ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

ভেনেজুয়েলার পর এবার পাঁচ দেশে নজর ট্রাম্পের


নিজস্ব প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬

ভেনেজুয়েলার পর এবার পাঁচ দেশে নজর ট্রাম্পের

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে নাটকীয় সামরিক অভিযানে ক্ষমতাচ্যুত করার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বরাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। অভিযান সফল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেন—এটি হয়তো ছিল প্রথম পদক্ষেপ, কারণ ট্রাম্প প্রশাসন এখন নজর দিচ্ছে আরও পাঁচটি দেশের দিকে। এসব দেশ হলো—কিউবা, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, ইরান ও গ্রিনল্যান্ড। প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক অবস্থান, কৌশলগত গুরুত্ব ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্বসংঘাতই নতুন করে উত্তেজনার কারণ হয়ে উঠেছে।

ভেনেজুয়েলার ঘটনার পর ট্রাম্প প্রথম যে দেশের নাম উল্লেখ করেন তা হলো কিউবা। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং দীর্ঘদিনের সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে ট্রাম্প “ready to fall”— অর্থাৎ পতনের কাছাকাছি বলে মন্তব্য করেন। ইতিহাস বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার সম্পর্ক কয়েক দশক ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ। ঠান্ডা যুদ্ধের সময়কার ‘কিউবান মিসাইল সংকট’ থেকে শুরু করে ভিন্ন মতাদর্শিক অবস্থান—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক কখনোই স্বাভাবিক হয়নি। কিউবা এখনো রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং ভেনেজুয়েলার মাদুরো সরকারকেও সমর্থন দিয়ে আসছে। এ কারণেই ট্রাম্প মনে করেন, কিউবা মার্কিন স্বার্থের জন্য হুমকি এবং প্রয়োজন হলে নতুন চাপ বা হস্তক্ষেপ হতে পারে।

এরপর আলোচনায় আসে কলম্বিয়া—লাতিন আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশ। বর্তমান প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রো বামধারার রাজনীতিবিদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা ও বৈদেশিক নীতির সমালোচক হিসেবে পরিচিত। ট্রাম্প তাঁকে ‘বিপজ্জনক নেতা’ বলে আখ্যা দিয়ে দাবি করেন যে পেট্রো নাকি লাতিন অঞ্চলে অস্থিরতা ছড়াচ্ছেন। অতীতে কলম্বিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল, বিশেষত মাদকবিরোধী ‘প্ল্যান কলম্বিয়া’–র সময়। কিন্তু পেট্রো ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। সাম্প্রতিক বিবৃতিতে পেট্রো স্পষ্ট করে বলেছেন—কোনো বাহ্যিক হস্তক্ষেপ তিনি সহ্য করবেন না এবং প্রয়োজনে সামরিক প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন। এই অবস্থানই অঞ্চলটিতে নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে।

তৃতীয় দেশ মেক্সিকো, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী এবং সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদারদের একটি। দুই দেশের মধ্যকার সীমান্ত সমস্যা, অভিবাসী সংকট, মানবপাচার ও ড্রাগ কার্টেলের সহিংস কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনার কারণ। ট্রাম্প আবারও অভিযোগ তুলেছেন যে মেক্সিকো নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে কার্টেল দমন করছে না। তিনি ইঙ্গিত দেন—প্রয়োজনে মেক্সিকোর ভেতরেও ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ সামরিক অভিযান চালানো হতে পারে। মেক্সিকো সরকার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে—যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বাহিনী মেক্সিকোর ভূমিতে প্রবেশ করলে তা সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন হবে এবং তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। যুক্তরাষ্ট্র–মেক্সিকো সম্পর্কের জটিলতা এখন আরও গভীর হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী দেশ ইরান ট্রাম্পের নজরে থাকা অন্যতম বড় লক্ষ্য। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, ইরাক-সিরিয়া-লেবাননজুড়ে তাদের প্রভাব, যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীদের সমর্থন—সব মিলিয়ে ইরান বহুদিন ধরেই মার্কিন নীতির বিরোধী শক্তি। ভেনেজুয়েলার ঘটনার পর ট্রাম্প বলেন, “ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ আসছে।” এতে তেহরান তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আগ্রাসী আচরণের সতর্কবার্তা দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানকে লক্ষ্য করে সামরিক অভিযান হলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে বিপর্যস্ত করবে।

সবশেষে আসে সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত নাম গ্রিনল্যান্ড—বিশাল বরফাচ্ছাদিত দ্বীপ, যা ভৌগোলিকভাবে ডেনমার্কের অধীনস্থ। গ্রিনল্যান্ড আর্কটিক অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় এর সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। ২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রকাশ্যে গ্রিনল্যান্ড ‘কিনে নেওয়ার’ আগ্রহ দেখিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন। এবার ভেনেজুয়েলার ঘটনার পর তিনি বলেন—“গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” যদিও ডেনমার্ক এসব মন্তব্যকে ‘হাস্যকর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্কটিকে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব বাড়ায় ট্রাম্প সেখানে কৌশলগত উপস্থিতি বাড়াতে চান।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্পের এই পাঁচ দেশের প্রতি নতুন মনোযোগ বিশ্বরাজনীতিকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া ও চীন ভেনেজুয়েলা অভিযানের সমালোচনা করেছে। এখন এই পাঁচ দেশের যে কোনো একটিতে সামরিক পদক্ষেপ বা কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি হলে তার প্রভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে। ভেনেজুয়েলার পর ট্রাম্প প্রশাসন কী নতুন পদক্ষেপ নেয়—তা এখন বিশ্বের বড় কূটনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


