করজাল বিস্তৃত করে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছিল সরকার। নতুন করদাতা তৈরি এবং আয়কর ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্যও ছিল নীতিনির্ধারকদের। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। নতুন করনীতির কঠিন প্রয়োগে কিশোরগঞ্জে আয়কর রিটার্ন দাখিলের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
জেলার কর কর্মকর্তাদের কার্যালয়ে নিয়মিত কার্যক্রম চললেও করদাতাদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আইনজীবী ও কর বিশেষজ্ঞদের দাবি, গত এক দশকের মধ্যে চলতি করবর্ষের শুরুতে এমন স্থবিরতা আগে দেখা যায়নি।
সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। পাড়া-মহল্লার মুদি দোকান থেকে শুরু করে ছোট উদ্যোক্তাদের অনেকেই নতুন করব্যবস্থার কারণে রিটার্ন দাখিলে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আয় বা প্রকৃত মুনাফার পরিবর্তে লেনদেনের পরিমাণের ওপর টার্নওভার কর নির্ধারণ করায় তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, কয়েক লাখ টাকা বার্ষিক লেনদেন করা একজন ছোট ব্যবসায়ীকে রিটার্ন দাখিলের সময় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কর দেওয়ার হিসাব করতে হচ্ছে। অথচ নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং মূলধনের সংকটে ছোট ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে আয় ও করের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকায় অনেকেই করব্যবস্থা থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।
কিশোরগঞ্জ উপকর কমিশনারের কার্যালয় ও জেলা কর আইনজীবী সমিতি সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২৭ করবর্ষে জেলার কর সার্কেলগুলোতে রিটার্ন দাখিলের হার আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
সাধারণত করবর্ষের শুরুতে, বিশেষ করে জুলাই থেকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত কিশোরগঞ্জ কর সার্কেল-১৩ ও ১৮-তে করদাতাদের বেশ ভিড় দেখা যেত। প্রতি বছর এই সময়ে কয়েক শ করদাতা সরাসরি উপস্থিত হয়ে রিটার্ন জমা দিতেন।
তবে চলতি করবর্ষে চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। একই সময়ে দুই সার্কেল মিলিয়ে রিটার্ন দাখিলকারীর সংখ্যা শতাধিক বা তার কিছু বেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর মধ্যে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণও খুবই কম।
করজাল বিস্তারের যে লক্ষ্য নিয়ে নতুন নীতি নেওয়া হয়েছে, বাস্তবে তার বিপরীত ফল দেখা দিলে নীতিটির কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কিশোরগঞ্জ জেলা কর আইনজীবী সমিতির সভাপতি আইনজীবী আবুল কাসেম মনে করেন, টার্নওভার করের পরিধি ও প্রয়োগপদ্ধতিতে পরিবর্তনই বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, আগে যেসব প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বিক্রি বা প্রাপ্তি কমপক্ষে ৩ কোটি টাকা ছিল, মূলত তাদের ওপর ১ শতাংশ হারে টার্নওভার কর প্রযোজ্য ছিল। বড় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই করের চাপ সামলানো তুলনামূলক সহজ হলেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য একই কাঠামো কার্যকর হওয়ায় সমস্যা তৈরি হয়েছে।
তার দাবি, সামান্য পরিমাণ কেনাবেচা করা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ক্ষেত্রেও টার্নওভার কর প্রযোজ্য হওয়ায় তাদের প্রকৃত আয়ের তুলনায় করের বোঝা অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে।
আইনজীবীদের মতে, শত কোটি টাকার ব্যবসা করা একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য যে হারে টার্নওভার কর নির্ধারণ করা হয়, একই হারে গ্রামের বা মফস্বলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ওপর কর আরোপ করলে তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে করব্যবস্থা নিয়ে ভীতি ও অনাস্থা তৈরি হতে পারে।
কিশোরগঞ্জ উপকর কমিশনারের কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নূরুস সালামও রিটার্ন দাখিলের হার কমে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, চলতি করবর্ষে রিটার্ন দাখিলের হার অস্বাভাবিকভাবে কম। সাধারণ ব্যবসায়ীরা কেন আগ্রহ হারাচ্ছেন এবং এর পেছনে টার্নওভার করের কোনো প্রভাব রয়েছে কি না, তা নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কিশোরগঞ্জের পরিস্থিতি শুধু একটি জেলার সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সক্ষমতা, প্রকৃত আয় ও স্থানীয় অর্থনীতির বাস্তবতা বিবেচনা না করে করনীতি প্রয়োগ করা হলে করজাল বিস্তারের পরিবর্তে উল্টো করদাতার সংখ্যা কমে যেতে পারে।
তাই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের জন্য কর কাঠামো সহজ করা, বাস্তব আয়ের সঙ্গে করের সামঞ্জস্য রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ ছাড় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও কর আইনজীবীরা।
এখন দেখার বিষয়, কিশোরগঞ্জের মাঠপর্যায়ের এই চিত্রকে গুরুত্ব দিয়ে রাজস্ব বোর্ড ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য করব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আনে কি না।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ আগস্ট ২০২৬
