নওগাঁর আত্রাইয়ে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়ম, অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও সেবাগ্রহীতাদের হয়রানিসহ একাধিক অভিযোগে আলোচনায় আসা সহকারী তহশিলদার মোস্তাফিজুর রহমানকে মান্দা উপজেলার নুরুল্লাবাদ-কালিকাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি করা হয়েছে। তবে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের পরই তাঁর দায়িত্ব পালন ও কর্মস্থলে উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রোববার (২৫ অক্টোবর) সরেজমিনে ওই ভূমি অফিসে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। এ সময় বিভিন্ন ভূমিসেবা নিতে আসা কয়েকজন সেবাগ্রহীতাকে প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে ফিরে যেতে দেখা যায়।
স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৮ অক্টোবর নওগাঁ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রাজস্ব শাখা থেকে জারি করা এক আদেশে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জান্নাত আরা তিথির স্বাক্ষরে মোস্তাফিজুর রহমানকে আত্রাই উপজেলার আহসানগঞ্জ-শাহাগোলা ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে মান্দা উপজেলার নুরুল্লাবাদ-কালিকাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি করা হয়। আদেশ অনুযায়ী তাঁকে ১৯ অক্টোবরের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেন।
তবে রোববার (২৫ অক্টোবর) সরেজমিনে নুরুল্লাবাদ-কালিকাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গিয়ে মোস্তাফিজুর রহমানকে কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি। অফিসের একজন প্রসেস সার্ভার জানান, সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমান অফিসে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন। পরে তিনি আত্রাই উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় কিংবা তাঁর আগের কর্মস্থলের দিকে গেছেন বলে তিনি শুনেছেন। তবে ঠিক কোথায় এবং কী কাজে গেছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি ওই কর্মচারী।
অফিসে হাজিরা দেওয়ার পর মোস্তাফিজুর রহমানের কর্মস্থলে না থাকার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সিনিয়র তহশিলদারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ওই দিন মোস্তাফিজুর রহমান অফিসে থাকবেন না কিংবা দাপ্তরিক প্রয়োজনে বাইরে যাবেন—এমন কোনো তথ্য তাঁকে জানানো হয়নি।
এদিকে নুরুল্লাবাদ-কালিকাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের প্রসেস সার্ভার ও অফিস সহায়ক জানান, অফিসটির মূল দায়িত্বে থাকা নারী তহশিলদার বর্তমানে অসুস্থতাজনিত ছুটিতে রয়েছেন এবং রাজশাহীতে চিকিৎসাধীন। ফলে তিনি নিয়মিত অফিস করতে পারছেন না। এমন পরিস্থিতিতে ভূমি অফিসের কার্যক্রম সচল রাখা এবং সেবাগ্রহীতাদের প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সহকারী তহশিলদার মোস্তাফিজুর রহমানের উপস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু রোববার মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত তহশিলদার অসুস্থতাজনিত ছুটিতে থাকার পাশাপাশি সহকারী তহশিলদার মোস্তাফিজুর রহমানকেও কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই কর্মকর্তার কেউই অফিসে উপস্থিত না থাকলে দূরদূরান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় ভূমিসেবা পাবেন কীভাবে? এমন পরিস্থিতিতে নুরুল্লাবাদ-কালিকাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নিয়মিত কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে এবং সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি কীভাবে নিরসন করা হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় সাত কিলোমিটার দূরের কালিকাপুর এলাকা থেকে ভূমিসেবা নিতে আসা এক বৃদ্ধ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে না পেয়ে ফিরে যান। এ ছাড়া ভূমিসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা নিতে আসা আরও কয়েকজন সেবাগ্রহীতাকে প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে অপেক্ষা করতে এবং পরে ফিরে যেতে দেখা যায়। তাঁদের কয়েকজন অভিযোগ করেন, প্রয়োজনীয় কাজে অফিসে এসে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে না পাওয়ায় সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। এ বিষয়ে তিনজন সেবাগ্রহীতার বক্তব্যও সংগ্রহ করা হয়েছে।
সেবাগ্রহীতাদের ফিরে যাওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ভূমি অফিসটির সেবা কার্যক্রম নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকলে সাধারণ মানুষের সেবা যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য বিকল্প দায়িত্ব বণ্টন ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্য কর্মকর্তা কর্মস্থলের বাইরে থাকলে তিনি কোথায় এবং কী দাপ্তরিক কাজে রয়েছেন, সে বিষয়েও অফিসে সুস্পষ্ট তথ্য থাকা উচিত।
একই ধরনের পরিস্থিতি মোস্তাফিজুর রহমানের আগের কর্মস্থল আহসানগঞ্জ-শাহাগোলা ইউনিয়ন ভূমি অফিসেও ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। সেখানকার মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অসুস্থতার কারণে নিয়মিত অফিস করতে না পারায় মোস্তাফিজুর রহমানকে দাপ্তরিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হতো। তবে ওই সময়ই তাঁর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি এবং দালালদের দৌরাত্ম্যসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগ নিয়ে একাধিক সংবাদও প্রকাশিত হয়।
এ কারণে স্থানীয়দের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, আগের কর্মস্থলে নানা অভিযোগের মুখে থাকা একজন কর্মকর্তাকে এমন একটি ভূমি অফিসে বদলি করা কতটা যুক্তিসংগত, যেখানে মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বর্তমানে অসুস্থতাজনিত ছুটিতে রয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, যথাযথ তদারকি ও দায়িত্ব বণ্টন নিশ্চিত করা না হলে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে। তবে এ বিষয়ে বদলির সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে আগে ওঠা অভিযোগগুলো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো তদন্ত প্রতিবেদনও পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, আত্রাই উপজেলার আহসানগঞ্জ-শাহাগোলা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি এবং ভূমি অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্যসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের বিষয়ে একাধিক দফায় সংবাদ প্রকাশিত হয়।
এ ছাড়া ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে আর্থিক সুবিধা ও নিয়মিত মাসিক অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব পাওয়ার অভিযোগ করেন সাংবাদিক মো. সবুজ হোসেন। এ ঘটনায় তিনি নওগাঁ জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগও দেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগগুলোর প্রেক্ষাপটে মোস্তাফিজুর রহমানকে অন্য ভূমি অফিসে বদলি করা হলেও তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিভাগীয় তদন্তের চূড়ান্ত অগ্রগতি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এর মধ্যেই নতুন কর্মস্থলে তাঁর উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
রোববার কর্মস্থলে না থাকার বিষয়ে বক্তব্য জানতে সহকারী তহশিলদার মোস্তাফিজুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
একই বিষয়ে মান্দা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাঁর কার্যালয়ে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্যও নেওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সরকারি ভূমি অফিসে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উপস্থিতি, সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি এবং দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অবহেলা হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আগের কর্মস্থলে মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর তদন্তের বর্তমান অবস্থা এবং সেগুলোর বিষয়ে বিভাগীয়ভাবে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তাঁদের মতে, শুধু বদলির মাধ্যমে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগগুলোর যথাযথ তদন্তের পাশাপাশি নতুন কর্মস্থলে তাঁর দায়িত্ব পালন এবং সেবাগ্রহীতারা যথাযথ সেবা পাচ্ছেন কি না, সেটিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে রাখা প্রয়োজন।
তবে ২৫ অক্টোবরের ঘটনায় মোস্তাফিজুর রহমান অফিসে হাজিরা দেওয়ার পর আত্রাই উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় কিংবা তাঁর আগের কর্মস্থলের দিকে গিয়েছিলেন বলে অফিসের একজন প্রসেস সার্ভার জানিয়েছেন। তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন কি না, তাঁর কোনো দাপ্তরিক দায়িত্ব ছিল কি না কিংবা ওই সময় কর্মস্থলে তাঁর অনুপস্থিতি বিধিবহির্ভূত ছিল কি না—এসব বিষয় স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও মোস্তাফিজুর রহমানের বক্তব্য এবং প্রয়োজনীয় তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হওয়া সম্ভব।
অনিয়মের অভিযোগে আত্রাই থেকে মান্দায় বদলি, সেখানেও অনুপস্থিত তহশিলদার