ভেনেজুয়েলার পর এবার পাঁচ দেশে নজর ট্রাম্পের

প্রকাশের তারিখ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে নাটকীয় সামরিক অভিযানে ক্ষমতাচ্যুত করার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বরাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। অভিযান সফল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেন—এটি হয়তো ছিল প্রথম পদক্ষেপ, কারণ ট্রাম্প প্রশাসন এখন নজর দিচ্ছে আরও পাঁচটি দেশের দিকে। এসব দেশ হলো—কিউবা, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, ইরান ও গ্রিনল্যান্ড। প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক অবস্থান, কৌশলগত গুরুত্ব ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্বসংঘাতই নতুন করে উত্তেজনার কারণ হয়ে উঠেছে।

ভেনেজুয়েলার ঘটনার পর ট্রাম্প প্রথম যে দেশের নাম উল্লেখ করেন তা হলো কিউবা। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং দীর্ঘদিনের সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে ট্রাম্প “ready to fall”— অর্থাৎ পতনের কাছাকাছি বলে মন্তব্য করেন। ইতিহাস বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার সম্পর্ক কয়েক দশক ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ। ঠান্ডা যুদ্ধের সময়কার ‘কিউবান মিসাইল সংকট’ থেকে শুরু করে ভিন্ন মতাদর্শিক অবস্থান—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক কখনোই স্বাভাবিক হয়নি। কিউবা এখনো রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং ভেনেজুয়েলার মাদুরো সরকারকেও সমর্থন দিয়ে আসছে। এ কারণেই ট্রাম্প মনে করেন, কিউবা মার্কিন স্বার্থের জন্য হুমকি এবং প্রয়োজন হলে নতুন চাপ বা হস্তক্ষেপ হতে পারে।

এরপর আলোচনায় আসে কলম্বিয়া—লাতিন আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশ। বর্তমান প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রো বামধারার রাজনীতিবিদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা ও বৈদেশিক নীতির সমালোচক হিসেবে পরিচিত। ট্রাম্প তাঁকে ‘বিপজ্জনক নেতা’ বলে আখ্যা দিয়ে দাবি করেন যে পেট্রো নাকি লাতিন অঞ্চলে অস্থিরতা ছড়াচ্ছেন। অতীতে কলম্বিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল, বিশেষত মাদকবিরোধী ‘প্ল্যান কলম্বিয়া’–র সময়। কিন্তু পেট্রো ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। সাম্প্রতিক বিবৃতিতে পেট্রো স্পষ্ট করে বলেছেন—কোনো বাহ্যিক হস্তক্ষেপ তিনি সহ্য করবেন না এবং প্রয়োজনে সামরিক প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন। এই অবস্থানই অঞ্চলটিতে নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে।

তৃতীয় দেশ মেক্সিকো, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী এবং সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদারদের একটি। দুই দেশের মধ্যকার সীমান্ত সমস্যা, অভিবাসী সংকট, মানবপাচার ও ড্রাগ কার্টেলের সহিংস কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনার কারণ। ট্রাম্প আবারও অভিযোগ তুলেছেন যে মেক্সিকো নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে কার্টেল দমন করছে না। তিনি ইঙ্গিত দেন—প্রয়োজনে মেক্সিকোর ভেতরেও ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ সামরিক অভিযান চালানো হতে পারে। মেক্সিকো সরকার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে—যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বাহিনী মেক্সিকোর ভূমিতে প্রবেশ করলে তা সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন হবে এবং তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। যুক্তরাষ্ট্র–মেক্সিকো সম্পর্কের জটিলতা এখন আরও গভীর হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী দেশ ইরান ট্রাম্পের নজরে থাকা অন্যতম বড় লক্ষ্য। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, ইরাক-সিরিয়া-লেবাননজুড়ে তাদের প্রভাব, যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীদের সমর্থন—সব মিলিয়ে ইরান বহুদিন ধরেই মার্কিন নীতির বিরোধী শক্তি। ভেনেজুয়েলার ঘটনার পর ট্রাম্প বলেন, “ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ আসছে।” এতে তেহরান তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আগ্রাসী আচরণের সতর্কবার্তা দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানকে লক্ষ্য করে সামরিক অভিযান হলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে বিপর্যস্ত করবে।

সবশেষে আসে সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত নাম গ্রিনল্যান্ড—বিশাল বরফাচ্ছাদিত দ্বীপ, যা ভৌগোলিকভাবে ডেনমার্কের অধীনস্থ। গ্রিনল্যান্ড আর্কটিক অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় এর সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। ২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রকাশ্যে গ্রিনল্যান্ড ‘কিনে নেওয়ার’ আগ্রহ দেখিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন। এবার ভেনেজুয়েলার ঘটনার পর তিনি বলেন—“গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” যদিও ডেনমার্ক এসব মন্তব্যকে ‘হাস্যকর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্কটিকে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব বাড়ায় ট্রাম্প সেখানে কৌশলগত উপস্থিতি বাড়াতে চান।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্পের এই পাঁচ দেশের প্রতি নতুন মনোযোগ বিশ্বরাজনীতিকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া ও চীন ভেনেজুয়েলা অভিযানের সমালোচনা করেছে। এখন এই পাঁচ দেশের যে কোনো একটিতে সামরিক পদক্ষেপ বা কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি হলে তার প্রভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে। ভেনেজুয়েলার পর ট্রাম্প প্রশাসন কী নতুন পদক্ষেপ নেয়—তা এখন বিশ্বের বড় কূটনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