ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শেখ হাসিনা ফিরবেন কবে, ফিরলে কী হবে?


নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৬

শেখ হাসিনা ফিরবেন কবে, ফিরলে কী হবে?
ছবি: সংগৃহীত


ভারতের নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর থেকেই তাঁর দেশে ফেরা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তিনি আদৌ ফিরবেন কি না, ফিরলে কবে ফিরবেন, কীভাবে ফিরবেন এবং দেশে ফিরলে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার কী হবে, এসব প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর গত দুই বছরে বিভিন্ন সময়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে এবারই প্রথম তিনি আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে নিজের দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বর্তমান সরকার ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে থাকা প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার কথা বলে আসছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও দিল্লির কাছে এ বিষয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তবে এ নিয়ে ভারত এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো অবস্থান জানায়নি।

এরই মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তির বিভিন্ন ধারা এবং শর্তের কারণে ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারে কি না, তা নিয়েও দেশি-বিদেশি মহলে আলোচনা হয়েছে।

দেশে ফিরতে আইনি বাধা আছে কি?

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনা নিজে থেকে দেশে ফিরতে চাইলে তাঁর দেশে আসার ক্ষেত্রে সরাসরি কোনো আইনি বাধা নেই। তবে দেশে পা রাখার পর তাঁকে চলমান মামলাগুলোর আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

তবে রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু আইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কই বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থাৎ আইনি প্রক্রিয়া থাকলেও শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন কি না, কিংবা ভারত তাঁকে ফেরার সুযোগ দেবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করবে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

এমনকি বর্তমান বাস্তবতায় শেখ হাসিনা সত্যিই দেশে ফিরতে চান কি না, সেটিও প্রশ্ন হিসেবে তুলছেন কেউ কেউ। তাঁদের মতে, বারবার দেশে ফেরার কথা বলার পেছনে রাজনৈতিক কৌশলও থাকতে পারে।

প্রত্যর্পণ চুক্তিতে কী বলা আছে?

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সাল থেকে প্রত্যর্পণ চুক্তি কার্যকর রয়েছে। পরে ২০১৬ সালে চুক্তিটি সংশোধন করা হয়। সংশোধনের ফলে দুই দেশের মধ্যে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া আগের তুলনায় সহজ হয়েছে।

মূলত অপরাধ করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনতে এবং সন্ত্রাসবাদসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে পারস্পরিক সহযোগিতার জন্যই দুই দেশের মধ্যে এই চুক্তি করা হয়।

চুক্তি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন অপরাধের অভিযোগ থাকলে, যার শাস্তি কমপক্ষে এক বছর, তাঁকে প্রত্যর্পণের জন্য অনুরোধ করা যেতে পারে। অপরাধে সহযোগিতা বা অপরাধের চেষ্টা করলেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে চুক্তিতে এমন কিছু শর্তও রয়েছে, যার আওতায় প্রত্যর্পণের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে।

এর মধ্যে অন্যতম হলো, অভিযোগটি যদি রাজনৈতিক প্রকৃতির হয়, তাহলে প্রত্যর্পণের অনুরোধ নাকচ করার সুযোগ রয়েছে। তবে হত্যা, গুম, বোমা বিস্ফোরণ, সন্ত্রাসবাদসহ বেশ কিছু গুরুতর অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করার কথাও চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে হত্যা, গণহত্যা, গুম ও নির্যাতনসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগে মামলা হয়েছে। ফলে এসব অভিযোগকে শুধুই রাজনৈতিক মামলা হিসেবে দেখিয়ে প্রত্যর্পণের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে আইনি মহলে আলোচনা রয়েছে।

গ্রেপ্তারি পরোয়ানাই কি যথেষ্ট?

২০১৬ সালে চুক্তি সংশোধনের পর প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। এখন সংশ্লিষ্ট মামলার বিস্তারিত সাক্ষ্য-প্রমাণ জমা দেওয়ার পরিবর্তে আদালতের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কপির ভিত্তিতেও প্রত্যর্পণের আবেদন করা যায়।

অর্থাৎ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কোনো মামলায় আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে, সেই নথির ভিত্তিতে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে তাঁকে ফেরত চাওয়ার সুযোগ পায়।

প্রয়োজনে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে অস্থায়ী গ্রেপ্তারের আবেদনও করা যায়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে চুক্তির আওতায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাঁকে অস্থায়ীভাবে আটক রাখার ব্যবস্থাও রয়েছে।

তবে ভারত যদি মনে করে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্যে সরল বিশ্বাসে করা হয়নি, তাহলে প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ রয়েছে। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে এই ধারাটিকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেক আইন বিশেষজ্ঞ।

দেশে ফিরতে চান শেখ হাসিনা, নাকি রাজনৈতিক কৌশল?

