68 জনবল সংকটে শ্লথ তাড়াইলের নারী উন্নয়ন, এক কর্মচারীর কাঁধে কার্যালয়
চারজন অনুমোদিত জনবলের বিপরীতে মাত্র একজন কর্মরত কর্মচারীর কাঁধে ভর করে কোনো রকমে টিকে থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে চরম ভোগান্তি ও দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর গুনতে হচ্ছে সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের।
দাপ্তরিক ফাইল গোছানো থেকে শুরু করে সুবিধাভোগীদের আবেদন গ্রহণ, ডিজিটাল তথ্য ইনপুট এবং ভিজিডির চাল বিতরণের তালিকা যাচাই—পাহাড়সম নথিপত্রের ভিড়ে একাকী এক কর্মচারীকে অবিরাম কাজ করে যেতে হচ্ছে কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে, যেখানে বাইরে অপেক্ষমাণ সেবা নিতে আসা অসহায় নারী ও গর্ভবতী মায়েদের দীর্ঘ সারি প্রতিদিনের স্বাভাবিক চিত্রে পরিণত হয়েছে। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী জোরদার করা ও নারী ক্ষমতায়নের মূল কেন্দ্রবিন্দু এই কার্যালয়টি এখন চরম জনবল সংকটে ধুঁকছে এবং চারজন অনুমোদিত জনবলের বিপরীতে মাত্র একজন কর্মরত কর্মচারীর কাঁধে ভর করে কোনো রকমে টিকে থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে চরম ভোগান্তি ও দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর গুনতে হচ্ছে সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের।দাপ্তরিক নথি অনুযায়ী, কার্যালয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা’র পদটি ২০২৩ সাল থেকেই শূন্য পড়ে আছে এবং একই সাথে দুজন অফিস সহায়ক (পিয়ন)-এর পদও দীর্ঘদিন ধরে খালি থাকায় বর্তমানে এই সরকারি দপ্তরে একমাত্র নিয়মিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর প্রণয় কান্তি রাউত। নিয়মিত কর্মকর্তা না থাকায় অতিরিক্ত দায়িত্বের ওপর ভর করে চলা এই প্রশাসনিক কেন্দ্রের দেখভাল করছেন কিশোরগঞ্জ জেলা মহিলা বিষয়ক কার্যালয়ের উপপরিচালক আল আমীন ভূঁইয়া, যিনি জেলা পর্যায়ের বিশাল দায়িত্বের পাশাপাশি তাড়াইল, নিকলী, ভৈরব ও অষ্টগ্রাম—এই মোট পাঁচটি উপজেলার মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্ব একাই পালন করায় মাঠ পর্যায়ে গিয়ে নিবিড় তদারকি বা সরাসরি সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ তাঁর জন্য অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়েছে।পর্যাপ্ত জনবলের অভাব ও প্রশাসনিক গতিহীনতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বিভিন্ন তৃণমূল কর্মসূচির ওপর, যার আওতায় ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তাড়াইল উপজেলার ১ হাজার ৪৯৭ জন উপকারভোগীকে প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে চাল বিতরণের সুবিধাসহ মাতৃত্বকালীন ভাতা, নতুন আবেদন গ্রহণ ও তথ্য যাচাইয়ের কাজে মারাত্মক ধীরগতি তৈরি হয়েছে। একই সাথে তদারকির অভাবে উঠতি বয়সের কিশোর-কিশোরীদের সামাজিক মূল্যবোধ ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে গঠিত ‘কিশোর-কিশোরী ক্লাব’-এর কার্যক্রম গতি হারিয়েছে এবং গ্রামীণ সমাজে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ বা সচেতনতামূলক উঠান বৈঠকের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো একপ্রকার স্থবির হয়ে পড়েছে।কার্যালয়ে সেবা নিতে আসা তাড়াইল সদরের করিমন আক্তার জানান, কোলে ছোট বাচ্চা নিয়ে সকালে এসে সাধারণ একটা কাজের জন্য লোক একজন হওয়ায় দুপুরের পর লাইন পেতে হচ্ছে, যা কর্মকর্তা ও কর্মী থাকলে কিছুটা সহজ হতো। অন্যদিকে একমাত্র কর্মরত অফিস সহকারী প্রণয় কান্তি রাউত আক্ষেপ করে জানান, একা হাতে কম্পিউটার চালানো, ফাইল মেইনটেইন করা, ভাতা ও চাল বিতরণের তালিকা যাচাই এবং সেবাগ্রহীতাদের জবাব দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হলেও তিনি সাধ্যমতো চেষ্টা চালাচ্ছেন।জনবল সংকটের কারণে কাজের চরম ব্যাঘাত ঘটার কথা অকপটে স্বীকার করে কিশোরগঞ্জ জেলা মহিলা বিষয়ক কার্যালয়ের উপপরিচালক ও তাড়াইলের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা আল আমীন ভূঁইয়া জানান, জনবল না থাকায় এবং মাত্র একটি কম্পিউটার দিয়ে কাজ চালাতে হওয়ায় তাঁরা ঠিকমতো মাঠ পর্যায়ে গিয়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, প্রশিক্ষণ ও উঠান বৈঠকের মতো কাজগুলো করতে পারছেন না, আর এই সংকট সমাধানের লক্ষ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।স্থানীয় সচেতন সুশীল সমাজের মতে, তাড়াইল উপজেলার নারীদের স্বাবলম্বী করা, প্রশিক্ষণ প্রদান এবং তাঁদের সামাজিক ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে নতুন কর্মকর্তা ও কর্মচারী পদায়ন করা না হলে সরকারের নারীবান্ধব উন্নয়ন কর্মসূচির সুফল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাবে না এবং অসহায় নারীদের ভোগান্তি দিন দিন আরও প্রকট রূপ নেবে।








