বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘনঘটা আজ মানবসভ্যতাকে এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই চরম বৈরী বাস্তবতায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা, সবুজ বেষ্টনী নির্মাণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, সুন্দর ও নিরাপদ বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে প্রাচ্যের নদীমাতৃক পলি-বিধৌত জেলা কিশোরগঞ্জে শুরু হয়েছে সপ্তাহব্যাপী বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০২৬। “বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ”— এ এক যুগোপযোগী ও চেতনার দ্যোতক মূল সুরকে সামনে রেখে কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই পরিবেশবান্ধব উৎসবে সূচনা দিনেই বিরাজ করছিল অভূতপূর্ব উদ্দীপনা ও উৎসবমুখর আবহ।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকাল থেকেই জেলা শহর কিশোরগঞ্জের আবহাওয়া ও পরিবেশ হয়ে উঠেছিল অনন্য সাজে সজ্জিত। সবুজের বার্তাকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে সকাল ১০টার দিকে শহরের বুক চিরে বের হয় এক দৃষ্টিনন্দন ও বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা।
কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম এবং কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিনের যৌথ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে এই শোভাযাত্রাটি শহরের প্রাণকেন্দ্র এবং ঐতিহাসিক 'বটতলা' এলাকা থেকে শুভ সূচনা লাভ করে। শোভাযাত্রায় পরিবেশপ্রেমী নাগরিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, স্কাউট সদস্য এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো শহর যেন এক সবুজ উৎসবে পরিণত হয়। হাতে হাতে পরিবেশ সচেতনতামূলক ব্যানার, ফেস্টুন ও প্লেকার্ড নিয়ে অংশ নেওয়া শত শত মানুষের স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে রাজপথ।র্যালিটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ও বাণিজ্যিক এলাকা সফলভাবে প্রদক্ষিণ শেষে শহরের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী স্থান 'পুরাতন স্টেডিয়াম' প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়। পরবর্তীতে পুরাতন স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণেই প্রধান অতিথি ও অন্যান্য আমন্ত্রিত মেহমানবৃন্দ আনুষ্ঠানিকভাবে মেলা চত্বরে প্রবেশ করেন এবং বৃক্ষমেলা-২০২৬ এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। উদ্বোধন শেষে অতিথিবৃন্দ মেলায় অংশগ্রহণকারী সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত নার্সারির বৈচিত্র্যময় স্টলগুলো ঘুরে দেখেন। স্টলগুলোতে শোভা পাওয়া বিরল প্রজাতির বনজ, রসালো ফলদ, ভেষজ ও ঔষধি এবং দৃষ্টিনন্দন পাতাবাহারি চারা দেখে অতিথিরা সন্তোষ প্রকাশ করেন। প্রদর্শনীতে থাকা উন্নত জাতের আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, আমলকী, নিম, অর্জুন থেকে শুরু করে দেশীয় বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির চারাগাছগুলো উপস্থিত দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।
র্যালি ও মেলা চত্বর পরিদর্শন পর্ব শেষে দুপুর ১২টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিনের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই আলোচনা সভায় উপস্থিত বক্তারা পরিবেশ সংরক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং রোপণকৃত গাছের সুরক্ষায় নানামুখী প্রস্তাবনা ও বাস্তবমুখী পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য প্রদান করেন ময়মনসিংহ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ নুরুল করিম। তিনি কিশোরগঞ্জ জেলায় চলমান বৃক্ষরোপণ অভিযানের সার্বিক তথ্য তুলে ধরে একটি সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান উপস্থাপন করেন। তিনি জানান," পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চলতি বৃক্ষরোপণ অভিযানের আওতায় ইতোমধ্যে কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও চরাঞ্চলে ১৩ হাজার ৬৫০টি গাছের চারা সফলভাবে রোপণ করা হয়েছে।" বক্তৃতায় তিনি কেবল চারা রোপণের মানসিকতার উর্ধ্বে