ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

বনজীবীদের জীবনে চিকিৎসার সংকট

সুন্দরবনে নেই পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা


নিজস্ব প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫

সুন্দরবনে নেই পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে বসবাসরত ও বননির্ভর লক্ষাধিক মানুষের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা নেই। চিকিৎসা অবকাঠামোর ঘাটতি, ডাক্তার-নার্সের সংকট এবং দূরবর্তী নদী-খালঘেরা ভৌগোলিক অবস্থান মিলে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে দাবি জানানো হলেও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

উপকূলীয় শ্যামনগর, আশাশুনি, কয়রা, দাকোপ, মংলা—এসব অঞ্চলের মানুষ প্রাত্যহিক জীবিকার জন্য নির্ভরশীল সুন্দরবনের ওপর। জেলে, মৌয়াল, বাওয়ালি ও কাঁকড়া সংগ্রহকারী শ্রমিকদের প্রতিদিনই নদী ও বনের গভীরে যেতে হয়। কিন্তু দুর্ঘটনা, সাপের কামড়, নৌযান ডুবি বা বন্যপ্রাণীর আক্রমণের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সুন্দরবনের আশপাশে স্থায়ী বা আধুনিক কোনো হাসপাতাল নেই। কয়েকটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও সেখানে চিকিৎসকের অভাব প্রকট। অধিকাংশ কেন্দ্রেই নিয়মিত ডাক্তার না থাকায় রোগীরা সঠিক সেবা থেকে বঞ্চিত হন। চিকিৎসা সরঞ্জাম, জরুরি ওষুধ ও পরীক্ষার উপকরণেও রয়েছে সংকট। ফলে সামান্য অসুস্থতা থেকে জরুরি রোগ—সবই উপেক্ষিত থেকে যায়।

চিকিৎসা নিতে হলে অধিকাংশ বনজীবীকে নৌকায় ২ থেকে ৬ ঘণ্টা ভ্রমণ করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা জেলা সদর হাসপাতালে যেতে হয়। বর্ষাকাল, ঘূর্ণিঝড় বা জোয়ারের সময় এ যাত্রা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই জটিলতায় পড়েন। দ্রুত চিকিৎসার অভাবকে “জীবন-মৃত্যুর মাঝে সময়ের পরিবর্তন” হিসেবে বর্ণনা করেছেন স্থানীয়দের অনেকে।

এদিকে অর্থনৈতিক দিক থেকেও চরম সংকটে রয়েছেন বনজীবীরা। তাদের দৈনিক আয় খুবই সীমিত। শহরে গিয়ে চিকিৎসা করানো, যাতায়াত ভাড়া, ওষুধ—সব মিলিয়ে খরচ সামলানো তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে স্থানীয় অদক্ষ চিকিৎসক বা কোয়াকদের সাহায্য নেন, যা ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি বাড়ায়।

স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, নারীরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার। গর্ভবতী মা, কিশোরী ও শিশুর জন্য কোনো বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র নেই। নিরাপদ প্রসব, নবজাতকের চিকিৎসা ও নিয়মিত টিকা কার্যক্রম অনেক জায়গায় বাধাগ্রস্ত হয়। এতে নারীর মৃত্যু ঝুঁকি ও শিশুর অপুষ্টি হারও তুলনামূলক বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় এখনই প্রয়োজন কার্যকর সরকারি পদক্ষেপ। ভাসমান হাসপাতাল, নৌ-অ্যাম্বুলেন্স, মোবাইল মেডিকেল টিম, উন্নত সাব-সেন্টার, পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগ এবং জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম—এসব নিশ্চিত করতে পারলে দুর্গম এলাকার মানুষের জীবনমান বদলে দিতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, “সুন্দরবন দেশের সম্পদ—আর আমরা সেই সম্পদ রক্ষাকারী মানুষ। অথচ আমাদের জীবনটাই সবচেয়ে উপেক্ষিত। চিকিৎসা সেবা না পেলে জীবিকা এবং জীবন—দুটোই ঝুঁকির মধ্যে।”

