এক সময় মানুষ নেশাকে বোঝত ধোঁয়া, মদ বা নিষিদ্ধ কোনো পদার্থের সঙ্গে। কিন্তু আজকের যুগে নেশার রূপ পাল্টে গেছে। আর কোনো অন্ধকার গলি নয়, ঘরের মধ্যে চলে এসেছে নতুন নেশা, যা মানুষের হাতে ঘনঘন দেখা যায়। স্মার্টফোনের রঙিন স্ক্রিনে খেলার নেশা—যা প্রথমে মনে হত বিনোদন, আজ তা হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেকের জন্য অবশ্যম্ভাবী অভ্যাস।
অনলাইন গেমের প্রথম চুম্বকীয় আকর্ষণ খুব সাধারণ। পড়াশোনার ফাঁক, বন্ধুদের সঙ্গে মজা বা কয়েক মিনিটের অবসর সময়ে খেলায় সময় কাটানো। কিন্তু অজান্তেই সেই কয়েক মিনিট বৃদ্ধি পায় ঘণ্টায়, ঘণ্টা বৃদ্ধি পায় আসক্তিতে। ‘আরেকটা রাউন্ড খেলি’—এই ছোট অজুহাত মানুষকে এমন এক জগতে টেনে নেয়, যেখান থেকে বের হওয়া কঠিন। ধীরে ধীরে বাস্তব আর ভার্চুয়াল জগতের পার্থক্য ঝাপসা হয়ে যায়।
শুধু সময়ই নয়, অনলাইন গেম মানুষের মস্তিষ্কে গভীর প্রভাব ফেলে। জয়, লেভেল আপ বা রিওয়ার্ডের মুহূর্তে মস্তিষ্কে নিঃসৃত হয় ডোপামিন—‘সুখের হরমোন’। ক্ষণিকের আনন্দের সেই আসক্তি ধীরে ধীরে ব্যক্তির জীবনের নিয়মিত আনন্দকে তুচ্ছ করে দেয়। বাস্তব জীবনের সুখের মুহূর্তগুলো এখন আর আগের মতো প্রিয় মনে হয় না।
শারীরিক স্বাস্থ্যের ক্ষতিও কম নয়। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে বসে থাকার ফলে চোখে জ্বালাপোড়া, মাথাব্যথা, ঘাড়-পিঠে ব্যথা, অনিদ্রা—সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। রাত জেগে খেলার অভ্যাস জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করে দেয়। দিনের আলোয় ক্লান্তি, বিষণ্ণতা থাকলেও রাতের রঙিন স্ক্রিনের কাছে ফিরে আসে ব্যবহারকারী, কারণ মন তখন কৃত্রিম আনন্দের বন্দী।
মানসিক প্রভাব আরও গভীর। গেম না খেললে অস্থিরতা, হতাশা ও রাগে ভরা হয়ে যায় মানুষ। বাস্তব জীবনের ব্যর্থতা থেকে পালানোর জন্য সে গেমের জগতে লুকিয়ে থাকে, যেখানে নিজেকে শক্তিশালী ও বিজয়ী মনে করে। কিন্তু স্ক্রিন বন্ধ হলেই বাস্তবের কঠিন সত্য আবার সামনে আসে, এবং ব্যবহারকারীকে আরও দুর্বল করে তোলে। এভাবেই আসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে মানসিক কারাগারে বন্দি হয়ে যায়।
সবচেয়ে বড় শিকার তরুণ সমাজ। দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্বে থাকা এই প্রজন্ম আজ হারাচ্ছে তার স্বপ্ন, লক্ষ্য ও জীবনদৃষ্টি। ‘আরেকটা লেভেল’, ‘আরেকটা র্যাঙ্ক’, ‘আরেকটি ডিজিটাল পুরস্কার’—এই নেশার পেছনে তারা সময় ও স্বপ্ন উড়িয়ে দিচ্ছে।
অনলাইন গেম একেবারেই খারাপ নয়। সমস্যা তখনই, যখন এটি বিনোদনের সীমা ছাড়িয়ে আসক্তিতে রূপান্তরিত হয়। যেমন মাদক শরীর ও মনকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে, অনলাইন গেমও নিঃশব্দে জীবন ও মানসিকতা ক্ষয় করছে। পারিবারিক, সামাজিক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানিক সচেতনতা না থাকলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এমন নীরব শত্রুর কাছে হারাতে পারে তাদের সৃজনশীলতা ও স্বপ্ন।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ ডিসেম্বর ২০২৫
