বর্তমানে ২০১৯ সালের মামলাটি বিচারাধীন। দীর্ঘ কয়েক বছরের আইনি লড়াই শেষে মামলার রায়ের অপেক্ষায় থাকা আলী আকবর বলছেন, তিনি কোনো বিশেষ সুবিধা চান না; তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিচার হোক আইন ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে। একই সঙ্গে মামলার আগে ও পরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো, পুলিশের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলায় সাক্ষী হিসেবে পাওয়া নোটিশ এবং সাক্ষ্য দেওয়ার ঠিক আগের দিন তার গ্রেপ্তারের ঘটনাটিও নিরপেক্ষভাবে যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
কে এম আলী আকবরের ভাষ্য অনুযায়ী, তার আইনি ও মানবাধিকারসংক্রান্ত কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে একটি জায়গা দখলের অভিযোগ নিয়ে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হন। তৎকালীন বরখাস্তকৃত ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে আদালতে সি.আর. মামলা নং ৪৬২/১৭, তারিখ ০৫/০৩/২০১৭ দায়ের করা হয় বলে জানিয়েছেন তিনি। আলী আকবরের দাবি, ব্যক্তিগত বিরোধ বা লাভের উদ্দেশ্যে নয়, একজন ভুক্তভোগীর অভিযোগের আইনগত প্রতিকার চাওয়ার অংশ হিসেবেই ওই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
এর পরের বছর, ২০১৮ সালে, আরেকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন বলে জানান তিনি। তার দাবি, এক ভুক্তভোগীর অভিযোগপত্রে তার অজ্ঞাতসারে জরুরি যোগাযোগের জন্য তার মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগটি ছিল বায়েজিদ থানার তৎকালীন ওসি ও কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
আলী আকবরের অভিযোগ, ওই ঘটনার পর তাকে ফোনে ভয়ভীতি দেখানো এবং মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। বিষয়টি তিনি তৎকালীন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে লিখিতভাবে জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগের পর সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নোটিশ দেওয়া হয় এবং বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিকভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ভবিষ্যতে তার কোনো ক্ষতি করা হবে না—এমন আশ্বাসও তিনি পেয়েছিলেন বলে দাবি করেন।
তবে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনাকে নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন আলী আকবর।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর চাঁন্দগাঁও থানার দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ তার কাছে আসে। অভিযোগে বলা হয়েছিল, এক ব্যক্তিকে না পেয়ে তার নববধূ স্ত্রীকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ দাবি করা হয়। মানবাধিকারকর্মী হিসেবে বিষয়টি জানার পর তিনি অভিযোগটির খোঁজ নিতে যান এবং পরবর্তী সময়ে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনেন বলে দাবি করেন।
আলী আকবরের ভাষ্য, অভিযোগটি তদন্তের আওতায় আসে এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে তিনি জানতে পারেন। ওই বিভাগীয় কার্যক্রমে তাকেও সাক্ষী হিসেবে ডাকা হয়। সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ২০১৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বায়েজিদ জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে উপস্থিত হতে তাকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।
কিন্তু নির্ধারিত সেই সাক্ষ্যের আগের দিনই ঘটে এমন একটি ঘটনা, যা নিয়ে আজও প্রশ্ন তুলে আসছেন আলী আকবর।
তার দাবি, ২২ সেপ্টেম্বর জরুরি বিপদের কথা জানিয়ে তাকে একটি স্থানে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে যাওয়ার পর একটি অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বায়েজিদ থানার মামলা নং ৩৫, তারিখ ২২/০৯/২০১৯-এ তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য উদ্ধারের অভিযোগ আনা হয়।
শুরু থেকেই মামলার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন কে এম আলী আকবর। মামলাটিকে তিনি মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে দাবি করেছেন। তার প্রশ্ন, পুলিশের বিরুদ্ধে একটি বিভাগীয় ঘটনায় সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ২৩ সেপ্টেম্বর হাজির হওয়ার নোটিশ থাকার পর ঠিক আগের দিনই কেন তাকে গ্রেপ্তার হতে হলো?
আলী আকবর আরও দাবি করেন, ওই সময় তার সঙ্গে অন্য কয়েকজনকেও আটক করা হয়েছিল। পরে অন্যদের ছেড়ে দেওয়া হলেও তাকে মামলার আসামি হিসেবে আদালতে পাঠানো হয়। এরপর প্রায় নয় মাস তাকে কারাগারে থাকতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে ২০১৯ সালের ওই মামলায় পুলিশের আনা অভিযোগ এবং আলী আকবরের পাল্টা দাবিগুলো বিচারাধীন বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে মামলার অভিযোগ কিংবা তার ষড়যন্ত্রের দাবির কোনোটিকেই প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ নেই। আলী আকবরও বলছেন, তিনি আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অভিযোগের নিষ্পত্তি চান।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কারাগারে থাকার সময় পরিবারের সদস্যরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে বিভিন্ন সরকারি ও প্রশাসনিক দপ্তরে আবেদন করেন। এসব আবেদনে ঘটনার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, থানার সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রি খাতা এবং অন্যান্য তথ্য যাচাইয়ের অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
উপ-পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়সহ বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তর এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছেও বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তিনি। আলী আকবর মনে করেন, তার পরিবারের করা আবেদন, পুলিশের বিরুদ্ধে আগের অভিযোগ, বিভাগীয় মামলার নথি, সাক্ষ্য দেওয়ার নোটিশ এবং গ্রেপ্তারের সময়কার তথ্য-উপাত্ত একসঙ্গে যাচাই করা হলে পুরো ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
প্রায় নয় মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হলেও মানবাধিকারসংক্রান্ত কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি বলে দাবি করেন আলী আকবর। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে রাঙ্গামাটির এক নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবার তার কাছে সহযোগিতা চাইলে তিনি তাদের আইনগত ও প্রশাসনিক প্রতিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেন। এ কাজ করতে গিয়েও তাকে বিভিন্ন চাপ ও জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে দাবি তার।
২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আলাউদ্দিন নামে আরেক ব্যক্তি একটি লিখিত অভিযোগ নিয়ে তার কাছে আসেন বলে জানান আলী আকবর। তার বক্তব্য, মানবাধিকারকর্মী হিসেবে ওই ব্যক্তির অভিযোগ গ্রহণ করে আইনগত ও মানবিক সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। সংশ্লিষ্ট জমি বা সম্পত্তির সঙ্গে তার নিজের কোনো মালিকানা, আর্থিক স্বার্থ বা ব্যক্তিগত লাভের সম্পর্ক ছিল না বলে দাবি করেন।
ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করেও পরবর্তী সময়ে নতুন মামলার মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। তবে নতুন মামলার নম্বর, অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ধারা, বাদীপক্ষের বক্তব্য ও বর্তমান বিচারিক অবস্থার বিস্তারিত তথ্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে ওই মামলার অভিযোগের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
একাধিক মামলার মুখোমুখি হওয়ার প্রেক্ষাপটে আলী আকবর প্রশ্ন রাখেন, “একজন ভুক্তভোগী মানুষকে আইনি ও মানবিক সহায়তা দিতে গিয়ে আমি কেন বারবার মামলার মুখোমুখি হচ্ছি?”
তার বক্তব্য, মামলার কারণে শুধু তাকেই নয়, তার পরিবারকেও দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক চাপ মোকাবিলা করতে হয়েছে। তারপরও ভুক্তভোগী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজ থেকে সরে যেতে চান না তিনি।
আলী আকবর বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে অসহায়, নির্যাতিত ও ভুক্তভোগী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। কোনো ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়, মানুষকে আইনগত ও প্রশাসনিক প্রতিকার পাওয়ার পথে সহযোগিতা করাই ছিল আমার উদ্দেশ্য। আমার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে আমি কাউকে আগেভাগে দোষী সাব্যস্ত করতে চাই না। আমি শুধু চাই, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সব নথিপত্র ও ঘটনাপ্রবাহ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করুক।”
তিনি আরও বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যদি কোনো অপরাধ আইনগতভাবে প্রমাণিত হয়, আইন অনুযায়ী তার বিচার হবে। কিন্তু আমি যদি কোনো ষড়যন্ত্র, প্রতিহিংসা বা অন্যায়ের শিকার হয়ে থাকি, সেই সত্যটিও যেন নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সামনে আসে।”
২০১৯ সালের মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন বলে জানিয়েছেন আলী আকবর। দীর্ঘ কারাবাস এবং বছরের পর বছর ধরে চলা আইনি লড়াইয়ের পর এখন তিনি মামলার নিষ্পত্তি ও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন।
তার বক্তব্যে বারবার ফিরে এসেছে ২০১৯ সালের ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ। পুলিশের বিরুদ্ধে একটি বিভাগীয় ঘটনায় সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ২৩ সেপ্টেম্বর উপস্থিত হওয়ার নোটিশ পাওয়ার পর ঠিক তার আগের দিন অন্য মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাটি নিছক কাকতালীয় ছিল, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো প্রেক্ষাপট ছিল—এই প্রশ্নের উত্তর তিনি সংশ্লিষ্ট নথি, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চান।
তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা, মামলার বাদী কিংবা অন্য পক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে পুরো ঘটনাপ্রবাহের আরও পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে। একইভাবে আলী আকবর যেসব প্রশাসনিক অভিযোগ, নোটিশ ও তদন্তের কথা বলেছেন, সেসব নথির পূর্ণাঙ্গ যাচাইও তার দাবিগুলোর সত্যতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যের অধিকার ও ন্যায়বিচারের জন্য দীর্ঘদিন কাজ করার দাবি করা কে এম আলী আকবর এখন নিজেই আইনি লড়াইয়ের মধ্যে রয়েছেন। একদিকে ২০১৯ সালের বিচারাধীন মামলা, অন্যদিকে পরবর্তী সময়ে নতুন মামলার মুখোমুখি হওয়ার দাবি—সব মিলিয়ে তার প্রত্যাশা একটাই: কোনো পক্ষকে আগাম দায়ী বা নির্দোষ ঘোষণা নয়; অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, সরকারি নথি ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ঘটনার নিরপেক্ষ অনুসন্ধান এবং আইনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার।

শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বর্তমানে ২০১৯ সালের মামলাটি বিচারাধীন। দীর্ঘ কয়েক বছরের আইনি লড়াই শেষে মামলার রায়ের অপেক্ষায় থাকা আলী আকবর বলছেন, তিনি কোনো বিশেষ সুবিধা চান না; তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিচার হোক আইন ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে। একই সঙ্গে মামলার আগে ও পরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো, পুলিশের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলায় সাক্ষী হিসেবে পাওয়া নোটিশ এবং সাক্ষ্য দেওয়ার ঠিক আগের দিন তার গ্রেপ্তারের ঘটনাটিও নিরপেক্ষভাবে যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
কে এম আলী আকবরের ভাষ্য অনুযায়ী, তার আইনি ও মানবাধিকারসংক্রান্ত কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে একটি জায়গা দখলের অভিযোগ নিয়ে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হন। তৎকালীন বরখাস্তকৃত ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে আদালতে সি.আর. মামলা নং ৪৬২/১৭, তারিখ ০৫/০৩/২০১৭ দায়ের করা হয় বলে জানিয়েছেন তিনি। আলী আকবরের দাবি, ব্যক্তিগত বিরোধ বা লাভের উদ্দেশ্যে নয়, একজন ভুক্তভোগীর অভিযোগের আইনগত প্রতিকার চাওয়ার অংশ হিসেবেই ওই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
এর পরের বছর, ২০১৮ সালে, আরেকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন বলে জানান তিনি। তার দাবি, এক ভুক্তভোগীর অভিযোগপত্রে তার অজ্ঞাতসারে জরুরি যোগাযোগের জন্য তার মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগটি ছিল বায়েজিদ থানার তৎকালীন ওসি ও কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
আলী আকবরের অভিযোগ, ওই ঘটনার পর তাকে ফোনে ভয়ভীতি দেখানো এবং মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। বিষয়টি তিনি তৎকালীন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে লিখিতভাবে জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগের পর সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নোটিশ দেওয়া হয় এবং বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিকভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ভবিষ্যতে তার কোনো ক্ষতি করা হবে না—এমন আশ্বাসও তিনি পেয়েছিলেন বলে দাবি করেন।
