শরতের শেষ আলোয় যখন নদীর বুক থেকে উঠে আসা কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই কিশোরগঞ্জ শহরের আখড়া বাজার সংলগ্ন পরমচত্বরে জমায়েত হতে থাকেন একদল স্বপ্নবান মানুষ। হাতে প্ল্যাকার্ড, কণ্ঠে দাবি, চোখে শহরটিকে ফিরে পাওয়ার তীব্র আকুতি। আজ শনিবার সকাল দশটায় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার উদ্যোগে এখানে অনুষ্ঠিত হলো এক মানববন্ধন ও পথসভা। বিষয় একটাই, শহরের দুঃসহ যানজট। অথচ এই একটি শব্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো মানুষের প্রতিদিনের ক্লান্তি, বিলম্ব, ধোঁয়া আর দীর্ঘশ্বাসের গল্প।
নরসুন্দা নদীর তীরে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী জনপদ কিশোরগঞ্জ একসময় পরিচিত ছিল শান্ত, সবুজ ও সংস্কৃতিমনা শহর হিসেবে। এখানকার বাতাসে মিশে ছিল মধ্যযুগের পালাগানের সুর, মাটির গন্ধে ছিল মৈমনসিংহ গীতিকার মায়া। কিন্তু সময়ের চাকা ঘুরেছে, শহর ফুলে-ফেঁপে উঠেছে, আর সেই সঙ্গে সরু হয়ে এসেছে শহরের শ্বাসনালি। আজ সকালের স্কুলগামী শিশু থেকে হাসপাতালগামী রোগী, দোকানি থেকে অফিসযাত্রী, সবাইকে প্রতিদিন লড়তে হয় একই অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে, আর সেই শত্রুর নাম যানজট।
রিকশা, অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত যান, মোটরসাইকেল, বাস, ট্রাক আর পথচারী মিলে শহরের প্রধান সড়কগুলো যেন এক জটিল ধাঁধায় পরিণত হয়েছে। ফুটপাত দখল হয়ে গেছে, সড়কের দুই পাশে অবৈধ পার্কিং, মোড়ে মোড়ে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, আর নিয়ম মানার সংস্কৃতির অভাব, সব মিলিয়ে শহরের গতি থমকে আছে। এই থমকে যাওয়া গতিকে আবার সচল করার আহ্বান নিয়েই আজ পরমচত্বরে একত্র হয়েছিলেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাপা কিশোরগঞ্জ জেলার সভাপতি, বিশিষ্ট আইনজীবী এডভোকেট হামিদা বেগম। আদালতের কাঠগড়ায় যিনি ন্যায়ের পক্ষে যুক্তি সাজান, আজ তিনি দাঁড়িয়েছেন পথের মানুষের পাশে, শহরের শ্বাস ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে। সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম জুয়েল। তাঁর সাবলীল উপস্থাপনায় পুরো আয়োজন পায় একটি সুশৃঙ্খল ও প্রাণবন্ত রূপ। স্বাগত বক্তব্যে অংশ নেন সংগঠনের সহসভাপতি মোঃ আবুল হোসেন, কোষাধ্যক্ষ মোঃ লুৎফর কবীর এবং সদস্য মোঃ রুহুল আমিন, কামরুন্নাহার, ইসরাত জাহান, বিলকিস বেগম, মনিকা দাস, আলমগীর হোসেন ও এডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম শওকত। তাঁদের প্রত্যেকের কণ্ঠে ছিল একই সুর: শহর আমাদের সবার, তাই শহরের সমস্যার সমাধানও হতে হবে সবার অংশগ্রহণে। বক্তারা বলেন, যানজট শুধু সময়ের অপচয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, অর্থনীতি ও নাগরিক মর্যাদার ওপর এক নীরব আঘাত।
বক্তারা তাঁদের আলোচনায় তুলে ধরেন, যানজটের প্রভাব কত গভীর ও বহুমাত্রিক। দীর্ঘক্ষণ জটে আটকে থাকা যানবাহনের ইঞ্জিন থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া বাতাসে মিশে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও ফুসফুসের নানা জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়। ক্ষুদে শিক্ষার্থী, বয়স্ক নাগরিক ও অসুস্থ মানুষ এর সবচেয়ে সহজ শিকার। আর যানবাহনের উচ্চ শব্দ, বিশেষ করে অপ্রয়োজনীয় হর্ন, শহরবাসীর মানসিক প্রশান্তি কেড়ে নিচ্ছে প্রতিনিয়ত।
অর্থনৈতিক ক্ষতির দিকটিও উঠে আসে আলোচনায়। সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে না পারা, কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া, জ্বালানির বাড়তি খরচ, এ সবই শেষ পর্যন্ত বোঝা হয়ে চাপে সাধারণ মানুষের কাঁধে। জরুরি মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্স কিংবা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আটকে পড়লে কেবল সময় নয়, কখনো কখনো প্রাণও হারিয়ে যায়, যার ক্ষতি কোনো হিসাবেই পূরণ হয় না।
পথসভায় শহরের যানজট নিয়ে আরও বক্তব্য রাখেন কিশোরগঞ্জ মহিলা পরিষদের সভাপতি এডভোকেট মায়া ভৌমিক, প্রবীণ হিতৈষী সংঘের সভাপতি ডাক্তার আতিক সারোয়ার এবং মানবাধিকার আইনজীবী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট কামাল হোসেনসহ শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
নারী অধিকারের প্রতিনিধি হিসেবে মায়া ভৌমিক বলেন, যানজট ও বিশৃঙ্খল সড়ক ব্যবস্থা নারীদের জন্য বাড়তি অনিরাপত্তা ও ভোগান্তি তৈরি করে। কর্মজীবী নারী, শিক্ষার্থী ছাত্রী কিংবা সন্তান কোলে মা, সবাইকে প্রতিদিন এই অব্যবস্থার মধ্য দিয়েই পথ চলতে হয়। নিরাপদ, সহজ ও মর্যাদাপূর্ণ চলাচল প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার, এই বার্তাই ছিল তাঁর বক্তব্যের মূল সুর।
প্রবীণদের পক্ষ থেকে ডাক্তার আতিক সারোয়ার আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, একসময় যে শহরের পথে হেঁটে চলা ছিল আনন্দের, আজ সেই পথ পার হওয়াই প্রবীণদের কাছে এক দুঃসাহসিক অভিযান। ফুটপাত নেই, জেব্রা ক্রসিং অস্পষ্ট, আর গাড়ির ভিড়ে বৃদ্ধ মানুষের পক্ষে রাস্তা পার হওয়া প্রায় অসম্ভব। চিকিৎসক হিসেবে তিনি আরও সতর্ক করেন, দূষিত বাতাস ও শব্দদূষণ প্রবীণদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
মানবাধিকার আইনজীবী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট কামাল হোসেন বলেন, নিরাপদ ও চলাচলযোগ্য সড়ক পাওয়া নাগরিকের সাংবিধানিক ও মানবিক অধিকারের অংশ। এই অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব, আবার নিয়ম মেনে চলা প্রতিটি নাগরিকেরও কর্তব্য। আইনের প্রয়োগ ও নাগরিক সচেতনতা, দুয়ের সমন্বয় ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয় বলে তিনি মত দেন।
বক্তৃতার পাশাপাশি সকালের রোদে পরমচত্বরের সড়কের ধারে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ান শতাধিক মানুষ। নারী-পুরুষ, তরুণ-প্রবীণ, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবী, সবাই হাতে হাত রেখে গড়ে তোলেন এক দীর্ঘ মানবশৃঙ্খল। এ শৃঙ্খল কোনো বন্দিত্বের নয়, বরং মুক্তির প্রত্যাশার। প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল নানা বার্তা, যেমন "যানজটমুক্ত কিশোরগঞ্জ চাই", "ফুটপাত হোক পথচারীর", "শৃঙ্খলা মানি, শহর বাঁচাই", "অকারণ হর্ন নয়, শান্তির শহর চাই"। পথচলতি মানুষ কেউ থমকে দাঁড়িয়ে শুনলেন, কেউ মুঠোফোনে ছবি তুললেন, কেউ মৃদু হেসে সম্মতির মাথা নাড়লেন। কারণ এ দাবি যে তাঁদেরও মনের কথা।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে সমাপনী বক্তব্য রাখেন সভাপতি এডভোকেট হামিদা বেগম। তিনি বলেন, শুধু সমালোচনা করে নয়, সমাধানের পথ দেখাতেই আজ আমরা পথে নেমেছি। কিশোরগঞ্জ শহরকে যানজটমুক্ত রাখতে তিনি বিভিন্ন প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, ফুটপাত ও সড়কের অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে পথচারীদের জন্য নিরাপদ হাঁটার জায়গা ফিরিয়ে দিতে হবে। ফুটপাত পথচারীর, এই সাধারণ সত্যটি আবার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শহরের নির্দিষ্ট স্থানে সুনির্দিষ্ট বাস, অটোরিকশা ও রিকশা স্ট্যান্ড নির্ধারণ করতে হবে এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা বন্ধ করতে হবে। যানবাহন ভেদে নির্দিষ্ট রুট ও চলাচলের সময় নির্ধারণের বিষয়টিও বিবেচনায় আনার আহ্বান জানান তিনি। সড়কের পাশে অবৈধ পার্কিং বন্ধ করে পরিকল্পিত পার্কিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে শহরের উপযুক্ত স্থানে বহুতল বা নির্ধারিত পার্কিং এলাকা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি আরো বলেন, ট্রাফিক পুলিশের জনবল ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে চালক ও পথচারীদের মধ্যে ট্রাফিক সচেতনতা বাড়াতে স্কুল-কলেজ ও পাড়া-মহল্লায় নিয়মিত