উঠে পরিচর্যার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেন। তিনি মন্তব্য করেন, "কেবল শত শত চারা রোপণ করে ছবি তোলা বা আনুষ্ঠানিকতা শেষ করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য নয়। একটি চারাগাছকে পূর্ণাঙ্গ মহীরুহে পরিণত করতে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত তার নিবিড় পরিচর্যা, পানি সেচ ও বেড়া দিয়ে সুরক্ষা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।" কাজী মোহাম্মদ নুরুল করিম আরও বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী সড়ক বা বনাঞ্চলের অতি পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ গাছ নিয়ম মেনে অপসারণের পাশাপাশি সেই শূন্য স্থানে নতুন চারা রোপণের ধারাবাহিকতা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে হবে, যাতে পরিবেশের ভারসাম্য কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়।
সভাপতির বক্তব্যে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন সভার উদ্দেশ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় গাছ লাগানোর বৈজ্ঞানিক ও জাগতিক গুরুত্ব অত্যন্ত চমৎকার ভাষায় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "গাছ আমাদের বিনা মূল্যে জীবনদায়ী অক্সিজেন সরবরাহ করে বাঁচিয়ে রাখে। মাটির ক্ষয় রোধ করা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে বৃক্ষের কোনো বিকল্প নেই। বৃক্ষ রোপণ আমাদের অস্তিত্বের স্বার্থেই করতে হবে।" তিনি আরও প্রকাশ করেন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপের কথা। প্রশাসন যে কেবল চারা রোপণ করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, তা উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক জানান, জিও-ট্যাগিং (Geo-tagging) প্রযুক্তিনির্ভর একটি অত্যাধুনিক অ্যাপের মাধ্যমে কিশোরগঞ্জ জেলায় কোথায়, কোন তারিখে এবং কতটি চারা রোপণ করা হয়েছে—তার নির্ভুল ভৌগোলিক অবস্থান ও তথ্যভান্ডার সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এই ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে রোপণকৃত চারাগুলোর বৃদ্ধি, টিকে থাকার হার এবং সুরক্ষার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ (Monitoring) নিশ্চিত করা সহজ হবে, যা পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে।
আলোচনা সভার প্রধান অতিথি, কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম তাঁর বক্তব্যে বৃক্ষরোপণকে কেবল নির্দিষ্ট কোনো সরকারি দপ্তর বা বন বিভাগের কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একে প্রতিটি নাগরিকের জাতীয় ও ঈমানি দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করার তাগিদ দেন। তিনি তাঁর সাবলীল ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে বলেন, "সবুজ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার মহতী স্বপ্ন একা সরকারের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এটি আমাদের প্রত্যেকের সম্মিলিত সামাজিক দায়িত্ব। জলবায়ুর অভিঘাত থেকে আমাদের আগামী প্রজন্মকে মুক্ত রাখতে হলে সবুজায়নের বিকল্প নেই।" সংসদ সদস্য স্থানীয় সর্বস্তরের জনগণকে উদ্দেশ্য করে আহ্বান জানান যে, নিজ নিজ বসতবাড়ির খালি আঙিনা, অব্যবহৃত পতিত জমি, গ্রামীণ ও শহরের রাস্তার দুই পাশ, পুকুরপাড়, সামাজিক প্রতিষ্ঠানের চত্বর এবং বিশেষ করে রেললাইনের পার্শ্ববর্তী ফাঁকা উপযুক্ত জায়গাগুলোতে ফলজ, বনজ ও ওষুধি চারার সমন্বয় ঘটিয়ে রোপণ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, কেবল নিজেরা চারা লাগালেই হবে না, বরং আশপাশের মানুষকেও বৃক্ষরোপণে উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং প্রতিটি রোপণকৃত চারার যথাযথ তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
কিশোরগঞ্জের পরিবেশ রক্ষার এই বিশেষ দিনটিতে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, চিকিৎসক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মিলনমেলায় পরিণত হয় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষ। সব মত ও পথের ঊর্ধ্বে উঠে দলমত নির্বিশেষে পরিবেশ রক্ষায় এই একত্রীকরণ অনুষ্ঠানটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
