যারনের উপদেষ্টা ওদেদ ইননের কৌশলগত নথিতেও মুসলিম আরব দেশগুলোকে বিভক্ত করার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ ছিল।
বর্তমান ইসরাইলি নীতিতেও প্রতিবেশী সিরিয়া ও লেবাননে সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের কথা বলা হচ্ছে, যা অঞ্চলকে খণ্ডিত করার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে সিরিয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং যুক্তরাষ্ট্রের দূতদের অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন ইসরাইলের পরিকল্পনাকে আংশিকভাবে ব্যাহত করেছে।
আল-তুওয়াইজরি অভিযোগ করেন, আমিরাত ইয়েমেন, সুদান ও সোমালিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বিভাজনমূলক কর্মকাণ্ডে সমর্থন দিয়ে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা উসকে দিচ্ছে। তিউনিসিয়ায় বিরোধী দলের জন্য সামরিক যান পাঠানোর চেষ্টা এবং সোমালিল্যান্ডের বিচ্ছিন্নতাকে সমর্থনের বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।
এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব এখন আমিরাত থেকে দূরে সরে তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে এবং ইরানের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালাচ্ছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতির মধ্যেও তেহরানের সঙ্গে আলোচনা শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার অংশ হিসেবে ওমানের মাস্কাটে কূটনৈতিক সংলাপ শুরু হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাপ্রবাহ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন শক্তির সমীকরণ তৈরি করতে পারে এবং সৌদি আরবের পররাষ্ট্রনীতিতে উল্লেখযোগ্য কৌশলগত পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন