সরকারি মালপত্র ও স্পর্শকাতর দাপ্তরিক সরঞ্জাম নিরাপদ সংরক্ষণের জন্য নির্ধারিত স্টোরে যেন বসেছে এক আলিশান ব্যক্তিগত সংসারের আসর। নামকাওয়াস্তে একটি সরকারি গুদামঘরের খাতায় দাপ্তরিক সিলমোহর মারা থাকলেও, বাস্তবতার ছবিটা নিখাদ এক আধুনিক পারিবারিক বসবাসের। নেই কোনো ভাড়ার কোনো নিয়ম-কানুন, নেই মাসের শেষে পকেট থেকে বিদ্যুৎ বিল গোনার ন্যূনতম বাধ্যবাধকতা। কোনো রকম আনুষ্ঠানিক আবাসন মঞ্জুরি ছাড়াই সুদীর্ঘ ছয়টি বছর ধরে সরকারি স্থাপনার তিনটি সুসজ্জিত কক্ষে পাঁচ সদস্যের একটি পরিবার বহাল তবিয়তে বসবাস করে আসছে, আর তাদের ঘরকন্নার প্রাত্যহিক আলো-বাতাস থেকে শুরু করে সব বৈদ্যুতিক উপকরণের বিল নিরবে মেটানো হচ্ছে রাষ্ট্রের কোষাগার অর্থাৎ জনগণের কষ্টার্জিত করের টাকা থেকে। সরকারি সম্পদ ও কোষাগারের চরম অপব্যবহার এবং খোদ প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত শীর্ষকর্তাদের বক্তব্য ও পদক্ষেপে উঠে আসা নাটকীয় স্ববিরোধিতা এখন গভীর অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
তথ্য অনুসন্ধানে দেখা যায়, সরকারি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই স্টোরটিতে মালামাল পাহারার প্রশাসনিক ব্যবস্থার আড়ালে গড়ে উঠেছে এক অননুমোদিত মুক্তাঞ্চল। পরিবারটির জন্য কোনো নির্দিষ্ট আবাসন বরাদ্দ তো দূরের কথা, কোনো ধরনের ভাড়ার চুক্তি পর্যন্ত করার প্রয়োজন পড়েনি। অথচ বছরের পর বছর ধরে একটি পূর্ণাঙ্গ পারিবারিক জীবন সেখানে পরিচালিত হচ্ছে অনায়াসে। সংশ্লিষ্ট স্টোর কিপার শাহাদাৎ হোসেনের চরম ক্ষমতার প্রভাব বা আত্মীয়তার সূত্রে সেখানে এই সুবিধাজনক বন্দোবস্ত গড়ে উঠেছিল। স্টোর কিপারের নিজ মুখেই বেরিয়ে এসেছে স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক শিথিলতার স্বীকারোক্তি। তিনি অবলীলায় স্বীকার করেছেন যে, স্বজনদের সরকারি গুদামঘরে সম্পূর্ণ বিনা খরচে ও বিনা ভাড়ায় থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছিল। তবে এই স্বীকারোক্তির সবচেয়ে বিস্ফোরক অংশটি হলো, তিনি পরিষ্কার ভাষায় দাবি করেছেন—তাঁর এই অননুমোদিত আবাসন ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রদানের বিষয়টি সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত ছিলেন শীর্ষ প্রশাসনিক কর্তা অর্থাৎ নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান নিজে। স্টোর কিপারের স্পষ্ট কথা, ‘নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান স্যারও বিষয়টি জানেন’।
কিন্তু যে মুহূর্তে প্রশাসনিক সর্বোচ্চ কর্মকর্তার দিকে জবাবদিহিতার তীর ধেয়ে এসেছে, অমনি শুরু হয়েছে পাশ কাটানোর চরম নাটক ও পরস্পরবিরোধী কাদা ছোড়াছুড়ি। নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের বক্তব্য এ ক্ষেত্রে স্টোর কিপার এবং বসবাসকারী পরিবারের দাবির সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী এবং বিস্ময়কর বিভ্রান্তিতে ভরা। নির্বাহী প্রকৌশলী স্বীকার করছেন যে, সরকারি স্টোরের ভেতর বহিরাগত লোকজন বসবাস করছেন এবং সেটা তিনি নিজের চোখে দেখেও এসেছেন। কিন্তু এক নিমিষেই সেই দায় ধামাচাপা দিতে গিয়ে তিনি দাবি করছেন, সেখানে ঠিক কারা বা কাদের পরিবার থাকেন—সে বিষয়ে তিনি বিন্দুমাত্র কিছুই জানেন না! একজন উচ্চপদস্থ প্রথম শ্রেণির গেজেটেড সরকারি কর্মকর্তা নিজের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণাধীন ও নজরদারিতে থাকা স্টোর পরিদর্শনের সময় বহিরাগত লোকজনকে বসবাস করতে দেখার পরও তাঁদের পরিচয় বা তাঁদের বসবাসের আইনি ভিত্তি সম্পর্কে কিছুই জানবেন না—এই যুক্তিতে চরম অবহেলা নাকি জেনেশুনে অন্ধ সেজে থাকার এক ধূর্ত কৌশল, তা নিয়ে তীব্র প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। উপরন্তু, সরকারি বিদ্যুৎ ব্যক্তিগত ও আবাসিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই বলে জোর গলায় দাবি করে তিনি জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টি নিখুঁতভাবে তদন্ত করে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিবারের স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ স্বীকারোক্তি, স্টোর কিপারের সরাসরি ইঙ্গিত এবং নির্বাহী প্রকৌশলীর এই অদ্ভুত ও দ্বিমুখী বক্তব্যের মধ্যকার সুগভীর অমিল এখন পুরো দুর্নীতির ধোঁয়াশাকে আরও প্রকট করে তুলছে। সাধারণ জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি দপ্তরের একটি সংবেদনশীল অংশে টানা ছয় বছর অর্থাৎ দীর্ঘ ৭২টি মাস ধরে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিবার বাস করে গেল, অথচ সেই সুদীর্ঘ সময়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ রহস্যজনকভাবে কতটা নিরব সমর্থন জুগিয়ে এসেছে? সরকারি অনুমোদন ব্যতিরেকে কীভাবে এটি দিনের পর দিন সম্ভব হলো এবং মাসের পর মাস জমা পড়া বিদ্যুৎ বিলগুলো কোনো প্রশ্ন ছাড়াই নির্বিঘ্নে সরকারি কোষাগার থেকে চোখ বন্ধ করে ছাড় দেওয়া হলো? অনুসন্ধানে উঠে আসা চাঞ্চল্যকর নথি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, উক্ত পরিবারটি দাপ্তরিক কাজের উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত তিনটি কক্ষ ব্যক্তিগত শোবার ঘর ও রান্নাঘর হিসেবে ভোগদখল করছিল। শুধু আলো বা পাখা নয়, আধুনিক সব বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম যেমন—ইলেকট্রিক আয়রন, সার্বক্ষণিক ফ্রিজ, হাই-ওয়াটের হিটার ও বৈদ্যুতিক চুলার প্রকাণ্ড লোড ব্যবহার করা হতো ব্যক্তিগত সুবিধায়। আর এসব উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ইলেকট্রনিক সামগ্রী ব্যবহারের বিপুল বিদ্যুৎ বিল বাণিজ্যিক ও দাপ্তরিক ব্যবহারের আড়ালে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে নিয়মিত ভাউচার করিয়ে পরিশোধ করা হয়েছে।
ঘটনার গভীরতা এখানে থমকে নেই; পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে থাকা ধারাবাহিক অনিয়মের কালো ছায়াকে আরও ঘনীভূত করে তুলেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্বের রহস্যাবৃত ভূমিকা। অনুসন্ধানে জানা যায়, পূর্বেও নানা গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগের ভিত্তিতে এই নির্দিষ্ট স্টোর কিপারের বিরুদ্ধে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও বিভাগীয় তদন্তের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তবে সেই তদন্তের মাধ্যমে অপরাধের কী সত্যতা মিলল, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কী ধরনের প্রশাসনিক কিংবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল—সেসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করতেই নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান হঠাৎ করেই নিজেকে গুটিয়ে নেন এবং বিষয়টি সম্পূর্ণ এড়িয়ে যান। অতীত তদন্তের সেই অন্ধকার ঢাকা ফাইল ও বর্তমানের চোখ এড়িয়ে চলার অপচেষ্টা প্রমাণ করে যে, এই প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম কোনো আকস্মিক ভুল নয়, বরং তা বছরের পর বছর ধরে একটি সুরক্ষিত সিন্ডিকেটের হাত ধরে শিকড় গেড়ে বসেছে।
সচেতন নাগরিক সমাজ, বিশেষজ্ঞ ও দুর্নীতি প্রতিরোধে যুক্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে আবাসন বা সম্পদের ব্যবহার কেবল নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, এটি সরাসরি দেশের অর্থ ও আইন ভঙ্গের সামিল। সরকারি কোনো স্থাপনাকে বাণিজ্যিক বা আবাসিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের আগে নির্দিষ্ট গেজেট, উপযুক্ত কতৃপক্ষের অনুমোদন ও রাজস্ব জমা দেওয়ার বাধ্যতামূলক বিধান রয়েছে। সেই সাথে সরকারি তহবিল থেকে নিয়মিত বিদ্যুৎ বা অন্যান্য ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করার যে চর্চা চালু রাখা হয়েছে, তার জন্য অনতিবিলম্বে অডিট বা হিসাব নিরীক্ষা দরকার। দাপ্তরিক সুবিধার জন্য মোট বিদ্যুতের কতটা প্রকৃতপক্ষে অফিসের কাজে খরচ হয়েছে এবং কতটা সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে আবাসিক উদ্দেশ্যে পারিবারিক কাজে অপচয় করা হয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বিভাজন বা ডিফারেন্সিয়েট করে অপচয় হওয়া অর্থের সঠিক হিসাব বের করা অপরিহার্য। একই সঙ্গে দীর্ঘ ছয় বছরে সরকারি কোষাগার থেকে ঝরে যাওয়া সেই সমুদয় অর্থের পুঙ্খানুপুঙ্খ অডিট করে অপব্যয়িত অর্থ অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট দায়ী ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত বেতন-ভাতা বা সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে আদায় করা এখন সময়ের দাবি। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের এমন বলগাহীন অপচয় বন্ধে প্রশাসনিক নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নেপথ্যে থাকা গডফাদারদের মুখোশ উন্মোচন না হলে, বিচারহীনতার এই কুৎসিত সংস্কৃতি অন্য সব সরকারি দপ্তরেও বিষবৃক্ষের মতো ডালপালা মেলবে।