এক সময় মানুষ নেশাকে বোঝত ধোঁয়া, মদ বা নিষিদ্ধ কোনো পদার্থের সঙ্গে। কিন্তু আজকের যুগে নেশার রূপ পাল্টে গেছে। আর কোনো অন্ধকার গলি নয়, ঘরের মধ্যে চলে এসেছে নতুন নেশা, যা মানুষের হাতে ঘনঘন দেখা যায়। স্মার্টফোনের রঙিন স্ক্রিনে খেলার নেশা—যা প্রথমে মনে হত বিনোদন, আজ তা হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেকের জন্য অবশ্যম্ভাবী অভ্যাস।
অনলাইন গেমের প্রথম চুম্বকীয় আকর্ষণ খুব সাধারণ। পড়াশোনার ফাঁক, বন্ধুদের সঙ্গে মজা বা কয়েক মিনিটের অবসর সময়ে খেলায় সময় কাটানো। কিন্তু অজান্তেই সেই কয়েক মিনিট বৃদ্ধি পায় ঘণ্টায়, ঘণ্টা বৃদ্ধি পায় আসক্তিতে। ‘আরেকটা রাউন্ড খেলি’—এই ছোট অজুহাত মানুষকে এমন এক জগতে টেনে নেয়, যেখান থেকে বের হওয়া কঠিন। ধীরে ধীরে বাস্তব আর ভার্চুয়াল জগতের পার্থক্য ঝাপসা হয়ে যায়।
শুধু সময়ই নয়, অনলাইন গেম মানুষের মস্তিষ্কে গভীর প্রভাব ফেলে। জয়, লেভেল আপ বা রিওয়ার্ডের মুহূর্তে মস্তিষ্কে নিঃসৃত হয় ডোপামিন—‘সুখের হরমোন’। ক্ষণিকের আনন্দের সেই আসক্তি ধীরে ধীরে ব্যক্তির জীবনের নিয়মিত আনন্দকে তুচ্ছ করে দেয়। বাস্তব জীবনের সুখের মুহূর্তগুলো এখন আর আগের মতো প্রিয় মনে হয় না।
শারীরিক স্বাস্থ্যের ক্ষতিও কম নয়। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে বসে থাকার ফলে চোখে জ্বালাপোড়া, মাথাব্যথা, ঘাড়-পিঠে ব্যথা, অনিদ্রা—সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। রাত জেগে খেলার অভ্যাস জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করে দেয়। দিনের আলোয় ক্লান্তি, বিষণ্ণতা থাকলেও রাতের রঙিন স্ক্রিনের কাছে ফিরে আসে ব্যবহারকারী, কারণ মন তখন কৃত্রিম আনন্দের বন্দী।
মানসিক প্রভাব আরও গভীর। গেম না খেললে অস্থিরতা, হতাশা ও রাগে ভরা হয়ে যায় মানুষ। বাস্তব জীবনের ব্যর্থতা থেকে পালানোর জন্য সে গেমের জগতে লুকিয়ে থাকে, যেখানে নিজেকে শক্তিশালী ও বিজয়ী মনে করে। কিন্তু স্ক্রিন বন্ধ হলেই বাস্তবের কঠিন সত্য আবার সামনে আসে, এবং ব্যবহারকারীকে আরও দুর্বল করে তোলে। এভাবেই আসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে মানসিক কারাগারে বন্দি হয়ে যায়।
সবচেয়ে বড় শিকার তরুণ সমাজ। দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্বে থাকা এই প্রজন্ম আজ হারাচ্ছে তার স্বপ্ন, লক্ষ্য ও জীবনদৃষ্টি। ‘আরেকটা লেভেল’, ‘আরেকটা র্যাঙ্ক’, ‘আরেকটি ডিজিটাল পুরস্কার’—এই নেশার পেছনে তারা সময় ও স্বপ্ন উড়িয়ে দিচ্ছে।
অনলাইন গেম একেবারেই খারাপ নয়। সমস্যা তখনই, যখন এটি বিনোদনের সীমা ছাড়িয়ে আসক্তিতে রূপান্তরিত হয়। যেমন মাদক শরীর ও মনকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে, অনলাইন গেমও নিঃশব্দে জীবন ও মানসিকতা ক্ষয় করছে। পারিবারিক, সামাজিক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানিক সচেতনতা না থাকলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এমন নীরব শত্রুর কাছে হারাতে পারে তাদের সৃজনশীলতা ও স্বপ্ন।

আপনার মতামত লিখুন