আধুনিক কর্মসংস্কৃতিতে নির্ধারিত আট ঘণ্টার কাজের সময় অনেক ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না। অফিস, কল-সেন্টার, ফ্রিল্যান্সিং থেকে শুরু করে করপোরেট খাতে দীর্ঘ সময় কাজ করা এখন স্বাভাবিক প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দীর্ঘ কর্মঘণ্টা শুধু ক্লান্তিই নয়, বরং মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে, যা কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি পর্যন্ত বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টা বা তার বেশি কাজ করা ব্যক্তিদের মধ্যে স্ট্রোকের ঝুঁকি ৩৫ শতাংশ এবং হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি ১৭ শতাংশ বেশি থাকে, তুলনামূলকভাবে যারা সপ্তাহে ৩৫ থেকে ৪০ ঘণ্টা কাজ করেন তাদের চেয়ে। গবেষণাটি ২০১৬ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানায়, দীর্ঘ কর্মঘণ্টার কারণে ওই বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭ লাখ ৪৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার বড় অংশ ঘটেছে হৃদরোগ ও স্ট্রোকজনিত কারণে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় কাজের প্রভাব দুইভাবে শরীরে পড়ে। প্রথমত, অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও শারীরিক ক্লান্তি সরাসরি হৃদযন্ত্র, রক্তচাপ ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলে। এতে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং পেশির সমস্যা দেখা দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, কাজের চাপের কারণে জীবনযাপনের ধরনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, অনিয়মিত খাবার, ধূমপান বা অ্যালকোহল গ্রহণ এবং শারীরিক ব্যায়াম কমে যাওয়া এসব ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
জাপানে দীর্ঘ কর্মঘণ্টার কারণে মৃত্যুকে আলাদা একটি নামেও চিহ্নিত করা হয়—‘কারোশি’। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত কাজজনিত কারণে ২০১৭ সালে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ধারণা করা হয়, এ ধরনের মৃত্যু অনেক সময় তাৎক্ষণিক না হয়ে দীর্ঘ সময়ের কর্মচাপের ফলেও ঘটতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, করোনাভাইরাস মহামারির পর বিশ্বজুড়ে কাজের সময় আরও বেড়েছে। লকডাউন ও রিমোট ওয়ার্কিং ব্যবস্থায় অনেক কর্মী স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি সময় কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন। WHO-এর এক কর্মকর্তা জানান, কিছু দেশে লকডাউনের সময় কর্মঘণ্টা গড়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা এবং কিছু উন্নয়নশীল অঞ্চলে দীর্ঘ কর্মঘণ্টার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৪০ কোটির বেশি মানুষ সপ্তাহে ৪৯ ঘণ্টা বা তার বেশি কাজ করেন। এসব কর্মীদের একটি বড় অংশ গিগ ইকোনমি বা ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত, যেখানে নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার বাধ্যবাধকতা না থাকায় কাজের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
গবেষকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় কাজ শুধু শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। এতে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা এবং কর্মস্থলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। পাশাপাশি পরিবার ও সামাজিক জীবনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে জীবনমান কমিয়ে দেয়।
অন্যদিকে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, কাজের সময় কমিয়ে সপ্তাহে চার দিন বা সীমিত কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করলে কর্মীদের স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতা উভয়ই বৃদ্ধি পায়। এতে ঘুমের মান উন্নত হয়, মানসিক চাপ কমে এবং কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে নিয়োগদাতাদের উচিত কাজের সময় নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ নিশ্চিত করা। একইসঙ্গে কর্মীদেরও দীর্ঘ সময় কাজকে স্বাভাবিক হিসেবে না দেখে স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদে এটি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উভয়ের জন্যই উপকারী বলে মত তাদের।
#আরএ
বিষয় : কাজের চাপ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ এপ্রিল ২০২৬
আধুনিক কর্মসংস্কৃতিতে নির্ধারিত আট ঘণ্টার কাজের সময় অনেক ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না। অফিস, কল-সেন্টার, ফ্রিল্যান্সিং থেকে শুরু করে করপোরেট খাতে দীর্ঘ সময় কাজ করা এখন স্বাভাবিক প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দীর্ঘ কর্মঘণ্টা শুধু ক্লান্তিই নয়, বরং মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে, যা কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি পর্যন্ত বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টা বা তার বেশি কাজ করা ব্যক্তিদের মধ্যে স্ট্রোকের ঝুঁকি ৩৫ শতাংশ এবং হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি ১৭ শতাংশ বেশি থাকে, তুলনামূলকভাবে যারা সপ্তাহে ৩৫ থেকে ৪০ ঘণ্টা কাজ করেন তাদের চেয়ে। গবেষণাটি ২০১৬ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানায়, দীর্ঘ কর্মঘণ্টার কারণে ওই বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭ লাখ ৪৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার বড় অংশ ঘটেছে হৃদরোগ ও স্ট্রোকজনিত কারণে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় কাজের প্রভাব দুইভাবে শরীরে পড়ে। প্রথমত, অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও শারীরিক ক্লান্তি সরাসরি হৃদযন্ত্র, রক্তচাপ ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলে। এতে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং পেশির সমস্যা দেখা দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, কাজের চাপের কারণে জীবনযাপনের ধরনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, অনিয়মিত খাবার, ধূমপান বা অ্যালকোহল গ্রহণ এবং শারীরিক ব্যায়াম কমে যাওয়া এসব ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
জাপানে দীর্ঘ কর্মঘণ্টার কারণে মৃত্যুকে আলাদা একটি নামেও চিহ্নিত করা হয়—‘কারোশি’। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত কাজজনিত কারণে ২০১৭ সালে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ধারণা করা হয়, এ ধরনের মৃত্যু অনেক সময় তাৎক্ষণিক না হয়ে দীর্ঘ সময়ের কর্মচাপের ফলেও ঘটতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, করোনাভাইরাস মহামারির পর বিশ্বজুড়ে কাজের সময় আরও বেড়েছে। লকডাউন ও রিমোট ওয়ার্কিং ব্যবস্থায় অনেক কর্মী স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি সময় কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন। WHO-এর এক কর্মকর্তা জানান, কিছু দেশে লকডাউনের সময় কর্মঘণ্টা গড়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা এবং কিছু উন্নয়নশীল অঞ্চলে দীর্ঘ কর্মঘণ্টার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৪০ কোটির বেশি মানুষ সপ্তাহে ৪৯ ঘণ্টা বা তার বেশি কাজ করেন। এসব কর্মীদের একটি বড় অংশ গিগ ইকোনমি বা ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত, যেখানে নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার বাধ্যবাধকতা না থাকায় কাজের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
গবেষকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় কাজ শুধু শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। এতে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা এবং কর্মস্থলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। পাশাপাশি পরিবার ও সামাজিক জীবনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে জীবনমান কমিয়ে দেয়।
অন্যদিকে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, কাজের সময় কমিয়ে সপ্তাহে চার দিন বা সীমিত কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করলে কর্মীদের স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতা উভয়ই বৃদ্ধি পায়। এতে ঘুমের মান উন্নত হয়, মানসিক চাপ কমে এবং কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে নিয়োগদাতাদের উচিত কাজের সময় নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ নিশ্চিত করা। একইসঙ্গে কর্মীদেরও দীর্ঘ সময় কাজকে স্বাভাবিক হিসেবে না দেখে স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদে এটি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উভয়ের জন্যই উপকারী বলে মত তাদের।
#আরএ

আপনার মতামত লিখুন