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


সুন্দরবনে নেই পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা

প্রকাশের তারিখ : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫

featured Image

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে বসবাসরত ও বননির্ভর লক্ষাধিক মানুষের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা নেই। চিকিৎসা অবকাঠামোর ঘাটতি, ডাক্তার-নার্সের সংকট এবং দূরবর্তী নদী-খালঘেরা ভৌগোলিক অবস্থান মিলে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে দাবি জানানো হলেও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

উপকূলীয় শ্যামনগর, আশাশুনি, কয়রা, দাকোপ, মংলা—এসব অঞ্চলের মানুষ প্রাত্যহিক জীবিকার জন্য নির্ভরশীল সুন্দরবনের ওপর। জেলে, মৌয়াল, বাওয়ালি ও কাঁকড়া সংগ্রহকারী শ্রমিকদের প্রতিদিনই নদী ও বনের গভীরে যেতে হয়। কিন্তু দুর্ঘটনা, সাপের কামড়, নৌযান ডুবি বা বন্যপ্রাণীর আক্রমণের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সুন্দরবনের আশপাশে স্থায়ী বা আধুনিক কোনো হাসপাতাল নেই। কয়েকটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও সেখানে চিকিৎসকের অভাব প্রকট। অধিকাংশ কেন্দ্রেই নিয়মিত ডাক্তার না থাকায় রোগীরা সঠিক সেবা থেকে বঞ্চিত হন। চিকিৎসা সরঞ্জাম, জরুরি ওষুধ ও পরীক্ষার উপকরণেও রয়েছে সংকট। ফলে সামান্য অসুস্থতা থেকে জরুরি রোগ—সবই উপেক্ষিত থেকে যায়।

চিকিৎসা নিতে হলে অধিকাংশ বনজীবীকে নৌকায় ২ থেকে ৬ ঘণ্টা ভ্রমণ করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা জেলা সদর হাসপাতালে যেতে হয়। বর্ষাকাল, ঘূর্ণিঝড় বা জোয়ারের সময় এ যাত্রা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই জটিলতায় পড়েন। দ্রুত চিকিৎসার অভাবকে “জীবন-মৃত্যুর মাঝে সময়ের পরিবর্তন” হিসেবে বর্ণনা করেছেন স্থানীয়দের অনেকে।

এদিকে অর্থনৈতিক দিক থেকেও চরম সংকটে রয়েছেন বনজীবীরা। তাদের দৈনিক আয় খুবই সীমিত। শহরে গিয়ে চিকিৎসা করানো, যাতায়াত ভাড়া, ওষুধ—সব মিলিয়ে খরচ সামলানো তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে স্থানীয় অদক্ষ চিকিৎসক বা কোয়াকদের সাহায্য নেন, যা ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি বাড়ায়।

স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, নারীরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার। গর্ভবতী মা, কিশোরী ও শিশুর জন্য কোনো বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র নেই। নিরাপদ প্রসব, নবজাতকের চিকিৎসা ও নিয়মিত টিকা কার্যক্রম অনেক জায়গায় বাধাগ্রস্ত হয়। এতে নারীর মৃত্যু ঝুঁকি ও শিশুর অপুষ্টি হারও তুলনামূলক বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় এখনই প্রয়োজন কার্যকর সরকারি পদক্ষেপ। ভাসমান হাসপাতাল, নৌ-অ্যাম্বুলেন্স, মোবাইল মেডিকেল টিম, উন্নত সাব-সেন্টার, পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগ এবং জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম—এসব নিশ্চিত করতে পারলে দুর্গম এলাকার মানুষের জীবনমান বদলে দিতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, “সুন্দরবন দেশের সম্পদ—আর আমরা সেই সম্পদ রক্ষাকারী মানুষ। অথচ আমাদের জীবনটাই সবচেয়ে উপেক্ষিত। চিকিৎসা সেবা না পেলে জীবিকা এবং জীবন—দুটোই ঝুঁকির মধ্যে।”


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