গত দুই বছরে বিভিন্ন সময় দেশে ফেরার কথা বলেছেন শেখ হাসিনা। এবার নয়াদিল্লির সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে সামনে আনায় রাজনৈতিক অঙ্গনেও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে তাঁর দল ও সমর্থকদের মধ্যেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

দেশ ছাড়ার পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া এবং দলটির নেতাকর্মীদের নানা চাপের মধ্যে থাকার বিষয়টিও সামনে আনছেন বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, দেশে ফেরার ঘোষণা দলটির নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখার একটি কৌশল হতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সাব্বির আহমদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দলের নেতাকর্মীরা নানা ধরনের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছেন। সেই পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বার্তা তাঁদের চাঙা করার একটি উপায় হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক সামিয়া জামানের মতে, এই ঘোষণা বর্তমান সরকারকেও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে রাখার একটি কৌশল হতে পারে।

তিনি মনে করেন, শেখ হাসিনা দেশে ফেরার কথা বললেও নির্দিষ্ট কোনো দিন বা সময় ঘোষণা করেননি। ফলে এটিকে রাজনৈতিকভাবে একটি বার্তা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

তাঁর মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কও গভীরভাবে জড়িত।

দেশে ফিরলে কী হবে?

২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন আদালতে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আরও একাধিক মামলা রয়েছে।

ফলে তিনি দেশে ফিরলে এসব মামলার আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, একজন পলাতক আসামির জন্য আলাদা কোনো আইনি সুবিধার সুযোগ নেই। দেশে ফিরলে তাঁকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার বিধান রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও ন্যায়বিচারের স্বার্থে আপিল বিভাগ বিশেষ পরিস্থিতিতে আবেদন গ্রহণ করতে পারে কি না, সেটিও আইনি আলোচনার বিষয়।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আহসানুল করিমের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সরাসরি আইনি বাধা নেই। তবে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকায় দেশে ফেরার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনার বৈধ পাসপোর্ট না থাকলে বিশেষ পরিস্থিতিতে ট্রাভেল পাস বা ভ্রমণ অনুমতির মাধ্যমে দেশে ফেরার বিষয়টি সামনে আসতে পারে। তবে সেটি সরকার দেবে কি না, দিলেও কী শর্তে দেবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত কোথায়?

সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি এখন শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া, প্রত্যর্পণ চুক্তি, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা।

তিনি দেশে ফেরার কথা জানিয়েছেন, কিন্তু কবে বা কীভাবে ফিরবেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি দেননি।

তাই আপাতত সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, শেখ হাসিনার এই ঘোষণা কি সত্যিই দেশে ফেরার প্রস্তুতি, নাকি রাজনৈতিক কৌশলের অংশ?

এর উত্তর অনেকটাই নির্ভর করবে দিল্লির অবস্থান, ঢাকার কূটনৈতিক তৎপরতা এবং বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


শেখ হাসিনা ফিরবেন কবে, ফিরলে কী হবে?

প্রকাশের তারিখ : ০৮ আগস্ট ২০২৬

featured Image


ভারতের নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর থেকেই তাঁর দেশে ফেরা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তিনি আদৌ ফিরবেন কি না, ফিরলে কবে ফিরবেন, কীভাবে ফিরবেন এবং দেশে ফিরলে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার কী হবে, এসব প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর গত দুই বছরে বিভিন্ন সময়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে এবারই প্রথম তিনি আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে নিজের দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বর্তমান সরকার ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে থাকা প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার কথা বলে আসছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও দিল্লির কাছে এ বিষয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তবে এ নিয়ে ভারত এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো অবস্থান জানায়নি।

এরই মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তির বিভিন্ন ধারা এবং শর্তের কারণে ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারে কি না, তা নিয়েও দেশি-বিদেশি মহলে আলোচনা হয়েছে।

দেশে ফিরতে আইনি বাধা আছে কি?

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনা নিজে থেকে দেশে ফিরতে চাইলে তাঁর দেশে আসার ক্ষেত্রে সরাসরি কোনো আইনি বাধা নেই। তবে দেশে পা রাখার পর তাঁকে চলমান মামলাগুলোর আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

তবে রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু আইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কই বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থাৎ আইনি প্রক্রিয়া থাকলেও শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন কি না, কিংবা ভারত তাঁকে ফেরার সুযোগ দেবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করবে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

এমনকি বর্তমান বাস্তবতায় শেখ হাসিনা সত্যিই দেশে ফিরতে চান কি না, সেটিও প্রশ্ন হিসেবে তুলছেন কেউ কেউ। তাঁদের মতে, বারবার দেশে ফেরার কথা বলার পেছনে রাজনৈতিক কৌশলও থাকতে পারে।

প্রত্যর্পণ চুক্তিতে কী বলা আছে?

