ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

কুয়াশার চাদরে ঢাকা মানবেতর জীবনের গল্প

শীতের রাতে রিকশাই যখন একমাত্র আশ্রয়


মাসুদ রানা :
মাসুদ রানা :
প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬

শীতের রাতে রিকশাই যখন একমাত্র আশ্রয়

শীত এলেই শহরের আলো–ঝলমলে রাস্তার আড়ালে ভেসে ওঠে এক নির্মম বাস্তবতা। যাদের পেশা রিক্সা চালানো, অথচ মাথা গোঁজার মতো কোনো ঘর নেই—তাদের অনেকেই রাত নামলেই রিক্সাটাকেই বানান বিছানা। তীব্র শীত, হিমেল বাতাস আর কুয়াশার মধ্যে রিক্সার সিটে কিংবা প্যাডেলের পাশে গুটিশুটি হয়ে কাটে তাদের রাত। শহর ঘুমিয়ে পড়লেও এই মানুষগুলোর রাত কাটে অনিশ্চয়তা, শারীরিক কষ্ট আর মানসিক আতঙ্কে।

দিনভর কঠোর পরিশ্রম করে যে রিক্সাচালক কয়েকশ টাকা আয় করেন, সেই টাকায় খাবার জোটালেও ভাড়া দেওয়া ঘরের ব্যবস্থা করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। কেউ কেউ গ্রাম থেকে কাজের সন্ধানে এসে শহরে ঠাঁই পাননি, কেউ আবার পারিবারিক ভাঙন বা আর্থিক বিপর্যয়ে গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। ফলে রাতের আশ্রয় হিসেবে বেছে নিতে হয় ফুটপাত, উড়ালসেতুর নিচ, বাসস্ট্যান্ড কিংবা নিজের রিক্সাটিকেই। শীতকালে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়—ভেজা কুয়াশা শরীর ভেদ করে ঢুকে পড়ে, কাপড় ভিজে যায়, অসুস্থতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

রিক্সায় রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা শুধু শারীরিক কষ্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চুরি, ছিনতাই কিংবা হয়রানির আশঙ্কা সারাক্ষণ তাড়া করে বেড়ায়। কখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাড়নায় স্থান বদলাতে হয়, কখনো স্থানীয় প্রভাবশালীদের রোষানলে পড়তে হয়। নিরাপত্তাহীনতার এই বোধ তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলে। পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ায় পরদিন কাজে মনোযোগ কমে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে, আয়ও কমে যায়—ফলে দারিদ্র্যের চক্র আরও দৃঢ় হয়।

শীতজনিত অসুস্থতা এসব গৃহহীন রিক্সাচালকের নিত্যসঙ্গী। সর্দি-কাশি, জ্বর, শ্বাসকষ্ট থেকে শুরু করে নিউমোনিয়ার মতো জটিল রোগের আশঙ্কা থাকে। চিকিৎসার সুযোগ সীমিত, ওষুধ কেনার সামর্থ্যও অনেক সময় থাকে না। সরকারি বা বেসরকারি শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রম কিছুটা স্বস্তি দিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অনেকেই শীতবস্ত্র পান না, কিংবা পেলেও তা পর্যাপ্ত নয় দীর্ঘ রাত পার করার জন্য।

এই মানবেতর জীবনযাপনের পেছনে রয়েছে কাঠামোগত সমস্যা। শহরে স্বল্প আয়ের শ্রমজীবীদের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী রাত্রীকালীন আশ্রয়কেন্দ্রের অভাব, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার ঘাটতি—সব মিলিয়ে গৃহহীন রিক্সাচালকেরা পড়ে থাকেন নীতিনির্ধারকদের নজরের বাইরে। অথচ এই মানুষগুলোর শ্রমেই শহরের পরিবহনব্যবস্থা সচল থাকে, অফিস–আদালত, বাজার–ঘাটে পৌঁছাতে ভরসা পাওয়া যায়।

সমাধানের পথ একেবারে অজানা নয়। শীতকালে অস্থায়ী হলেও রাত্রীকালীন আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা, কম খরচে স্বাস্থ্যসেবা ও শীতবস্ত্র নিশ্চিত করা, শ্রমজীবী গৃহহীনদের জন্য নিবন্ধনভিত্তিক সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ—এসব উদ্যোগ তাদের জীবনে তাৎক্ষণিক স্বস্তি আনতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী আবাসন ও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।

শহরের ব্যস্ত রাস্তায় চলতে চলতে আমরা হয়তো এই মানুষগুলোর দিকে তাকানোর সময় পাই না। কিন্তু শীতের রাতে রিক্সার সিটে গুটিশুটি হয়ে থাকা প্রতিটি মানুষ আমাদের নগর জীবনেরই অংশ। তাদের কষ্টকে উপেক্ষা করা মানে মানবিকতার এক বড় অংশকে অস্বীকার করা। শীতের কুয়াশা কাটবে, সূর্য উঠবে—কিন্তু এই গৃহহীন রিক্সাচালকদের জীবনে স্থায়ী উষ্ণতা আনতে প্রয়োজন সম্মিলিত দায়িত্ববোধ ও কার্যকর উদ্যোগ।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