তবে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনাকে নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন আলী আকবর।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর চাঁন্দগাঁও থানার দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ তার কাছে আসে। অভিযোগে বলা হয়েছিল, এক ব্যক্তিকে না পেয়ে তার নববধূ স্ত্রীকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ দাবি করা হয়। মানবাধিকারকর্মী হিসেবে বিষয়টি জানার পর তিনি অভিযোগটির খোঁজ নিতে যান এবং পরবর্তী সময়ে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনেন বলে দাবি করেন।
আলী আকবরের ভাষ্য, অভিযোগটি তদন্তের আওতায় আসে এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে তিনি জানতে পারেন। ওই বিভাগীয় কার্যক্রমে তাকেও সাক্ষী হিসেবে ডাকা হয়। সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ২০১৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বায়েজিদ জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে উপস্থিত হতে তাকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।
কিন্তু নির্ধারিত সেই সাক্ষ্যের আগের দিনই ঘটে এমন একটি ঘটনা, যা নিয়ে আজও প্রশ্ন তুলে আসছেন আলী আকবর।
তার দাবি, ২২ সেপ্টেম্বর জরুরি বিপদের কথা জানিয়ে তাকে একটি স্থানে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে যাওয়ার পর একটি অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বায়েজিদ থানার মামলা নং ৩৫, তারিখ ২২/০৯/২০১৯-এ তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য উদ্ধারের অভিযোগ আনা হয়।
শুরু থেকেই মামলার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন কে এম আলী আকবর। মামলাটিকে তিনি মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে দাবি করেছেন। তার প্রশ্ন, পুলিশের বিরুদ্ধে একটি বিভাগীয় ঘটনায় সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ২৩ সেপ্টেম্বর হাজির হওয়ার নোটিশ থাকার পর ঠিক আগের দিনই কেন তাকে গ্রেপ্তার হতে হলো?
আলী আকবর আরও দাবি করেন, ওই সময় তার সঙ্গে অন্য কয়েকজনকেও আটক করা হয়েছিল। পরে অন্যদের ছেড়ে দেওয়া হলেও তাকে মামলার আসামি হিসেবে আদালতে পাঠানো হয়। এরপর প্রায় নয় মাস তাকে কারাগারে থাকতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে ২০১৯ সালের ওই মামলায় পুলিশের আনা অভিযোগ এবং আলী আকবরের পাল্টা দাবিগুলো বিচারাধীন বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে মামলার অভিযোগ কিংবা তার ষড়যন্ত্রের দাবির কোনোটিকেই প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ নেই। আলী আকবরও বলছেন, তিনি আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অভিযোগের নিষ্পত্তি চান।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কারাগারে থাকার সময় পরিবারের সদস্যরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে বিভিন্ন সরকারি ও প্রশাসনিক দপ্তরে আবেদন করেন। এসব আবেদনে ঘটনার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, থানার সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রি খাতা এবং অন্যান্য তথ্য যাচাইয়ের অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
উপ-পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়সহ বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তর এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছেও বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তিনি। আলী আকবর মনে করেন, তার পরিবারের করা আবেদন, পুলিশের বিরুদ্ধে আগের অভিযোগ, বিভাগীয় মামলার নথি, সাক্ষ্য দেওয়ার নোটিশ এবং গ্রেপ্তারের সময়কার তথ্য-উপাত্ত একসঙ্গে যাচাই করা হলে পুরো ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
প্রায় নয় মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হলেও মানবাধিকারসংক্রান্ত কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি বলে দাবি করেন আলী আকবর। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে রাঙ্গামাটির এক নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবার তার কাছে সহযোগিতা চাইলে তিনি তাদের আইনগত ও প্রশাসনিক প্রতিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেন। এ কাজ করতে গিয়েও তাকে বিভিন্ন চাপ ও জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে দাবি তার।
২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আলাউদ্দিন নামে আরেক ব্যক্তি একটি লিখিত অভিযোগ নিয়ে তার কাছে আসেন বলে জানান আলী আকবর। তার বক্তব্য, মানবাধিকারকর্মী হিসেবে ওই ব্যক্তির অভিযোগ গ্রহণ করে আইনগত ও মানবিক সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। সংশ্লিষ্ট জমি বা সম্পত্তির সঙ্গে তার নিজের কোনো মালিকানা, আর্থিক স্বার্থ বা ব্যক্তিগত লাভের সম্পর্ক ছিল না বলে দাবি করেন।
ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করেও পরবর্তী সময়ে নতুন মামলার মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। তবে নতুন মামলার নম্বর, অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ধারা, বাদীপক্ষের বক্তব্য ও বর্তমান বিচারিক অবস্থার বিস্তারিত তথ্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে ওই মামলার অভিযোগের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
একাধিক মামলার মুখোমুখি হওয়ার প্রেক্ষাপটে আলী আকবর প্রশ্ন রাখেন, “একজন ভুক্তভোগী মানুষকে আইনি ও মানবিক সহায়তা দিতে গিয়ে আমি কেন বারবার মামলার মুখোমুখি হচ্ছি?”
