উত্তরের হাওর-বিধৌত জনপদ কিশোরগঞ্জের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ধনু ও নরসুন্দার বাতাসে আজ আর কোনো স্নিগ্ধতার সুবাস নেই; সেখানে জমে উঠেছে বিষাদময় নগরজীবনের তীব্র দীর্ঘশ্বাস, হাহাকার আর অন্তহীন ক্ষোভ। নরসুন্দা নদীর কলতান যেখানে ঐতিহ্যের গল্প শোনাত, সেখানে প্রতিদিনের সকাল নেমে আসে এক বিভীষিকাময় রূপ নিয়ে, আর সন্ধ্যা ঢলে পড়ে নাগরিক ক্লান্তি ও রুদ্ধশ্বাস যন্ত্রণার অতল গহ্বরে। জেলা শহরের হারুয়া মোড় থেকে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দূরত্ব ভৌগোলিক স্কেলে মেপে দেখলে দেখা যাবে সাকুল্যে দুই কিলোমিটারের সামান্য কম। সাধারণ কোনো মেঠোপথ কিংবা রাজপথে যে পথটুকু হেঁটে পার হতেও কুড়ি মিনিটের বেশি সময় লাগার কথা নয়, সেই ছোট্ট দূরত্ব আজ আধুনিক কিশোরগঞ্জবাসীর জন্য পরিণত হয়েছে এক অনন্তযাত্রার অচলাবস্থায়। অসুস্থ স্বজনকে নিয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসকের কাছে ছোটা কোনো অ্যাম্বুলেন্স, কিংবা সময়মতো পরীক্ষার হলে পৌঁছানোর তাড়নায় আকুল কোনো শিক্ষার্থীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রহরগুলো এখন আটকে থাকছে পিচঢালা সড়কের ওপর জমে থাকা অবিরাম যানজটের কঙ্কালসার কারাগারে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চাকা ঘোরে না, কেবল তপ্ত পিচ থেকে উঠে আসা উত্তাপ আর হর্নের বিকট শব্দে থমকে থাকে অজস্র মানুষের জীবনস্পন্দন। নামেই সুপরিচিত ও প্রশাসনিকভাবে ঐতিহ্যবাহী এই শহরের বর্তমান অবস্থা যেন কেবল কাগজে-কলমে উন্নয়নের বুলি হয়ে রটেছে, যার বাস্তবিক কোনো ফল নেই কর্মক্ষেত্রে।
কিশোরগঞ্জ পৌরশহরের বুক চিরে চলে যাওয়া গৌরাঙ্গবাজার মোড়, রথখলা, পুরান থানা, স্টেশন রোড, বড়বাজার, একরামপুর থেকে শুরু করে হারুয়া ও যশোদল সড়ক—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রুট আজ লাইসেন্সবিহীন মিশুক, ইজিবাইক ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বেদখলে নিঃশ্বাস ফেলার ন্যূনতম ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। শহরজুড়ে তিল ধারণের জায়গা নেই। একসময় যে শহর শান্ত, সুশৃঙ্খল এবং পথচারীবান্ধব হিসেবে পরিচিত ছিল, আজ তা থিকথিক করছে অবৈধ ব্যাটারিচালিত বাহনের বেপরোয়া মিছিলে। শুধু শহর কিংবা পৌরসভার ভেতরের নির্দিষ্ট যানবাহনই নয়, প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগেই সংলগ্ন তাড়াইল, হোসেনপুর, কুলিয়ারচর, পাকুন্দিয়া, করিমগঞ্জ, কিংবা নিকলী ও ইটনা-অষ্টগ্রামের সংযোগস্থল থেকে অজস্র লাইসেন্সবিহীন অটোরিকশা ও মিশুক পঙ্গপালের মতো প্রবেশ করছে জেলা সদরের মূল সড়কগুলোতে। চালকের আসনে বসে আছেন এমন অনেক অনভিজ্ঞ তরুণ ও কিশোর, যাদের ট্রাফিক আইনের ন্যূনতম কোনো ধারণা নেই, নেই কোনো বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স বা শৃঙ্খলাবোধ। সড়কের যেকোনো স্থানে হুট করে মাঝপথে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী তোলা, লেন না মেনে উল্টো দিক থেকে হুট করে ঢুকে পড়া, আর ট্রাফিক সিগন্যালকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে খেয়ালখুশি মতো বাহন ঘুরিয়ে নেওয়ার ফলে প্রতিটি মোড় মুহূর্তে পরিণত হচ্ছে এক একটি অচল ও জটিল জটের গোলকধাঁধায়।