শীতের রাতে রিকশাই যখন একমাত্র আশ্রয়

প্রকাশের তারিখ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image

শীত এলেই শহরের আলো–ঝলমলে রাস্তার আড়ালে ভেসে ওঠে এক নির্মম বাস্তবতা। যাদের পেশা রিক্সা চালানো, অথচ মাথা গোঁজার মতো কোনো ঘর নেই—তাদের অনেকেই রাত নামলেই রিক্সাটাকেই বানান বিছানা। তীব্র শীত, হিমেল বাতাস আর কুয়াশার মধ্যে রিক্সার সিটে কিংবা প্যাডেলের পাশে গুটিশুটি হয়ে কাটে তাদের রাত। শহর ঘুমিয়ে পড়লেও এই মানুষগুলোর রাত কাটে অনিশ্চয়তা, শারীরিক কষ্ট আর মানসিক আতঙ্কে।


দিনভর কঠোর পরিশ্রম করে যে রিক্সাচালক কয়েকশ টাকা আয় করেন, সেই টাকায় খাবার জোটালেও ভাড়া দেওয়া ঘরের ব্যবস্থা করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। কেউ কেউ গ্রাম থেকে কাজের সন্ধানে এসে শহরে ঠাঁই পাননি, কেউ আবার পারিবারিক ভাঙন বা আর্থিক বিপর্যয়ে গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। ফলে রাতের আশ্রয় হিসেবে বেছে নিতে হয় ফুটপাত, উড়ালসেতুর নিচ, বাসস্ট্যান্ড কিংবা নিজের রিক্সাটিকেই। শীতকালে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়—ভেজা কুয়াশা শরীর ভেদ করে ঢুকে পড়ে, কাপড় ভিজে যায়, অসুস্থতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।


রিক্সায় রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা শুধু শারীরিক কষ্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চুরি, ছিনতাই কিংবা হয়রানির আশঙ্কা সারাক্ষণ তাড়া করে বেড়ায়। কখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাড়নায় স্থান বদলাতে হয়, কখনো স্থানীয় প্রভাবশালীদের রোষানলে পড়তে হয়। নিরাপত্তাহীনতার এই বোধ তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলে। পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ায় পরদিন কাজে মনোযোগ কমে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে, আয়ও কমে যায়—ফলে দারিদ্র্যের চক্র আরও দৃঢ় হয়।


শীতজনিত অসুস্থতা এসব গৃহহীন রিক্সাচালকের নিত্যসঙ্গী। সর্দি-কাশি, জ্বর, শ্বাসকষ্ট থেকে শুরু করে নিউমোনিয়ার মতো জটিল রোগের আশঙ্কা থাকে। চিকিৎসার সুযোগ সীমিত, ওষুধ কেনার সামর্থ্যও অনেক সময় থাকে না। সরকারি বা বেসরকারি শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রম কিছুটা স্বস্তি দিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অনেকেই শীতবস্ত্র পান না, কিংবা পেলেও তা পর্যাপ্ত নয় দীর্ঘ রাত পার করার জন্য।


এই মানবেতর জীবনযাপনের পেছনে রয়েছে কাঠামোগত সমস্যা। শহরে স্বল্প আয়ের শ্রমজীবীদের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী রাত্রীকালীন আশ্রয়কেন্দ্রের অভাব, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার ঘাটতি—সব মিলিয়ে গৃহহীন রিক্সাচালকেরা পড়ে থাকেন নীতিনির্ধারকদের নজরের বাইরে। অথচ এই মানুষগুলোর শ্রমেই শহরের পরিবহনব্যবস্থা সচল থাকে, অফিস–আদালত, বাজার–ঘাটে পৌঁছাতে ভরসা পাওয়া যায়।


সমাধানের পথ একেবারে অজানা নয়। শীতকালে অস্থায়ী হলেও রাত্রীকালীন আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা, কম খরচে স্বাস্থ্যসেবা ও শীতবস্ত্র নিশ্চিত করা, শ্রমজীবী গৃহহীনদের জন্য নিবন্ধনভিত্তিক সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ—এসব উদ্যোগ তাদের জীবনে তাৎক্ষণিক স্বস্তি আনতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী আবাসন ও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।


শহরের ব্যস্ত রাস্তায় চলতে চলতে আমরা হয়তো এই মানুষগুলোর দিকে তাকানোর সময় পাই না। কিন্তু শীতের রাতে রিক্সার সিটে গুটিশুটি হয়ে থাকা প্রতিটি মানুষ আমাদের নগর জীবনেরই অংশ। তাদের কষ্টকে উপেক্ষা করা মানে মানবিকতার এক বড় অংশকে অস্বীকার করা। শীতের কুয়াশা কাটবে, সূর্য উঠবে—কিন্তু এই গৃহহীন রিক্সাচালকদের জীবনে স্থায়ী উষ্ণতা আনতে প্রয়োজন সম্মিলিত দায়িত্ববোধ ও কার্যকর উদ্যোগ।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