হাওরাঞ্চলের শান্ত জনপদ কিশোরগঞ্জের মিঠামইন এখন থমথমে। উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা ও এর পেছনে থাকা রহস্যের জাল উন্মোচনে প্রশাসন যখন ব্যতিব্যস্ত, তখন আদালত থেকে এলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্দেশনা। মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারকৃত তিন আসামিকে পাঁচ দিন করে পুলিশ রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
রবিবার (১৯ জুলাই) দুপুরে কিশোরগঞ্জের ৪ নম্বর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক লুৎফুন্নাহার এ চাঞ্চল্যকর আদেশ দেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনোয়ার হোসেন আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলে, দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত প্রত্যেকের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এই আদেশ জারির পর থেকেই জেলার রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে কৌতূহল ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। কেন বহিরাগত এই যুবকেরা মিঠামইনে এসে প্রবীণ এই রাজনৈতিক নেতাকে টার্গেট করল? কার নির্দেশে এই কিলিং মিশন বাস্তবায়িত হলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এখন তদন্তের গভীর সাগরে ডুব দিচ্ছে পুলিশ।
রবিবার দুপুর থেকেই কিশোরগঞ্জ আদালত চত্বরে ছিল কড়া নিরাপত্তা। চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার আসামিদের যখন প্রিজন ভ্যান থেকে নামিয়ে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, তখন উৎসুক জনতার ভিড় সামলাতে পুলিশকে বেশ বেগ পেতে হয়। শুনানি চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে জানান, এটি কোনো সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয়। এটি একটি সুপরিকল্পিত এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিলিং মিশন হতে পারে। যেহেতু গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা স্থানীয় কেউ নন, তাই তারা কার ইশারায় মিঠামইনে এসে এই দুঃসাহসিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা বের করা অত্যন্ত জরুরি। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার, অর্থায়নকারী ও মূল পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করতে আসামিদের পুলিশি হেফাজতে নিয়ে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের কোনো বিকল্প নেই। শুনানি শেষে বিজ্ঞ বিচারক লুৎফুন্নাহার আসামিদের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
গ্রেপ্তারকৃত তিন আসামির পরিচয় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তারা দেশের তিনটি ভিন্ন ভিন্ন জেলার বাসিন্দা, যাদের সাথে মিঠামইনের ভৌগোলিক বা সামাজিক কোনো যোগাযোগ থাকার কথা নয়। এই বিষয়টিই পুলিশকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলছে। রিমান্ডে যাওয়া আসামিরা হলেন, বরগুনার বামনা উপজেলার চাকাতাসুনিয়া গ্রামের মৃত সুলতান মীরনের ছেলে মোঃ হেলাল (২৪), লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার সুধামপুর গ্রামের নূর হোসেনের ছেলে মহিন উদ্দিন (৩২) এবং লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার মধ্যপাড়া গ্রামের রহমত উল্লাহ খোকনের ছেলে মোঃ শাহিন আলম ওরফে শাকিল (২৭)। তদন্তকারীদের ধারণা, পেশাদার এই খুনি চক্রটিকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে "হায়ার" বা ভাড়া করে আনা হয়েছিল। স্থানীয় কোনো প্রভাবশালী চক্র নিজেদের হাত পরিচ্ছন্ন রাখতে এই বহিরাগত ঘাতকদের ব্যবহার করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৫ জুলাই রাত পৌনে ১০টার দিকে। মিঠামইন উপজেলা সদরের বেড়িবাঁধ এলাকায় অবস্থিত নিজ বাসভবনের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর। হাওরের নির্মল বাতাসে রাতের নিস্তব্ধতা যখন নেমে আসছিল, ঠিক তখনই অন্ধকার ফুঁড়ে ওত পেতে থাকা একদল দুর্বৃত্ত তাঁর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে রক্তাক্ত জাহাঙ্গীর বাঁচার জন্য চিৎকার শুরু করেন। তাঁর আর্তচিৎকার শুনে ঘরের ভেতর ও আশপাশ থেকে ছুটে আসেন স্থানীয় বিএনপি কর্মী হাদিস মিয়া। তিনি জাহাঙ্গীরকে বাঁচাতে গেলে ঘাতকেরা তাঁর ওপরও নৃশংস