আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন ইশতেহারের লড়াইয়ে মুখর, যেখানে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের মন জয়ে একগুচ্ছ জনবান্ধব ও সংস্কারমুখী প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এবারের ইশতেহারগুলোতে রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কার, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হলেও, বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা।
বিএনপির ‘ট্রিলিয়ন ডলার’ অর্থনীতির স্বপ্ন
বিএনপির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন দলটির নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের হাল ধরে তিনি ৫১টি বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বিএনপির ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষায় প্রতিটি পরিবারের নারী সদস্যের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষকদের জন্য বীমা ও কার্ড, এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে পোশাক ও মিড ডে মিলের কথা বলা হয়েছে। প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণ, উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টি এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতার অঙ্গীকার করেছে দলটি। এছাড়া আইটি খাতে ১০ লাখ ও সরকারি শূন্য পদে ৫ লাখ কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারেক রহমান।
জামায়াতের ‘ইনসাফভিত্তিক’ রাষ্ট্র ও এনসিপির তরুণ ভাবনা
দীর্ঘ বিরতির পর নিবন্ধন ফিরে পাওয়া জামায়াতে ইসলামী ৪১ দফার ইশতেহারে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত ‘ইনসাফভিত্তিক’ সমাজ গঠনের ডাক দিয়েছে। তারা নারীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মজীবী মায়েদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাব করেছে।
অন্যদিকে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনায় উজ্জীবিত তরুণদের দল এনসিপি জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে লড়ছে। তাদের ৩৬ দফা ইশতেহারে ভোটের বয়স ১৬ বছরে নামিয়ে আনা এবং এক কোটি কর্মসংস্থানের মতো চমকপ্রদ প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া তারা ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন ও গুম-হত্যার বিচারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে।
ইসলামী আন্দোলনের শরিয়া ও পিআর পদ্ধতি
চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তাদের ৩০ দফার ইশতেহারে রাষ্ট্র পরিচালনায় শরিয়ার প্রাধান্য ও মানবাধিকার রক্ষার কথা বলেছে। নির্বাচন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে তারা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি চালুর দাবি জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের শঙ্কা ও পর্যবেক্ষণ
নির্বাচনী এই ইশতেহারগুলো নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বিশেজ্ঞরা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, কর্তৃত্ববাদ-পরবর্তী সময়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে দলগুলো অনেক বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও দুর্নীতি দমন ও নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের স্পষ্ট কৌশল এখানে অনুপস্থিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলেন, "বাংলাদেশে ইশতেহার ঘোষণার রীতি থাকলেও তা বাস্তবায়নের হার অত্যন্ত কম। এবারের ইশতেহারে অনেক চমক থাকলেও এগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা কতটুকু থাকবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে সংশয় রয়েই গেছে।"

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন ইশতেহারের লড়াইয়ে মুখর, যেখানে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের মন জয়ে একগুচ্ছ জনবান্ধব ও সংস্কারমুখী প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এবারের ইশতেহারগুলোতে রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কার, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হলেও, বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা।
বিএনপির ‘ট্রিলিয়ন ডলার’ অর্থনীতির স্বপ্ন
বিএনপির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন দলটির নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের হাল ধরে তিনি ৫১টি বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বিএনপির ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষায় প্রতিটি পরিবারের নারী সদস্যের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষকদের জন্য বীমা ও কার্ড, এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে পোশাক ও মিড ডে মিলের কথা বলা হয়েছে। প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণ, উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টি এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতার অঙ্গীকার করেছে দলটি। এছাড়া আইটি খাতে ১০ লাখ ও সরকারি শূন্য পদে ৫ লাখ কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারেক রহমান।
জামায়াতের ‘ইনসাফভিত্তিক’ রাষ্ট্র ও এনসিপির তরুণ ভাবনা
দীর্ঘ বিরতির পর নিবন্ধন ফিরে পাওয়া জামায়াতে ইসলামী ৪১ দফার ইশতেহারে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত ‘ইনসাফভিত্তিক’ সমাজ গঠনের ডাক দিয়েছে। তারা নারীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মজীবী মায়েদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাব করেছে।
অন্যদিকে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনায় উজ্জীবিত তরুণদের দল এনসিপি জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে লড়ছে। তাদের ৩৬ দফা ইশতেহারে ভোটের বয়স ১৬ বছরে নামিয়ে আনা এবং এক কোটি কর্মসংস্থানের মতো চমকপ্রদ প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া তারা ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন ও গুম-হত্যার বিচারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে।
ইসলামী আন্দোলনের শরিয়া ও পিআর পদ্ধতি
চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তাদের ৩০ দফার ইশতেহারে রাষ্ট্র পরিচালনায় শরিয়ার প্রাধান্য ও মানবাধিকার রক্ষার কথা বলেছে। নির্বাচন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে তারা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি চালুর দাবি জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের শঙ্কা ও পর্যবেক্ষণ
নির্বাচনী এই ইশতেহারগুলো নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বিশেজ্ঞরা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, কর্তৃত্ববাদ-পরবর্তী সময়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে দলগুলো অনেক বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও দুর্নীতি দমন ও নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের স্পষ্ট কৌশল এখানে অনুপস্থিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলেন, "বাংলাদেশে ইশতেহার ঘোষণার রীতি থাকলেও তা বাস্তবায়নের হার অত্যন্ত কম। এবারের ইশতেহারে অনেক চমক থাকলেও এগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা কতটুকু থাকবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে সংশয় রয়েই গেছে।"

আপনার মতামত লিখুন