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সাল থেকে প্রত্যর্পণ চুক্তি কার্যকর রয়েছে। পরে ২০১৬ সালে চুক্তিটি সংশোধন করা হয়। সংশোধনের ফলে দুই দেশের মধ্যে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া আগের তুলনায় সহজ হয়েছে।

মূলত অপরাধ করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনতে এবং সন্ত্রাসবাদসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে পারস্পরিক সহযোগিতার জন্যই দুই দেশের মধ্যে এই চুক্তি করা হয়।

চুক্তি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন অপরাধের অভিযোগ থাকলে, যার শাস্তি কমপক্ষে এক বছর, তাঁকে প্রত্যর্পণের জন্য অনুরোধ করা যেতে পারে। অপরাধে সহযোগিতা বা অপরাধের চেষ্টা করলেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে চুক্তিতে এমন কিছু শর্তও রয়েছে, যার আওতায় প্রত্যর্পণের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে।

এর মধ্যে অন্যতম হলো, অভিযোগটি যদি রাজনৈতিক প্রকৃতির হয়, তাহলে প্রত্যর্পণের অনুরোধ নাকচ করার সুযোগ রয়েছে। তবে হত্যা, গুম, বোমা বিস্ফোরণ, সন্ত্রাসবাদসহ বেশ কিছু গুরুতর অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করার কথাও চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে হত্যা, গণহত্যা, গুম ও নির্যাতনসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগে মামলা হয়েছে। ফলে এসব অভিযোগকে শুধুই রাজনৈতিক মামলা হিসেবে দেখিয়ে প্রত্যর্পণের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে আইনি মহলে আলোচনা রয়েছে।

গ্রেপ্তারি পরোয়ানাই কি যথেষ্ট?

২০১৬ সালে চুক্তি সংশোধনের পর প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। এখন সংশ্লিষ্ট মামলার বিস্তারিত সাক্ষ্য-প্রমাণ জমা দেওয়ার পরিবর্তে আদালতের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কপির ভিত্তিতেও প্রত্যর্পণের আবেদন করা যায়।

অর্থাৎ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কোনো মামলায় আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে, সেই নথির ভিত্তিতে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে তাঁকে ফেরত চাওয়ার সুযোগ পায়।

প্রয়োজনে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে অস্থায়ী গ্রেপ্তারের আবেদনও করা যায়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে চুক্তির আওতায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাঁকে অস্থায়ীভাবে আটক রাখার ব্যবস্থাও রয়েছে।

তবে ভারত যদি মনে করে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্যে সরল বিশ্বাসে করা হয়নি, তাহলে প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ রয়েছে। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে এই ধারাটিকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেক আইন বিশেষজ্ঞ।

দেশে ফিরতে চান শেখ হাসিনা, নাকি রাজনৈতিক কৌশল?

গত দুই বছরে বিভিন্ন সময় দেশে ফেরার কথা বলেছেন শেখ হাসিনা। এবার নয়াদিল্লির সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে সামনে আনায় রাজনৈতিক অঙ্গনেও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে তাঁর দল ও সমর্থকদের মধ্যেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

দেশ ছাড়ার পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া এবং দলটির নেতাকর্মীদের নানা চাপের মধ্যে থাকার বিষয়টিও সামনে আনছেন বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, দেশে ফেরার ঘোষণা দলটির নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখার একটি কৌশল হতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সাব্বির আহমদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দলের নেতাকর্মীরা নানা ধরনের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছেন। সেই পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বার্তা তাঁদের চাঙা করার একটি উপায় হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক সামিয়া জামানের মতে, এই ঘোষণা বর্তমান সরকারকেও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে রাখার একটি কৌশল হতে পারে।

তিনি মনে করেন, শেখ হাসিনা দেশে ফেরার কথা বললেও নির্দিষ্ট কোনো দিন বা সময় ঘোষণা করেননি। ফলে এটিকে রাজনৈতিকভাবে একটি বার্তা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

তাঁর মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কও গভীরভাবে জড়িত।

দেশে ফিরলে কী হবে?

২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন আদালতে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আরও একাধিক মামলা রয়েছে।

ফলে তিনি দেশে ফিরলে এসব মামলার আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, একজন পলাতক আসামির জন্য আলাদা কোনো আইনি সুবিধার সুযোগ নেই। দেশে ফিরলে তাঁকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার বিধান রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও ন্যায়বিচারের স্বার্থে আপিল বিভাগ বিশেষ পরিস্থিতিতে আবেদন গ্রহণ করতে পারে কি না, সেটিও আইনি আলোচনার বিষয়।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আহসানুল করিমের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সরাসরি আইনি বাধা নেই। তবে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকায় দেশে ফেরার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনার বৈধ পাসপোর্ট না থাকলে বিশেষ পরিস্থিতিতে ট্রাভেল পাস বা ভ্রমণ অনুমতির মাধ্যমে দেশে ফেরার বিষয়টি সামনে আসতে পারে। তবে সেটি সরকার দেবে কি না, দিলেও কী শর্তে দেবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত কোথায়?

সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি এখন শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া, প্রত্যর্পণ চুক্তি, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা।

তিনি দেশে ফেরার কথা জানিয়েছেন, কিন্তু কবে বা কীভাবে ফিরবেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি দেননি।

তাই আপাতত সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, শেখ হাসিনার এই ঘোষণা কি সত্যিই দেশে ফেরার প্রস্তুতি, নাকি রাজনৈতিক কৌশলের অংশ?

এর উত্তর অনেকটাই নির্ভর করবে দিল্লির অবস্থান, ঢাকার কূটনৈতিক তৎপরতা এবং বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