হামলা চালায় এবং তাকে গুরুতর আহত করে। হামলা শেষে ঘাতকেরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে জাহাঙ্গীরের রক্তাক্ত দেহ দেখে এবং হাদিস মিয়ার চিৎকার শুনে স্থানীয় এলাকাবাসী ও দলীয় নেতা-কর্মীরা চারদিক থেকে ঘেরাও করে ফেলে। সাহসিকতার সাথে ধাওয়া করে ঘটনাস্থল থেকেই ‘মো. হেলাল’ নামের এক হামলাকারীকে হাতেনাতে ধরে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয় স্থানীয়রা। পরে আটককৃত হেলালের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মিঠামইন থানা পুলিশ রাতভর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে বাকি দুই আসামি মহিন উদ্দিন ও শাহিন আলম ওরফে শাকিলকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
রক্তাক্ত ও মুমূর্ষু অবস্থায় জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর এবং আহত হাদিস মিয়াকে দ্রুত কিশোরগঞ্জ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে মৃত ঘোষণা করেন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে, গুরুতর আহত হাদিস মিয়া এখনো হাসপাতালের বিছানায় জীবনের সাথে পাঞ্জা লড়ছেন।
জনপ্রিয় এই বিএনপি নেতার আকস্মিক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো কিশোরগঞ্জ জেলাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। মিঠামইনের ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়। হত্যাকাণ্ডের তিন দিন পর, অর্থাৎ ১৮ জুলাই দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে নিহতের স্ত্রী তসলিমা আক্তার চৌধুরী বাদী হয়ে মিঠামইন থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় গ্রেপ্তারকৃত ওই তিন আসামির নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করার পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। তসলিমা আক্তার চৌধুরী তাঁর এজাহারে অভিযোগ করেছেন, এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনোয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন,"হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা প্রত্যেকেই বহিরাগত। ঘটনার পরপরই আমাদের তৎপরতার কারণে তিনজনকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছি, যা এই মামলার তদন্তে একটি বিশাল মাইলফলক। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আমরা বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি।" ওসি আরও যোগ করেন,"এখন আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। এই পাঁচ দিনে আমরা আসামিদের বিস্তারিত এবং মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করব। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো—কারা এই হত্যাকাণ্ডের মূল নির্দেশদাতা (মাস্টারমাইন্ড), কারা এই কিলিং মিশনের জন্য অর্থায়ন করেছে এবং ঠিক কী উদ্দেশ্যে এই শান্ত জনপদকে অশান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে, তা বের করা। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং এজাহারভুক্ত ও অজ্ঞাতনামা অন্য আসামিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।"
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর মিঠামইন উপজেলা বিএনপির একজন অত্যন্ত সজ্জন, জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। হাওরাঞ্চলের রাজনীতিতে তাঁর একটি নিজস্ব গ্রহণযোগ্যতা ছিল। এমন একজন নেতাকে নিজ বাড়ির দোরগোড়ায় এসে বহিরাগত পেশাদার খুনিদের দিয়ে হত্যা করানোর বিষয়টি ইঙ্গিত করে যে, এর পেছনে অত্যন্ত শক্তিশালী কোনো মহলের হাত রয়েছে। রিমান্ডে থাকা এই তিন আসামির মুখ থেকে বের হয়ে আসা তথ্যই বলে দেবে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কাজ করেছে, নাকি স্থানীয় কোনো অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ এর পেছনে দায়ী। তবে মিঠামইনের সাধারণ মানুষ ও সাধারণ বিএনপি নেতা-কর্মীদের দাবি, অবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে মূল অপরাধীদের যেন ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানো হয়।
পাঁচ দিনের এই রিমান্ড শেষে পুলিশ কী তথ্য উদঘাটন করতে পারে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে পুরো কিশোরগঞ্জবাসী।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুলাই ২০২৬