আলোচনা সভা ও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বক্তব্য ও সমর্থন জ্ঞাপন করেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোঃ ইশতিয়াক ইমন, সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ নাজমুল করিম, জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর অধ্যাপক মোঃ রমজান আলী, জেলা ইসলামী আন্দোলনের আমীর আলমগীর হোসেন তালুকদার, জেলা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সভাপতি খায়রুল কবির খোকন, জেলা যুবদলের সভাপতি খসরুজ্জামান শরীফ। এছাড়াও অনুষ্ঠানে জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ, পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধি, স্থানীয় সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের শিক্ষাবিদ ও ব্যক্তিবর্গ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।
কিশোরগঞ্জে আয়োজিত এই সপ্তাহব্যাপী বৃক্ষমেলা ও রোপণ অভিযান কেবল ৭ দিনের একটি আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতার এক নতুন জোয়ার সৃষ্টি করেছে। মেলা প্রাঙ্গণে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য সুলভ মূল্যে উন্নত জাতের চারা বিক্রির সুব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
আধুনিক জিও-ট্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে চারা পর্যবেক্ষণ, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং সর্বস্তরের রাজনীতিক ও জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ কিশোরগঞ্জের প্রাকৃতিক পরিবেশকে আরও টেকসই, সবুজ ও সজীব করে তুলবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন হাওর-বাঁওড় বেষ্টিত এই জেলার সচেনতন নাগরিকবৃন্দ। 'সবার আগে বাংলাদেশ' গড়ে তোলার এই স্বপ্নে প্রকৃতিকে ভালোবেসে সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে চারা রোপণ ও লালন-পালনে এগিয়ে আসবে, আজকের এই শুভ সূচনা থেকে সেই আশার আলোই প্রতিফলিত হয়েছে।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ জুলাই ২০২৬
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘনঘটা আজ মানবসভ্যতাকে এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই চরম বৈরী বাস্তবতায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা, সবুজ বেষ্টনী নির্মাণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, সুন্দর ও নিরাপদ বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে প্রাচ্যের নদীমাতৃক পলি-বিধৌত জেলা কিশোরগঞ্জে শুরু হয়েছে সপ্তাহব্যাপী বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০২৬। “বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ”— এ এক যুগোপযোগী ও চেতনার দ্যোতক মূল সুরকে সামনে রেখে কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই পরিবেশবান্ধব উৎসবে সূচনা দিনেই বিরাজ করছিল অভূতপূর্ব উদ্দীপনা ও উৎসবমুখর আবহ।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকাল থেকেই জেলা শহর কিশোরগঞ্জের আবহাওয়া ও পরিবেশ হয়ে উঠেছিল অনন্য সাজে সজ্জিত। সবুজের বার্তাকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে সকাল ১০টার দিকে শহরের বুক চিরে বের হয় এক দৃষ্টিনন্দন ও বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা।
কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম এবং কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিনের যৌথ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে এই শোভাযাত্রাটি শহরের প্রাণকেন্দ্র এবং ঐতিহাসিক 'বটতলা' এলাকা থেকে শুভ সূচনা লাভ করে। শোভাযাত্রায় পরিবেশপ্রেমী নাগরিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, স্কাউট সদস্য এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো শহর যেন এক সবুজ উৎসবে পরিণত হয়। হাতে হাতে পরিবেশ সচেতনতামূলক ব্যানার, ফেস্টুন ও প্লেকার্ড নিয়ে অংশ নেওয়া শত শত মানুষের স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে রাজপথ।