তার বক্তব্য, মামলার কারণে শুধু তাকেই নয়, তার পরিবারকেও দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক চাপ মোকাবিলা করতে হয়েছে। তারপরও ভুক্তভোগী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজ থেকে সরে যেতে চান না তিনি।
আলী আকবর বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে অসহায়, নির্যাতিত ও ভুক্তভোগী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। কোনো ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়, মানুষকে আইনগত ও প্রশাসনিক প্রতিকার পাওয়ার পথে সহযোগিতা করাই ছিল আমার উদ্দেশ্য। আমার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে আমি কাউকে আগেভাগে দোষী সাব্যস্ত করতে চাই না। আমি শুধু চাই, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সব নথিপত্র ও ঘটনাপ্রবাহ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করুক।”
তিনি আরও বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যদি কোনো অপরাধ আইনগতভাবে প্রমাণিত হয়, আইন অনুযায়ী তার বিচার হবে। কিন্তু আমি যদি কোনো ষড়যন্ত্র, প্রতিহিংসা বা অন্যায়ের শিকার হয়ে থাকি, সেই সত্যটিও যেন নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সামনে আসে।”
২০১৯ সালের মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন বলে জানিয়েছেন আলী আকবর। দীর্ঘ কারাবাস এবং বছরের পর বছর ধরে চলা আইনি লড়াইয়ের পর এখন তিনি মামলার নিষ্পত্তি ও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন।
তার বক্তব্যে বারবার ফিরে এসেছে ২০১৯ সালের ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ। পুলিশের বিরুদ্ধে একটি বিভাগীয় ঘটনায় সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ২৩ সেপ্টেম্বর উপস্থিত হওয়ার নোটিশ পাওয়ার পর ঠিক তার আগের দিন অন্য মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাটি নিছক কাকতালীয় ছিল, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো প্রেক্ষাপট ছিল—এই প্রশ্নের উত্তর তিনি সংশ্লিষ্ট নথি, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চান।
তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা, মামলার বাদী কিংবা অন্য পক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে পুরো ঘটনাপ্রবাহের আরও পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে। একইভাবে আলী আকবর যেসব প্রশাসনিক অভিযোগ, নোটিশ ও তদন্তের কথা বলেছেন, সেসব নথির পূর্ণাঙ্গ যাচাইও তার দাবিগুলোর সত্যতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যের অধিকার ও ন্যায়বিচারের জন্য দীর্ঘদিন কাজ করার দাবি করা কে এম আলী আকবর এখন নিজেই আইনি লড়াইয়ের মধ্যে রয়েছেন। একদিকে ২০১৯ সালের বিচারাধীন মামলা, অন্যদিকে পরবর্তী সময়ে নতুন মামলার মুখোমুখি হওয়ার দাবি—সব মিলিয়ে তার প্রত্যাশা একটাই: কোনো পক্ষকে আগাম দায়ী বা নির্দোষ ঘোষণা নয়; অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, সরকারি নথি ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ঘটনার নিরপেক্ষ অনুসন্ধান এবং আইনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার।

আপনার মতামত লিখুন