করজাল বিস্তৃত করে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছিল সরকার। নতুন করদাতা তৈরি এবং আয়কর ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্যও ছিল নীতিনির্ধারকদের। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। নতুন করনীতির কঠিন প্রয়োগে কিশোরগঞ্জে আয়কর রিটার্ন দাখিলের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
জেলার কর কর্মকর্তাদের কার্যালয়ে নিয়মিত কার্যক্রম চললেও করদাতাদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আইনজীবী ও কর বিশেষজ্ঞদের দাবি, গত এক দশকের মধ্যে চলতি করবর্ষের শুরুতে এমন স্থবিরতা আগে দেখা যায়নি।
সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। পাড়া-মহল্লার মুদি দোকান থেকে শুরু করে ছোট উদ্যোক্তাদের অনেকেই নতুন করব্যবস্থার কারণে রিটার্ন দাখিলে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আয় বা প্রকৃত মুনাফার পরিবর্তে লেনদেনের পরিমাণের ওপর টার্নওভার কর নির্ধারণ করায় তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, কয়েক লাখ টাকা বার্ষিক লেনদেন করা একজন ছোট ব্যবসায়ীকে রিটার্ন দাখিলের সময় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কর দেওয়ার হিসাব করতে হচ্ছে। অথচ নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং মূলধনের সংকটে ছোট ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে আয় ও করের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকায় অনেকেই করব্যবস্থা থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।
কিশোরগঞ্জ উপকর কমিশনারের কার্যালয় ও জেলা কর আইনজীবী সমিতি সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২৭ করবর্ষে জেলার কর সার্কেলগুলোতে রিটার্ন দাখিলের হার আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
সাধারণত করবর্ষের শুরুতে, বিশেষ করে জুলাই থেকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত কিশোরগঞ্জ কর সার্কেল-১৩ ও ১৮-তে করদাতাদের বেশ ভিড় দেখা যেত। প্রতি বছর এই সময়ে কয়েক শ করদাতা সরাসরি উপস্থিত হয়ে রিটার্ন জমা দিতেন।
তবে চলতি করবর্ষে চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। একই সময়ে দুই সার্কেল মিলিয়ে রিটার্ন দাখিলকারীর সংখ্যা শতাধিক বা তার কিছু বেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর মধ্যে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণও খুবই কম।
করজাল বিস্তারের যে লক্ষ্য নিয়ে নতুন নীতি নেওয়া হয়েছে, বাস্তবে তার বিপরীত ফল দেখা দিলে নীতিটির কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কিশোরগঞ্জ জেলা কর আইনজীবী সমিতির সভাপতি আইনজীবী আবুল কাসেম মনে করেন, টার্নওভার করের পরিধি ও প্রয়োগপদ্ধতিতে পরিবর্তনই বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, আগে যেসব প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বিক্রি বা প্রাপ্তি কমপক্ষে ৩ কোটি টাকা ছিল, মূলত তাদের ওপর ১ শতাংশ হারে টার্নওভার কর প্রযোজ্য ছিল। বড় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই করের চাপ সামলানো তুলনামূলক সহজ হলেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য একই কাঠামো কার্যকর হওয়ায় সমস্যা তৈরি হয়েছে।
তার দাবি, সামান্য পরিমাণ কেনাবেচা করা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ক্ষেত্রেও টার্নওভার কর প্রযোজ্য হওয়ায় তাদের প্রকৃত আয়ের তুলনায় করের বোঝা অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে।
আইনজীবীদের মতে, শত কোটি টাকার ব্যবসা করা একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য যে হারে টার্নওভার কর নির্ধারণ করা হয়, একই হারে গ্রামের বা মফস্বলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ওপর কর আরোপ করলে তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে করব্যবস্থা নিয়ে ভীতি ও অনাস্থা তৈরি হতে পারে।
কিশোরগঞ্জ উপকর কমিশনারের কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নূরুস সালামও রিটার্ন দাখিলের হার কমে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, চলতি করবর্ষে রিটার্ন দাখিলের হার অস্বাভাবিকভাবে কম। সাধারণ ব্যবসায়ীরা কেন আগ্রহ হারাচ্ছেন এবং এর পেছনে টার্নওভার করের কোনো প্রভাব রয়েছে কি না, তা নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কিশোরগঞ্জের পরিস্থিতি শুধু একটি জেলার সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সক্ষমতা, প্রকৃত আয় ও স্থানীয় অর্থনীতির বাস্তবতা বিবেচনা না করে করনীতি প্রয়োগ করা হলে করজাল বিস্তারের পরিবর্তে উল্টো করদাতার সংখ্যা কমে যেতে পারে।
তাই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের জন্য কর কাঠামো সহজ করা, বাস্তব আয়ের সঙ্গে করের সামঞ্জস্য রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ ছাড় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও কর আইনজীবীরা।
এখন দেখার বিষয়, কিশোরগঞ্জের মাঠপর্যায়ের এই চিত্রকে গুরুত্ব দিয়ে রাজস্ব বোর্ড ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য করব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আনে কি না।

আপনার মতামত লিখুন