র্যালিটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ও বাণিজ্যিক এলাকা সফলভাবে প্রদক্ষিণ শেষে শহরের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী স্থান 'পুরাতন স্টেডিয়াম' প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়। পরবর্তীতে পুরাতন স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণেই প্রধান অতিথি ও অন্যান্য আমন্ত্রিত মেহমানবৃন্দ আনুষ্ঠানিকভাবে মেলা চত্বরে প্রবেশ করেন এবং বৃক্ষমেলা-২০২৬ এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। উদ্বোধন শেষে অতিথিবৃন্দ মেলায় অংশগ্রহণকারী সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত নার্সারির বৈচিত্র্যময় স্টলগুলো ঘুরে দেখেন। স্টলগুলোতে শোভা পাওয়া বিরল প্রজাতির বনজ, রসালো ফলদ, ভেষজ ও ঔষধি এবং দৃষ্টিনন্দন পাতাবাহারি চারা দেখে অতিথিরা সন্তোষ প্রকাশ করেন। প্রদর্শনীতে থাকা উন্নত জাতের আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, আমলকী, নিম, অর্জুন থেকে শুরু করে দেশীয় বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির চারাগাছগুলো উপস্থিত দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।
র্যালি ও মেলা চত্বর পরিদর্শন পর্ব শেষে দুপুর ১২টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিনের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই আলোচনা সভায় উপস্থিত বক্তারা পরিবেশ সংরক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং রোপণকৃত গাছের সুরক্ষায় নানামুখী প্রস্তাবনা ও বাস্তবমুখী পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য প্রদান করেন ময়মনসিংহ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ নুরুল করিম। তিনি কিশোরগঞ্জ জেলায় চলমান বৃক্ষরোপণ অভিযানের সার্বিক তথ্য তুলে ধরে একটি সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান উপস্থাপন করেন। তিনি জানান," পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চলতি বৃক্ষরোপণ অভিযানের আওতায় ইতোমধ্যে কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও চরাঞ্চলে ১৩ হাজার ৬৫০টি গাছের চারা সফলভাবে রোপণ করা হয়েছে।" বক্তৃতায় তিনি কেবল চারা রোপণের মানসিকতার উর্ধ্বে উঠে পরিচর্যার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেন। তিনি মন্তব্য করেন, "কেবল শত শত চারা রোপণ করে ছবি তোলা বা আনুষ্ঠানিকতা শেষ করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য নয়। একটি চারাগাছকে পূর্ণাঙ্গ মহীরুহে পরিণত করতে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত তার নিবিড় পরিচর্যা, পানি সেচ ও বেড়া দিয়ে সুরক্ষা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।" কাজী মোহাম্মদ নুরুল করিম আরও বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী সড়ক বা বনাঞ্চলের অতি পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ গাছ নিয়ম মেনে অপসারণের পাশাপাশি সেই শূন্য স্থানে নতুন চারা রোপণের ধারাবাহিকতা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে হবে, যাতে পরিবেশের ভারসাম্য কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়।
সভাপতির বক্তব্যে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন সভার উদ্দেশ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় গাছ লাগানোর বৈজ্ঞানিক ও জাগতিক গুরুত্ব অত্যন্ত চমৎকার ভাষায় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "গাছ আমাদের বিনা মূল্যে জীবনদায়ী অক্সিজেন সরবরাহ করে বাঁচিয়ে রাখে। মাটির ক্ষয় রোধ করা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে বৃক্ষের কোনো বিকল্প নেই। বৃক্ষ রোপণ আমাদের অস্তিত্বের স্বার্থেই করতে হবে।" তিনি আরও প্রকাশ করেন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপের কথা। প্রশাসন যে কেবল চারা রোপণ করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, তা উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক জানান, জিও-ট্যাগিং (Geo-tagging) প্রযুক্তিনির্ভর একটি অত্যাধুনিক অ্যাপের মাধ্যমে কিশোরগঞ্জ জেলায় কোথায়, কোন তারিখে এবং কতটি চারা রোপণ করা হয়েছে—তার নির্ভুল ভৌগোলিক অবস্থান ও তথ্যভান্ডার সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এই ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে রোপণকৃত চারাগুলোর বৃদ্ধি, টিকে থাকার হার এবং সুরক্ষার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ (Monitoring) নিশ্চিত করা সহজ হবে, যা পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে।