হাওরাঞ্চলের শান্ত জনপদ কিশোরগঞ্জের মিঠামইন এখন থমথমে। উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা ও এর পেছনে থাকা রহস্যের জাল উন্মোচনে প্রশাসন যখন ব্যতিব্যস্ত, তখন আদালত থেকে এলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্দেশনা। মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারকৃত তিন আসামিকে পাঁচ দিন করে পুলিশ রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
রবিবার (১৯ জুলাই) দুপুরে কিশোরগঞ্জের ৪ নম্বর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক লুৎফুন্নাহার এ চাঞ্চল্যকর আদেশ দেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনোয়ার হোসেন আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলে, দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত প্রত্যেকের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এই আদেশ জারির পর থেকেই জেলার রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে কৌতূহল ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। কেন বহিরাগত এই যুবকেরা মিঠামইনে এসে প্রবীণ এই রাজনৈতিক নেতাকে টার্গেট করল? কার নির্দেশে এই কিলিং মিশন বাস্তবায়িত হলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এখন তদন্তের গভীর সাগরে ডুব দিচ্ছে পুলিশ।
রবিবার দুপুর থেকেই কিশোরগঞ্জ আদালত চত্বরে ছিল কড়া নিরাপত্তা। চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার আসামিদের যখন প্রিজন ভ্যান থেকে নামিয়ে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, তখন উৎসুক জনতার ভিড় সামলাতে পুলিশকে বেশ বেগ পেতে হয়। শুনানি চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে জানান, এটি কোনো সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয়। এটি একটি সুপরিকল্পিত এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিলিং মিশন হতে পারে। যেহেতু গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা স্থানীয় কেউ নন, তাই তারা কার ইশারায় মিঠামইনে এসে এই দুঃসাহসিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা বের করা অত্যন্ত জরুরি। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার, অর্থায়নকারী ও মূল পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করতে আসামিদের পুলিশি হেফাজতে নিয়ে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের কোনো বিকল্প নেই। শুনানি শেষে বিজ্ঞ বিচারক লুৎফুন্নাহার আসামিদের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
গ্রেপ্তারকৃত তিন আসামির পরিচয় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তারা দেশের তিনটি ভিন্ন ভিন্ন জেলার বাসিন্দা, যাদের সাথে মিঠামইনের ভৌগোলিক বা সামাজিক কোনো যোগাযোগ থাকার কথা নয়। এই বিষয়টিই পুলিশকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলছে। রিমান্ডে যাওয়া আসামিরা হলেন, বরগুনার বামনা উপজেলার চাকাতাসুনিয়া গ্রামের মৃত সুলতান মীরনের ছেলে মোঃ হেলাল (২৪), লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার সুধামপুর গ্রামের নূর হোসেনের ছেলে মহিন উদ্দিন (৩২) এবং লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার মধ্যপাড়া গ্রামের রহমত উল্লাহ খোকনের ছেলে মোঃ শাহিন আলম ওরফে শাকিল (২৭)। তদন্তকারীদের ধারণা, পেশাদার এই খুনি চক্রটিকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে "হায়ার" বা ভাড়া করে আনা হয়েছিল। স্থানীয় কোনো প্রভাবশালী চক্র নিজেদের হাত পরিচ্ছন্ন রাখতে এই বহিরাগত ঘাতকদের ব্যবহার করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৫ জুলাই রাত পৌনে ১০টার দিকে। মিঠামইন উপজেলা সদরের বেড়িবাঁধ এলাকায় অবস্থিত নিজ বাসভবনের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর। হাওরের নির্মল বাতাসে রাতের নিস্তব্ধতা যখন নেমে আসছিল, ঠিক তখনই অন্ধকার ফুঁড়ে ওত পেতে থাকা একদল দুর্বৃত্ত তাঁর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে রক্তাক্ত জাহাঙ্গীর বাঁচার জন্য চিৎকার শুরু করেন। তাঁর আর্তচিৎকার শুনে ঘরের ভেতর ও আশপাশ থেকে ছুটে আসেন স্থানীয় বিএনপি কর্মী হাদিস মিয়া। তিনি জাহাঙ্গীরকে বাঁচাতে গেলে