প্রশাসন

আস্থার মহাদানে ইতিহাস, পাগলা মসজিদের দানবাক্সে ৬ বছরে মিলল ১২ কেজি সোনা, সাড়ে ১২ কেজি রুপা ও ৪০ লাখ টাকার বৈদেশিক মুদ্রা; ব্যাংকে গচ্ছিত ১৩২ কোটি টাকা ।

গত ছয় বছর ধরে দানবাক্স খোলার পর উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার, রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রা অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তায় জেলা প্রশাসনের ট্রেজারিতে নিরাপদে সংরক্ষণ করা হচ্ছিল।

⎙ প্রিন্ট
আস্থার মহাদানে ইতিহাস, পাগলা মসজিদের দানবাক্সে ৬ বছরে মিলল ১২ কেজি সোনা, সাড়ে ১২ কেজি রুপা ও ৪০ লাখ টাকার বৈদেশিক মুদ্রা; ব্যাংকে গচ্ছিত ১৩২ কোটি টাকা ।
পাগলা মসজিদের দানবাক্সে মিললো ১২ কেজি স্বর্ণ, সাড়ে ১২ কেজি রুপার অলংকার এবং প্রায় ৪০ লক্ষ টাকার সমপরিমান বৈদেশিক মুদ্রা।
⌖ কিশোরগঞ্জ সদর
আস্থা, ভক্তি আর অকৃত্রিম বিশ্বাসের অনন্য স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ কেন্দ্র করে ফের সৃষ্টি হলো এক অভূতপূর্ব ইতিহাস। দীর্ঘ ছয় বছরের জমানো মানতের হিসাব মেলাতে গিয়ে বেরিয়ে এলো এক বিস্ময়কর চিত্র। এই দীর্ঘ সময়ে মসজিদের দানবাক্সে জমা পড়েছে রেকর্ড ১২ কেজি স্বর্ণালংকার ও সাড়ে ১২ কেজি রুপা। কেবল সোনা-রুপাই নয়, বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত ভক্তদের ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে দানবাক্সে মিলল বিভিন্ন দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪০ লাখ টাকা। আজ সোমবার (১৩ অক্টোবর) সকাল ১১টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই অবিশ্বাস্য তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।  
​জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন সংবাদ সম্মেলনে জানান, গত ছয় বছর ধরে দানবাক্স খোলার পর উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার, রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রা অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তায় জেলা প্রশাসনের ট্রেজারিতে নিরাপদে সংরক্ষণ করা হচ্ছিল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে বিশেষ পরিমাপক দল, জেলা জুয়েলারি সমিতির বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সেসব স্বর্ণ ও রুপা নিখুঁতভাবে ওজন করা হয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা গণনা করা হয়। পুরো গণনা প্রক্রিয়া অত্যন্ত স্বচ্ছতা ও সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। ​সংবাদ সম্মেলনে ঐতিহাসিক এই মসজিদের বিশাল আর্থিক তহবিলের সর্বশেষ চিত্র তুলে ধরে জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন আরও জানান, বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংকে পাগলা মসজিদের নামে জমা থাকা স্থায়ী ও চলতি আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩২ কোটি টাকা। দেশে কোনো একটি ধর্মীয় উপাসনালয়ে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অনুদানে এমন সুবিশাল ব্যাংক ব্যালেন্স গড়ে ওঠার ঘটনা বিরল ও অভাবনীয়। এই অর্থ সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে রূপালী ব্যাংকসহ বিভিন্ন সরকারি ও বিশ্বস্ত ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা হয়েছে এবং এর লভ্যাংশও মূল তহবিলে যোগ হচ্ছে।
