হাওড়-বাঁওড়ের জল-জোছনায় ঘেরা সাহিত্য ও ঐতিহ্যের অনবদ্য জনপদ কিশোরগঞ্জ। জেলাজুড়ে চলমান উন্নয়ন, সেবা আর লোকপ্রশাসনের নতুন এক দিগন্ত উন্মোচনের প্রত্যয়ে আজ রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর ) অনুষ্ঠিত হয়েছে জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির বহুল প্রতীক্ষিত মাসিক সভা। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সুসজ্জিত ও সুগম্ভীর সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এই সভায় সরকারি সেবার মানোন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি ত্বরান্বিত করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন উপস্থিত দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিবৃন্দ। আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ও আধুনিক প্রশাসনিক দক্ষতার এক অপূর্ব মেলবন্ধনে পুরো সভার পরিবেশ ছিল যেমন গাম্ভীর্যপূর্ণ, তেমনই প্রত্যয়দীপ্ত ও আশাব্যঞ্জক।
আজকের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নীতি-নির্ধারণী সভায় সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করেন কিশোরগঞ্জের সুযোগ্য জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সোহানা নাসরিন। তাঁর বিচক্ষণ পরিচালনা ও সুস্পষ্ট দূরদর্শিতায় সভার প্রতিটি পর্বে স্থান পায় জনকল্যাণমূলক সিদ্ধান্ত ও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা। সভার প্রারম্ভেই সভাপতি বিগত দিনের উন্নয়ন কাজের অগ্রগতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেন। হাওড়বেষ্টিত এ অঞ্চলের সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জগুলোকে মাথায় রেখে কীভাবে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সরকারি সেবার আলো পৌঁছে দেওয়া যায়—তা নিয়ে দীর্ঘ ও ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ভাষায় পুনর্ব্যক্ত করেন যে, সরকারি সেবাপ্রাপ্তি এ দেশের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার, এটি কোনো অনুকম্পা বা দয়া নয়। প্রশাসনিক জটিলতা বা অলসতার কারণে কোনো নাগরিক যেন সেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়ে তিনি সংশ্লিষ্টদের কঠোর সতর্কবার্তা প্রদান করেন।এই সমন্বিত সভায় জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর নিজ নিজ গৃহীত কার্যক্রম, বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সারসংক্ষেপ চিত্র বিশদভাবে তুলে ধরে। নির্বাচন কার্যালয়ের পক্ষ থেকে নতুন ভোটার তালিকা হালনাগাদকরণ, জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন কার্যক্রম সহজীকরণ এবং দূরবর্তী হাওড় এলাকার মানুষের নাগালের মধ্যে ভোটার সেবা নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। জেলা তথ্য অফিস সরকারের যুগান্তকারী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সচিত্র প্রচার, সঠিক তথ্য সরবরাহ এবং নানা সামাজিক অসংগতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরির সুনির্দিষ্ট কৌশল বর্ণনা করে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ভেজালমুক্ত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা, বাজারে নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা এবং হোটেল-রেস্তোরাঁয় স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে 'জিরো টলারেন্স' নীতি বাস্তবায়নের কথা জানান। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য নিয়ে খামারিদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো, আধুনিক চিকিৎসাসেবা সুনিশ্চিত করা এবং গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন নিয়ে তাদের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সবিস্তারে উপস্থাপন করে। অন্যদিকে, সমাজসেবা অধিদপ্তর বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর নানাবিধ মানবিক সুবিধা শতভাগ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষ উপায়ে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে।
জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সোহানা নাসরিন তাঁর প্রাণবন্ত দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে কিশোরগঞ্জকে একটি তিলত্তমা ও আদর্শ মডেল জেলা হিসেবে গড়ে তোলার দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জিত হতে পারে না। উন্নয়ন কেবল ইট-পাথরের অবকাঠামো তৈরি করা নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন করা এবং তাদের মুখে হাসি ফোটানোই হলো প্রকৃত অগ্রগতি। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা, তথ্য আদান-প্রদান বৃদ্ধি করা এবং লাল ফিতার দৌরাত্ম্য দূর করে জনসেবা সহজ করার জন্য তিনি কঠোর তাগিদ দেন। একই সাথে রাষ্ট্রীয় প্রতিটি টাকার যেন শতভাগ সঠিক ও কার্যকর ব্যবহার ঘটে, তা তদারকি করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রধানদের দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান।উন্নয়ন ও সমন্বয়ের এই মিলনমেলায় প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিগণের উপস্থিতি সভাকে এক পূর্ণাঙ্গ ও বহুমাত্রিক মাত্রা দান করে। সভার সার্বিক কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক (উপসচিব) জেবুন নাহার শাম্মী, যিনি গ্রামীণ অবকাঠামোর গুণগত মান সংরক্ষণ ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন। জেলা প্রশাসনের সকল সমন্বয়মূলক কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চারের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোঃ ইশতিয়াক ইমন। এ ছাড়াও সমগ্র জেলায় শান্তি-শৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা জোরদার করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে সভায় বক্তব্য প্রদান করেন জেলা পুলিশ সুপারের যোগ্য প্রতিনিধি। মাঠপর্যায়ে সরকারের রূপকল্প বাস্তবায়নের মূল রূপকার—কিশোরগঞ্জ জেলার সকল উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণ (ইউএনও) এবং বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের দপ্তরপ্রধানগণ স্ব-স্ব এলাকার বিদ্যমান সমস্যা ও তা সমাধানের সম্ভাবনাময় পথনির্দেশ তুলে ধরেন।একবিংশ শতাব্দীর নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এবং জন আকাঙ্ক্ষা পূরণে কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসন যে অভূতপূর্ব গতিশীলতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে চলেছে, আজকের এই উন্নয়ন সমন্বয় সভা তারই এক উজ্জ্বল ও অকাট্য দলিল। সকল সরকারি দপ্তরের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও ফলপ্রসূ সমন্বয়ের মাধ্যমে আগামী দিনগুলোতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, নিরাপদ খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রতিটি খাতে কিশোরগঞ্জ জেলা সমগ্র দেশে এক অনন্য নজির স্থাপন করবে—এমনটাই অকৃত্রিম প্রত্যাশা প্রকাশ করেন সভায় উপস্থিত কর্মকর্তা ও বুদ্ধিজীবী মহল। আলোর সুবর্ণরেখা, সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও আত্মপ্রত্যয়ের নতুন বারতা নিয়ে অবশেষে সমাপ্তি ঘটে জেলার সার্বিক সমৃদ্ধি অর্জনের এই মাসিক সমন্বয় সভার।
স্বচ্ছতা ও সমন্বয়ের বার্তায় শেষ হলো কিশোরগঞ্জ জেলা উন্নয়ন সভা
সরকারি সেবার মানোন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি ত্বরান্বিত করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন উপস্থিত দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিবৃন্দ।