ঘাতকেরা তাঁর ওপরও নৃশংস হামলা চালায় এবং তাকে গুরুতর আহত করে। হামলা শেষে ঘাতকেরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে জাহাঙ্গীরের রক্তাক্ত দেহ দেখে এবং হাদিস মিয়ার চিৎকার শুনে স্থানীয় এলাকাবাসী ও দলীয় নেতা-কর্মীরা চারদিক থেকে ঘেরাও করে ফেলে। সাহসিকতার সাথে ধাওয়া করে ঘটনাস্থল থেকেই ‘মো. হেলাল’ নামের এক হামলাকারীকে হাতেনাতে ধরে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয় স্থানীয়রা। পরে আটককৃত হেলালের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মিঠামইন থানা পুলিশ রাতভর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে বাকি দুই আসামি মহিন উদ্দিন ও শাহিন আলম ওরফে শাকিলকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
রক্তাক্ত ও মুমূর্ষু অবস্থায় জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর এবং আহত হাদিস মিয়াকে দ্রুত কিশোরগঞ্জ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে মৃত ঘোষণা করেন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে, গুরুতর আহত হাদিস মিয়া এখনো হাসপাতালের বিছানায় জীবনের সাথে পাঞ্জা লড়ছেন।
জনপ্রিয় এই বিএনপি নেতার আকস্মিক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো কিশোরগঞ্জ জেলাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। মিঠামইনের ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়। হত্যাকাণ্ডের তিন দিন পর, অর্থাৎ ১৮ জুলাই দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে নিহতের স্ত্রী তসলিমা আক্তার চৌধুরী বাদী হয়ে মিঠামইন থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় গ্রেপ্তারকৃত ওই তিন আসামির নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করার পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। তসলিমা আক্তার চৌধুরী তাঁর এজাহারে অভিযোগ করেছেন, এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনোয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন,"হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা প্রত্যেকেই বহিরাগত। ঘটনার পরপরই আমাদের তৎপরতার কারণে তিনজনকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছি, যা এই মামলার তদন্তে একটি বিশাল মাইলফলক। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আমরা বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি।" ওসি আরও যোগ করেন,"এখন আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। এই পাঁচ দিনে আমরা আসামিদের বিস্তারিত এবং মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করব। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো—কারা এই হত্যাকাণ্ডের মূল নির্দেশদাতা (মাস্টারমাইন্ড), কারা এই কিলিং মিশনের জন্য অর্থায়ন করেছে এবং ঠিক কী উদ্দেশ্যে এই শান্ত জনপদকে অশান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে, তা বের করা। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং এজাহারভুক্ত ও অজ্ঞাতনামা অন্য আসামিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।"
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর মিঠামইন উপজেলা বিএনপির একজন অত্যন্ত সজ্জন, জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। হাওরাঞ্চলের রাজনীতিতে তাঁর একটি নিজস্ব গ্রহণযোগ্যতা ছিল। এমন একজন নেতাকে নিজ বাড়ির দোরগোড়ায় এসে বহিরাগত পেশাদার খুনিদের দিয়ে হত্যা করানোর বিষয়টি ইঙ্গিত করে যে, এর পেছনে অত্যন্ত শক্তিশালী কোনো মহলের হাত রয়েছে। রিমান্ডে থাকা এই তিন আসামির মুখ থেকে বের হয়ে আসা তথ্যই বলে দেবে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কাজ করেছে, নাকি স্থানীয় কোনো অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ এর পেছনে দায়ী। তবে মিঠামইনের সাধারণ মানুষ ও সাধারণ বিএনপি নেতা-কর্মীদের দাবি, অবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে মূল অপরাধীদের যেন ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানো হয়।
পাঁচ দিনের এই রিমান্ড শেষে পুলিশ কী তথ্য উদঘাটন করতে পারে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে পুরো কিশোরগঞ্জবাসী।

আপনার মতামত লিখুন