আলোচনা সভার প্রধান অতিথি, কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম তাঁর বক্তব্যে বৃক্ষরোপণকে কেবল নির্দিষ্ট কোনো সরকারি দপ্তর বা বন বিভাগের কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একে প্রতিটি নাগরিকের জাতীয় ও ঈমানি দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করার তাগিদ দেন। তিনি তাঁর সাবলীল ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে বলেন, "সবুজ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার মহতী স্বপ্ন একা সরকারের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এটি আমাদের প্রত্যেকের সম্মিলিত সামাজিক দায়িত্ব। জলবায়ুর অভিঘাত থেকে আমাদের আগামী প্রজন্মকে মুক্ত রাখতে হলে সবুজায়নের বিকল্প নেই।" সংসদ সদস্য স্থানীয় সর্বস্তরের জনগণকে উদ্দেশ্য করে আহ্বান জানান যে, নিজ নিজ বসতবাড়ির খালি আঙিনা, অব্যবহৃত পতিত জমি, গ্রামীণ ও শহরের রাস্তার দুই পাশ, পুকুরপাড়, সামাজিক প্রতিষ্ঠানের চত্বর এবং বিশেষ করে রেললাইনের পার্শ্ববর্তী ফাঁকা উপযুক্ত জায়গাগুলোতে ফলজ, বনজ ও ওষুধি চারার সমন্বয় ঘটিয়ে রোপণ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, কেবল নিজেরা চারা লাগালেই হবে না, বরং আশপাশের মানুষকেও বৃক্ষরোপণে উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং প্রতিটি রোপণকৃত চারার যথাযথ তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
কিশোরগঞ্জের পরিবেশ রক্ষার এই বিশেষ দিনটিতে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, চিকিৎসক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মিলনমেলায় পরিণত হয় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষ। সব মত ও পথের ঊর্ধ্বে উঠে দলমত নির্বিশেষে পরিবেশ রক্ষায় এই একত্রীকরণ অনুষ্ঠানটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
আলোচনা সভা ও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বক্তব্য ও সমর্থন জ্ঞাপন করেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোঃ ইশতিয়াক ইমন, সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ নাজমুল করিম, জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর অধ্যাপক মোঃ রমজান আলী, জেলা ইসলামী আন্দোলনের আমীর আলমগীর হোসেন তালুকদার, জেলা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সভাপতি খায়রুল কবির খোকন, জেলা যুবদলের সভাপতি খসরুজ্জামান শরীফ। এছাড়াও অনুষ্ঠানে জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ, পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধি, স্থানীয় সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের শিক্ষাবিদ ও ব্যক্তিবর্গ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।
কিশোরগঞ্জে আয়োজিত এই সপ্তাহব্যাপী বৃক্ষমেলা ও রোপণ অভিযান কেবল ৭ দিনের একটি আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতার এক নতুন জোয়ার সৃষ্টি করেছে। মেলা প্রাঙ্গণে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য সুলভ মূল্যে উন্নত জাতের চারা বিক্রির সুব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
আধুনিক জিও-ট্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে চারা পর্যবেক্ষণ, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং সর্বস্তরের রাজনীতিক ও জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ কিশোরগঞ্জের প্রাকৃতিক পরিবেশকে আরও টেকসই, সবুজ ও সজীব করে তুলবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন হাওর-বাঁওড় বেষ্টিত এই জেলার সচেনতন নাগরিকবৃন্দ। 'সবার আগে বাংলাদেশ' গড়ে তোলার এই স্বপ্নে প্রকৃতিকে ভালোবেসে সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে চারা রোপণ ও লালন-পালনে এগিয়ে আসবে, আজকের এই শুভ সূচনা থেকে সেই আশার আলোই প্রতিফলিত হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন