বাংলাদেশে মাদকাসক্তি এখন আর পর্দার আড়ালের কোনো বিষয় নয়, বরং এটি একটি জাতীয় জরুরি অবস্থায় পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক জাতীয় গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৮২ লাখ মানুষ বর্তমানে মাদকাসক্ত। এর মধ্যে আঁতকে ওঠার মতো তথ্য হলো, মাদকাসক্তদের বড় একটি অংশই শিশু ও কিশোর বয়সে এই অন্ধকার জগতে পা বাড়িয়েছে। গত রবিবার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই গবেষণার তথ্য প্রকাশ করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই গবেষণায় সিগারেটকে মাদকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মাদক ব্যবহারের হারের দিক থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগ। তবে সংখ্যার বিচারে সবচেয়ে বেশি মাদকসেবী বাস করেন ঢাকা বিভাগে, যেখানে প্রায় ২৩ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত। এরপরই ১৮ লাখ ৭৯ হাজার মাদকসেবী নিয়ে চট্টগ্রামের অবস্থান। তুলনামূলকভাবে রাজশাহী ও খুলনায় মাদকের বিস্তার কিছুটা কম দেখা গেছে।
মাদকের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায় যে গাঁজা দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় মাদক, যা ব্যবহার করেন প্রায় ৬১ লাখ মানুষ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ইয়াবার গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ২৩ লাখ। এছাড়া প্রায় ৩৯ হাজার মানুষ ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক নেন, যা এইচআইভি ও হেপাটাইটিস সংক্রমণের চরম ঝুঁকি তৈরি করেছে। আর্থিক দিক থেকে একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি প্রতি মাসে গড়ে ৬ হাজার টাকা মাদকের পেছনে ব্যয় করেন, যা দেশের অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশ হলো বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যান। দেখা গেছে, ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী মাত্র ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যে প্রথম মাদক গ্রহণ করে। অর্থাৎ কিশোর বয়সেই এক-তৃতীয়াংশ মাদকাসক্ত হচ্ছে। এছাড়া ৫৯ শতাংশ শুরু করে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে। প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন যে হাতের নাগালেই মাদক পাওয়া যায়।
মাদক ছাড়ার ইচ্ছা থাকলেও অর্ধেকের বেশি মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তা পাচ্ছেন না। মাত্র ১৩ শতাংশ ব্যবহারকারী এ পর্যন্ত কোনো ধরণের পুনর্বাসন সেবা পেয়েছেন। ৬৯ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন যে তাদের জন্য সুচিকিৎসা ও কাউন্সেলিং সবচেয়ে জরুরি। এছাড়া ৬৮ শতাংশ ভুক্তভোগী সামাজিকভাবে চরম অপবাদ ও বৈষম্যের শিকার হন, যা তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ বন্ধ করে দেয়।
বিএমইউর ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন যে মাদকাসক্তরা আমাদের বাইরের কেউ নয়, আমাদের সন্তানরাই এই ঝুঁকির মধ্যে আছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ জানান যে পরিবার থেকেই প্রতিরোধ শুরু করতে হবে। পাশাপাশি সরকারিভাবে ঢাকার বাইরে আরও সাতটি বিভাগে ২০০ শয্যার পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে মাদক নির্মূলে শুধু পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয়। এর চাহিদা কমাতে পারিবারিক সচেতনতা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশে মাদকাসক্তি এখন আর পর্দার আড়ালের কোনো বিষয় নয়, বরং এটি একটি জাতীয় জরুরি অবস্থায় পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক জাতীয় গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৮২ লাখ মানুষ বর্তমানে মাদকাসক্ত। এর মধ্যে আঁতকে ওঠার মতো তথ্য হলো, মাদকাসক্তদের বড় একটি অংশই শিশু ও কিশোর বয়সে এই অন্ধকার জগতে পা বাড়িয়েছে। গত রবিবার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই গবেষণার তথ্য প্রকাশ করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই গবেষণায় সিগারেটকে মাদকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মাদক ব্যবহারের হারের দিক থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগ। তবে সংখ্যার বিচারে সবচেয়ে বেশি মাদকসেবী বাস করেন ঢাকা বিভাগে, যেখানে প্রায় ২৩ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত। এরপরই ১৮ লাখ ৭৯ হাজার মাদকসেবী নিয়ে চট্টগ্রামের অবস্থান। তুলনামূলকভাবে রাজশাহী ও খুলনায় মাদকের বিস্তার কিছুটা কম দেখা গেছে।
মাদকের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায় যে গাঁজা দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় মাদক, যা ব্যবহার করেন প্রায় ৬১ লাখ মানুষ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ইয়াবার গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ২৩ লাখ। এছাড়া প্রায় ৩৯ হাজার মানুষ ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক নেন, যা এইচআইভি ও হেপাটাইটিস সংক্রমণের চরম ঝুঁকি তৈরি করেছে। আর্থিক দিক থেকে একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি প্রতি মাসে গড়ে ৬ হাজার টাকা মাদকের পেছনে ব্যয় করেন, যা দেশের অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশ হলো বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যান। দেখা গেছে, ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী মাত্র ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যে প্রথম মাদক গ্রহণ করে। অর্থাৎ কিশোর বয়সেই এক-তৃতীয়াংশ মাদকাসক্ত হচ্ছে। এছাড়া ৫৯ শতাংশ শুরু করে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে। প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন যে হাতের নাগালেই মাদক পাওয়া যায়।
মাদক ছাড়ার ইচ্ছা থাকলেও অর্ধেকের বেশি মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তা পাচ্ছেন না। মাত্র ১৩ শতাংশ ব্যবহারকারী এ পর্যন্ত কোনো ধরণের পুনর্বাসন সেবা পেয়েছেন। ৬৯ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন যে তাদের জন্য সুচিকিৎসা ও কাউন্সেলিং সবচেয়ে জরুরি। এছাড়া ৬৮ শতাংশ ভুক্তভোগী সামাজিকভাবে চরম অপবাদ ও বৈষম্যের শিকার হন, যা তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ বন্ধ করে দেয়।
বিএমইউর ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন যে মাদকাসক্তরা আমাদের বাইরের কেউ নয়, আমাদের সন্তানরাই এই ঝুঁকির মধ্যে আছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ জানান যে পরিবার থেকেই প্রতিরোধ শুরু করতে হবে। পাশাপাশি সরকারিভাবে ঢাকার বাইরে আরও সাতটি বিভাগে ২০০ শয্যার পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে মাদক নির্মূলে শুধু পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয়। এর চাহিদা কমাতে পারিবারিক সচেতনতা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

আপনার মতামত লিখুন