​কিশোরগঞ্জ শহরের নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত এই পাগলা মসজিদ ঘিরে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে উঠেছে এক অলৌকিক বিশ্বাস ও আবেগের ভিত্তিপ্রস্তর। ধর্ম-বর্ণ, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রতিদিন দেশের দূর-দূরান্ত থেকে হাজারো মানুষ ছুটে আসেন এই প্রাঙ্গণে। তাদের অন্তরে থাকে পুঞ্জীভূত আশা, মনস্কামনা পূরণ কিংবা কোনো পরম সংকট থেকে মুক্তির আকুল প্রার্থনা। মানুষ বিশ্বাস করেন, এই পবিত্র স্থানে দান-সদকা করলে মনের সুপ্ত বাসনা পূর্ণ হয় এবং বালা-মুসিবত দূর হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই মানুষ অকাতরে উজার করে দেন নিজেদের সামর্থ্য। পাগলা মসজিদের এই দানের বৈচিত্র্য যেকোনো মানুষকে তাজ্জব বানিয়ে দেয়। কেবল নগদ টাকা কিংবা মূল্যবান সোনা-রুপাই নয়, প্রতিদিন সেখানে জমা পড়ে বিপুল পরিমাণ গবাদিপশু ও দেশীয় গৃহপালিত প্রাণী। ভক্তরা নিজেদের মানত রক্ষার্থে নিয়ে আসেন আস্ত গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি ও কবুতর। অনেকে আবার নিয়ে আসেন তাজা ডিম ও বাহারি ফলফলাদি। প্রতিদিন বিকেলে এসব মানতের পশু-পাখি ও ফলমূল উন্মুক্ত নিলামে বিক্রি করে প্রাপ্ত সম্পূর্ণ অর্থ মসজিদের অফিশিয়াল ফান্ডে জমা করা হয়।
​জেলা প্রশাসন ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির সূত্রে জানা গেছে, দানবাক্সে প্রাপ্ত নগদ অর্থ প্রতি কয়েক মাস পরপর ম্যাজিস্ট্রেট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে খোলা হয় এবং শত শত মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের সহায়তায় গণনা করে ব্যাংকে পাঠানো হয়। তবে দানবাক্সে আসা মূল্যবান স্বর্ণালংকার ও রুপা তাৎক্ষণিকভাবে বিক্রি না করে ট্রেজারিতে জমা রাখা হয়েছিল। ছয় বছরের জমানো এই বিশাল পরিমাণ সোনা ও রুপা এখন নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ও ক্যারেট নির্ধারণ করে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী উন্মুক্ত নিলামে বিক্রি করা হবে এবং সেই অর্থও যোগ হবে মসজিদের মূল ফান্ডের সঙ্গে।  
​মসজিদ ট্রাস্টের বিপুল এই অর্থ কেবল মসজিদের দৈনন্দিন পরিচালনায় ব্যবহৃত হয় না, বরং এর বড় একটি অংশ ব্যয় করা হয় জনকল্যাণমূলক ও মানবিক কাজে। জটিল রোগে আক্রান্ত অসহায় ও দুস্থ রোগীদের চিকিৎসা সহায়তা, এতিম ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খরচ এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতে এই তহবিল থেকে নিয়মিত অনুদান দেওয়া হয়। এছাড়া পাগলা মসজিদ ও এর সাথে যুক্ত বিশাল আন্তর্জাতিক মানের মেগা ইসলামিক কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যেখানে দৃষ্টিনন্দন মূল মসজিদ ভবনের পাশাপাশি থাকবে বিশাল মাদরাসা, সুবিশাল লাইব্রেরি, এতিমখানা এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা মুসাফিরদের জন্য আধুনিক থাকার ব্যবস্থা।
​সাধারণ মানুষের প্রগাঢ় শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও আস্থার প্রতীক হিসেবে কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদ আজ কেবল একটি দৃষ্টিনন্দন উপাসনালয় নয়, বরং মানবকল্যাণ ও বিশাল ত্যাগের এক দেদীপ্যমান স্মারক। ছয় বছরে পাওয়া ১২ কেজি সোনা, সাড়ে ১২ কেজি রুপা, ৪০ লাখ টাকার বৈদেশিক মুদ্রা ও ১৩২ কোটি টাকার এই বিশাল আর্থিক স্থিতি প্রমাণ করে, ভক্তি ও বিশ্বাসের শক্তির সামনে বস্তুগত কোনো কিছুই বাধা হতে পারে না।
tapashmainul70@gmail.com

সম্পর্কিত সংবাদ