ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে: গবেষণায় বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত


নিজস্ব প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০১ জুন ২০২৬

আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে: গবেষণায় বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত

চাচাতো বা খালাতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়ে বিশ্বের অনেক সমাজে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখা, সম্পদ সংরক্ষণ কিংবা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কারণে এখনও বিভিন্ন দেশে এ ধরনের বিয়ে দেখা যায়। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, এ সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ডে পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদি এক গবেষণায় দেখা গেছে, ফার্স্ট কাজিন বা নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ের ক্ষেত্রে সন্তানদের কিছু জেনেটিক ও বিকাশজনিত সমস্যার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো বংশগত রোগ প্রকাশ পেতে সাধারণত মা ও বাবা উভয়ের কাছ থেকে একই ত্রুটিপূর্ণ জিন সন্তানের শরীরে আসতে হয়। রক্তের সম্পর্ক থাকায় ফার্স্ট কাজিনদের মধ্যে একই ধরনের জিন বহনের সম্ভাবনা বেশি থাকে। ফলে সন্তানদের মধ্যে কিছু জিনগত রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। সাধারণ জনগোষ্ঠীতে যেখানে এ ধরনের ঝুঁকি প্রায় ৩ শতাংশ, সেখানে ফার্স্ট কাজিন দম্পতির সন্তানদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৬ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন।

ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বর্ন ইন ব্র্যাডফোর্ড’ গবেষণায় ১৩ হাজারের বেশি শিশুকে দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে জন্মগত রোগের পাশাপাশি ভাষা বিকাশ, শিক্ষাগত অগ্রগতি, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ এবং সামগ্রিক বিকাশের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ফার্স্ট কাজিন দম্পতির সন্তানদের মধ্যে ভাষাগত সমস্যা তুলনামূলক বেশি ছিল। নির্ধারিত বিকাশগত মাইলফলকে পৌঁছানোর হারও কিছুটা কম দেখা গেছে। পাশাপাশি অন্যান্য শিশুদের তুলনায় চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রবণতাও বেশি ছিল। তবে গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন, আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে মানেই সন্তানের স্বাস্থ্য সমস্যা হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। অনেক পরিবারেই সম্পূর্ণ সুস্থ সন্তান জন্ম নিচ্ছে।

গবেষকদের মতে, সমস্যার জন্য শুধু কাজিনদের মধ্যে বিয়েকে দায়ী করলে বিষয়টি অতিসরলীকরণ হবে। একই সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর মধ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিয়ে হতে থাকলে নির্দিষ্ট কিছু জিনের বিস্তার বেড়ে যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা এ প্রক্রিয়াকে ‘এন্ডোগামি’ বলে অভিহিত করেন। ফলে রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও একই সম্প্রদায়ের দুই ব্যক্তির মধ্যে জিনগত ঝুঁকি থাকতে পারে।

ইতোমধ্যে ইউরোপের কয়েকটি দেশ কাজিনদের মধ্যে বিয়ে সীমিত বা নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে। নরওয়ে এ ধরনের বিয়ে অবৈধ ঘোষণা করেছে এবং সুইডেনও একই ধরনের আইন প্রণয়নের পথে রয়েছে। তবে যুক্তরাজ্যে নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে জেনেটিক কাউন্সেলিংয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে দম্পতিরা বিয়ের আগে বা সন্তান নেওয়ার আগে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, নতুন প্রজন্মের মধ্যে এ বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটছে। শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বৃহত্তর সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ বাড়ায় অনেক তরুণ-তরুণী এখন জীবনসঙ্গী নির্বাচনে আত্মীয়তার চেয়ে ব্যক্তিগত পছন্দ, মূল্যবোধ ও পারস্পরিক বোঝাপড়াকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয় হলেও সম্ভাব্য জেনেটিক ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। প্রয়োজন হলে জেনেটিক কাউন্সেলিং নেওয়া ভবিষ্যৎ সন্তানের স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে: গবেষণায় বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত

প্রকাশের তারিখ : ০১ জুন ২০২৬

featured Image

চাচাতো বা খালাতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়ে বিশ্বের অনেক সমাজে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখা, সম্পদ সংরক্ষণ কিংবা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কারণে এখনও বিভিন্ন দেশে এ ধরনের বিয়ে দেখা যায়। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, এ সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ডে পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদি এক গবেষণায় দেখা গেছে, ফার্স্ট কাজিন বা নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ের ক্ষেত্রে সন্তানদের কিছু জেনেটিক ও বিকাশজনিত সমস্যার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো বংশগত রোগ প্রকাশ পেতে সাধারণত মা ও বাবা উভয়ের কাছ থেকে একই ত্রুটিপূর্ণ জিন সন্তানের শরীরে আসতে হয়। রক্তের সম্পর্ক থাকায় ফার্স্ট কাজিনদের মধ্যে একই ধরনের জিন বহনের সম্ভাবনা বেশি থাকে। ফলে সন্তানদের মধ্যে কিছু জিনগত রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। সাধারণ জনগোষ্ঠীতে যেখানে এ ধরনের ঝুঁকি প্রায় ৩ শতাংশ, সেখানে ফার্স্ট কাজিন দম্পতির সন্তানদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৬ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন।

ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বর্ন ইন ব্র্যাডফোর্ড’ গবেষণায় ১৩ হাজারের বেশি শিশুকে দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে জন্মগত রোগের পাশাপাশি ভাষা বিকাশ, শিক্ষাগত অগ্রগতি, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ এবং সামগ্রিক বিকাশের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ফার্স্ট কাজিন দম্পতির সন্তানদের মধ্যে ভাষাগত সমস্যা তুলনামূলক বেশি ছিল। নির্ধারিত বিকাশগত মাইলফলকে পৌঁছানোর হারও কিছুটা কম দেখা গেছে। পাশাপাশি অন্যান্য শিশুদের তুলনায় চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রবণতাও বেশি ছিল। তবে গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন, আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে মানেই সন্তানের স্বাস্থ্য সমস্যা হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। অনেক পরিবারেই সম্পূর্ণ সুস্থ সন্তান জন্ম নিচ্ছে।

গবেষকদের মতে, সমস্যার জন্য শুধু কাজিনদের মধ্যে বিয়েকে দায়ী করলে বিষয়টি অতিসরলীকরণ হবে। একই সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর মধ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিয়ে হতে থাকলে নির্দিষ্ট কিছু জিনের বিস্তার বেড়ে যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা এ প্রক্রিয়াকে ‘এন্ডোগামি’ বলে অভিহিত করেন। ফলে রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও একই সম্প্রদায়ের দুই ব্যক্তির মধ্যে জিনগত ঝুঁকি থাকতে পারে।

ইতোমধ্যে ইউরোপের কয়েকটি দেশ কাজিনদের মধ্যে বিয়ে সীমিত বা নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে। নরওয়ে এ ধরনের বিয়ে অবৈধ ঘোষণা করেছে এবং সুইডেনও একই ধরনের আইন প্রণয়নের পথে রয়েছে। তবে যুক্তরাজ্যে নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে জেনেটিক কাউন্সেলিংয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে দম্পতিরা বিয়ের আগে বা সন্তান নেওয়ার আগে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, নতুন প্রজন্মের মধ্যে এ বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটছে। শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বৃহত্তর সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ বাড়ায় অনেক তরুণ-তরুণী এখন জীবনসঙ্গী নির্বাচনে আত্মীয়তার চেয়ে ব্যক্তিগত পছন্দ, মূল্যবোধ ও পারস্পরিক বোঝাপড়াকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয় হলেও সম্ভাব্য জেনেটিক ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। প্রয়োজন হলে জেনেটিক কাউন্সেলিং নেওয়া ভবিষ্যৎ সন্তানের স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