শহরের মোড়ে মোড়ে শোভা পাচ্ছে জেলা প্রশাসন ও ট্রাফিক বিভাগের নানামুখী দিকনির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড, ফেস্টুন আর সচেতনতামূলক ব্যানার। সচেতনতার কথা বলা সেসব সুদৃশ্য সাইনবোর্ড যেন আজ নিছক ধাতব পাত বা প্লাস্টিকের টুকরো ছাড়া আর কিছুই নয়। অবহেলা আর অ শৃঙ্খলার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এসব সাইনবোর্ড যেন অসহায় নাগরিকের জ্যামে স্থবির হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে এক নির্দয় ও করুণার ব্যঙ্গাত্মক হাসি হাসছে। সচেতনতার বাণী রয়েছে, আইনের অনুচ্ছেদগুলো সুস্পষ্ট অক্ষরে লেখা রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে প্রয়োগের অভাবে সেই বাণী কোনো স্বস্তি ফেরাতে পারছে না জনমনে। জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন ও জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান কিশোরগঞ্জের নাগরিক জীবনকে সুশৃঙ্খল করতে, শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং অবৈধ বাহনের লাগাম টানতে নানা সময়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন এবং তাদের শুভচিন্তা ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়নি। তবে তাদের এই ঐকান্তিক চেষ্টা, প্রশাসনিক তৎপরতা ও মোবাইল কোর্টের ঝটিকা অভিযানগুলোও দিনশেষে যেন এক অদৃশ্য ও শক্তিশালী চোরাবালির গভীরে হারিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের গৃহীত পদক্ষেপ সাময়িকভাবে কিছুটা প্রভাব ফেললেও স্থায়ী কোনো সমাধান আসছে না; কারণ একদিকে যখন অভিযান চলে, অন্যদিকে অসাধু ও অদৃশ্যের সুতোয় বাঁধা এক পরিবহন সিন্ডিকেটের হাত ধরে আবারও শহরে নামছে হাজার হাজার অনিবন্ধিত অটোরিকশা ও মিশুক।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি ফুটে ওঠে যখন হারুয়া থেকে যশোদলগামী শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগামী সড়কটিতে কোনো অসুস্থ রোগীবাহী যান আটকে পড়ে। একটি আঞ্চলিক বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র হওয়ায় প্রতিদিন সমগ্র জেলা ও আশপাশের হাওরাঞ্চল থেকে আসা শত শত মুমূর্ষু রোগী এই হাসপাতালে ছোটেন জীবনের শেষ সম্বলটুকু আঁকড়ে ধরে। কিন্তু হারুয়া পেরিয়ে সামান্য সামনে এগোতেই থমকে যায় সেই জীবন বাঁচানোর লড়াই। স্যালাইন হাতে শুয়ে থাকা কোনো মুমূর্ষু শিশু বা যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা কোনো বৃদ্ধকে নিয়ে স্বজনেরা যখন প্রতিটি সেকেন্ডকে ঘণ্টার মতো দীর্ঘ মনে করেন, তখন অটোরিকশার জটে আটকে থাকা অ্যাম্বুলেন্সের চালক কেবল ব্যাকুলভাবে সাইরেন বাজিয়ে যান। কিন্তু সেই সাইরেন গলতে পারে না শত শত ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলারের প্রাচীর ভেদ করে। মাত্র দুই কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিতে লেগে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সময়ের এই নির্মম অপচয় অনেক সময় কেেড় নেয় রোগীর জীবনের শেষ আশাটুকুও; অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই অ্যাম্বুলেন্সের সিটেই থেমে যায় একটি সতেজ প্রাণের স্পন্দন। শহরের সচেতন মহল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, এটি কেবল সাধারণ যানজট নয়, এটি একটি পদ্ধতিগত নাগরিক অভিশাপ ও পরোক্ষ মানবসৃষ্ট প্রশাসনিক বিপর্যয়।
প্রতিদিন ভোরে সূর্য ওঠার সাথে সাথেই কিশোরগঞ্জ শহরের প্রধান প্রধান প্রবেশদ্বারগুলোতে শুরু হয় অবৈধ বাহনের অনুপ্রবেশের মহোৎসব। শহরের অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে শত শত অবৈধ চার্জিং গ্যারেজ। অননুমোদিত উপায়ে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে এসব গ্যারেজে হাজার হাজার ব্যাটারিচালিত গাড়ি চার্জ দেওয়া হচ্ছে, যা একদিকে দেশের বিদ্যুৎ খাতের ওপর বিপুল চাপ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে অপরাধমূলক চক্রকে