প্রচারণা চালানোর কথা বলেন তিনি। শহরের ভেতর দিয়ে দূরপাল্লার পণ্যবাহী ও ভারী যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে বিকল্প বাইপাস সড়ক ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে। এতে শহরের কেন্দ্রীয় সড়কগুলোর ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে মত দেন তিনি। তাছাড়া সংকীর্ণ সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো সংস্কার ও প্রশস্ত করা, কার্যকর ট্রাফিক সিগন্যাল ও সাইনবোর্ড স্থাপন এবং পথচারী পারাপারের জন্য স্পষ্ট জেব্রা ক্রসিং ও প্রয়োজনে ফুট ওভারব্রিজের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন। এছাড়া পরিবেশবান্ধব যাতায়াতকে উৎসাহিত করতে সাইকেল ও হাঁটার উপযোগী পরিবেশ তৈরি এবং সর্বোপরি জেলা প্রশাসন, পৌরসভা, পুলিশ প্রশাসন, সড়ক বিভাগ ও নাগরিক সংগঠনের সমন্বয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠনের আহ্বান জানান তিনি, যাতে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা যায়।
সমাপনী বক্তব্যের এক পর্যায়ে এডভোকেট হামিদা বেগম বলেন, একটি শহর কেবল ইট-পাথরের কাঠামো নয়, সেটি মানুষের স্বপ্ন, স্মৃতি আর ভবিষ্যতের আধার। সেই শহরকে বাসযোগ্য রাখার দায় যেমন প্রশাসনের, তেমনি প্রতিটি নাগরিকের। তিনি সবাইকে নিয়ম মেনে চলার, অকারণে হর্ন না বাজানোর, নির্ধারিত স্থানে যান পার্ক করার এবং পথচারীদের প্রতি সহমর্মী হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর ভাষায়, পরিবর্তন শুরু হয় ছোট ছোট অভ্যাসের বদল থেকে, আর সেই বদলের সূচনা হোক আজ, এখান থেকেই।
বক্তারা প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান, বাপার প্রস্তাবগুলো যেন আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করা হয় এবং দ্রুত বাস্তবায়নের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাসও দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) দেশের পরিবেশ রক্ষা ও জনসচেতনতা তৈরিতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি নাগরিক সংগঠন। নদী রক্ষা, বায়ু ও শব্দদূষণ রোধ, সবুজ বেষ্টনী সংরক্ষণসহ নানা ইস্যুতে সংগঠনটির কার্যক্রম পরিচিত। কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার আজকের কর্মসূচি সেই ধারাবাহিকতারই অংশ, যেখানে যানজটকে কেবল যোগাযোগ সমস্যা হিসেবে নয়, বরং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে সামনে আনা হয়েছে।
শহরের সচেতন মহলের মতে, বাপার এই উদ্যোগ কেবল একটি প্রতীকী কর্মসূচি নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি পরিকল্পিত আলোচনার সূচনা। নাগরিক সমাজ যখন সমস্যার পাশাপাশি সমাধানের প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে আসে, তখন প্রশাসনের পক্ষেও সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
কর্মসূচি শেষে যখন মানুষের শৃঙ্খল ভেঙে ধীরে ধীরে সবাই ফিরে যাচ্ছিলেন, পরমচত্বরের সড়ক আবার ভরে উঠছিল গাড়ির কোলাহলে। কিন্তু বাতাসে তখনও যেন ভেসে ছিল এক অমীমাংসিত প্রশ্ন: কবে আমরা এই শহরে নির্ভার হয়ে পথ হাঁটতে পারব? কবে শিশুরা নির্ভয়ে স্কুলে যাবে, প্রবীণরা নিশ্চিন্তে রাস্তা পার হবেন, আর অ্যাম্বুলেন্স পাবে অবাধ পথ?
উত্তরটি হয়তো একদিনে মিলবে না। কিন্তু আজ সকালে পরমচত্বরে জেগে ওঠা এই নাগরিক কণ্ঠ প্রমাণ করে, কিশোরগঞ্জ এখনো স্বপ্ন দেখতে জানে। আর যে শহর স্বপ্ন দেখে, সে শহর একদিন পথও খুঁজে পায়। প্রশাসন ও নাগরিক, উভয়ের সম্মিলিত উদ্যোগেই হয়তো একদিন যানজটের শৃঙ্খল ভেঙে নতুন প্রভাতের আলোয় জেগে উঠবে ভৈরব নদের এই প্রাচীন জনপদ।
যানজটে নাকাল কিশোরগঞ্জ: পরমচত্বরে বিক্ষোভ, শহর বাঁচাতে বাপার প্রস্তাব
বিষয় একটাই, শহরের দুঃসহ যানজট। অথচ এই একটি শব্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো মানুষের প্রতিদিনের ক্লান্তি, বিলম্ব, ধোঁয়া আর দীর্ঘশ্বাসের গল্প।