অবৈধ আয়ের সুযোগ করে দিচ্ছে। কোনো রেজিস্ট্রি না থাকায় এসব বাহন যেকোনো দুর্ঘটনা কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়ে নিমেষেই ভিড়ের মধ্যে উধাও হয়ে যেতে পারে। চালকদের মধ্যে নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ, নেই ন্যূনতম সিভিল সেকশনের নীতি-নৈতিকতা। কিশোরগঞ্জ পৌরসভার নিজস্ব নির্ধারিত ধারণক্ষমতা ও নিবন্ধিত যানবাহনের তালিকার চেয়ে বহুগুণ বেশি থ্রি-হুইলার প্রতিদিন শহরের রাস্তায় নামায় পুরো শহরের যোগাযোগ কাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। গৌরাঙ্গবাজারের মূল মোড়ে তাকালে মনে হয়, আস্ত একটা শহর বুঝি আজ তিন চাকার প্লাস্টিক আর লোহার বডির নিচে চাপা পড়ে গেছে। পথচারীদের হাঁটার মতো ফুটপাতগুলোও দখল করে রাখা হয়েছে যত্রতত্র অটোরিকশা দাঁড় করিয়ে রাখার কারণে।
কিশোরগঞ্জের সুশীল সমাজ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, পেশাজীবী, সাংবাদিক ও সাধারণ পথচারীদের একটাই আকুল দাবি—এই জঘন্য, দুর্বিষহ ও অবর্ণনীয় বন্দিদশা থেকে দ্রুত মুক্তি চায় কিশোরগঞ্জবাসী। জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সুদৃঢ় প্রশাসনিক নেতৃত্বের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা এখনো নিঃশেষ হয়ে যায়নি। শহরবাসীর প্রত্যাশা, কেবল সাময়িক বা আংশিক উদ্যোগ নয়, বরং এবার গ্রহণ করা হোক চূড়ান্ত ও দীর্ঘমেয়াদী কঠোর মহাপরিকল্পনা। বাইরের জেলা ও উপজেলা থেকে আসা অটোরিকশা শহরের প্রবেশমুখেই আটকে দেওয়ার জন্য স্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপন করা, শহরের ভেতরের ইজিবাইক ও মিশুকের জন্য জোড়-বিজোর কিংবা লাল-সবুজ কালার কোডিং সিস্টেম চালু করা, নির্দিষ্ট করিডোর নির্ধারণ করে দেওয়া এবং অবৈধ চার্জিং গ্যারেজগুলোর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সেগুলোর ওপর সাড়াশী অভিযান পরিচালনা করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সেই সাথে শহরের প্রধান সড়কগুলোর ওপর গড়ে ওঠা অবৈধ সিএনজি ও অটোরিকশার স্ট্যান্ডগুলোকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে শহরের বাইরে নির্ধারিত টার্মিনালে স্থানান্তর করা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে।
নরসুন্দার তীরে গড়ে ওঠা এই ঐতিহাসিক জনপদ কিশোরগঞ্জ কোনো থমকে থাকা জটের শহর হওয়ার কথা ছিল না। এটি শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিক্ষার শহর; রাজনীতি ও সুশীল চেতনার এক উর্বর ভূমি। অথচ আজ এক অগোছালো, অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ পরিবহন ব্যবস্থার কারণে স্তব্ধ হয়ে আছে নাগরিক জীবনের প্রতিটি গতিপথ। হারুয়া থেকে যশোদল কিংবা পুরান থানা থেকে একরামপুর—প্রতিটি ইঞ্চি সড়কে মানুষ চায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে, নিশ্চিত করতে চায় নিরবচ্ছিন্ন চলাচল। জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের ঐকান্তিক চেষ্টা যেন আর কোনো প্রশাসনিক জটিলতা বা সিন্ডিকেটের অশুভ ছায়ায় বিফলে না যায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন সব বাধা চূর্ণ করে সাধারণ নাগরিকের স্বস্তি ফিরিয়ে আনে—এটাই আজ সমগ্র কিশোরগঞ্জবাসীর একমাত্র বিনীত আর্তি ও একবুক আশা। নাজিরের এই জনপদ আর কতকাল জটের রুদ্ধশ্বাস কারাগারে বন্দি থাকবে? কিশোরগঞ্জবাসী আজ একসুরে আওয়াজ তুলছে—প্রশাসনের কঠোর হাত জাগ্রত হোক, শৃঙ্খলা ফিরে আসুক রাজপথে, এবং যানজটের এই নির্মম অভিশাপ থেকে চিরতরে মুক্ত হোক আমাদের প্রিয় কিশোরগঞ্জ।
tapashmainul70@gmail.com








