প্রতিদিনের খাবারের সঙ্গে অজান্তেই আমরা যে উপাদানটি সবচেয়ে বেশি গ্রহণ করি, সেটি হলো চিনি। চা, কফি, কোমল পানীয়, প্রক্রিয়াজাত খাবার—প্রায় সবকিছুতেই রয়েছে এর উপস্থিতি। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত বলছে, এই সাধারণ খাদ্য উপাদানটি শরীরের ওপর এমন প্রভাব ফেলতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রে মাদকের সঙ্গে তুলনীয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার এন্ডোক্রিনোলজি বিভাগের এমেরিটাস অধ্যাপক ও শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. রবার্ট লাস্টিগের মতে, চিনির প্রতি আসক্তি শুধু তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং বাস্তব সমস্যা। একটি পডকাস্টে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে খাদ্য আসক্তির হার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা অনেক ক্ষেত্রে অ্যালকোহল আসক্তির সমতুল্য।
ইয়েল ফুড অ্যাডিকশন স্কেলের একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ১৪ শতাংশ এবং শিশুদের মধ্যে ১২ শতাংশ খাদ্যের প্রতি আসক্ত। এই হার মদ্যপানে আসক্ত মানুষের সংখ্যার সঙ্গে প্রায় সমান। গবেষকরা বলছেন, এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয় যে চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি নির্ভরশীলতা একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করেন, চিনি ও অ্যালকোহল শরীরে অনেকটা একই ধরনের বিপাকীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। বিশেষ করে চিনির ফ্রুকটোজ এবং অ্যালকোহলের ইথানল কোষের মাইটোকন্ড্রিয়ায় একই ধরনের প্রভাব ফেলে। এর ফলে লিভারের ওপর চাপ বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।
ডা. লাস্টিগের মতে, এ কারণেই বর্তমানে শিশুদের মধ্যেও টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারের মতো রোগ বাড়ছে। তারা অ্যালকোহল গ্রহণ না করলেও অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের ফলে একই ধরনের শারীরিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে। বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ শিশুদের খাদ্যাভ্যাসে এখন উচ্চমাত্রার চিনি সহজলভ্য।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, চিনি মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’-কে সক্রিয় করে, যা আনন্দ অনুভূতির সঙ্গে জড়িত। ফলে বারবার মিষ্টি খাবার খেতে ইচ্ছা করে এবং ধীরে ধীরে এটি অভ্যাসে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়াটি অনেকাংশে মাদকাসক্তির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যেখানে ডোপামিন নিঃসরণের মাধ্যমে আনন্দের অনুভূতি তৈরি হয়।
তবে সব বিশেষজ্ঞ একমত নন যে চিনি সরাসরি মাদক হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। তাদের মতে, চিনি নিজে এককভাবে ক্ষতিকর নয়; বরং অতিরিক্ত গ্রহণই সমস্যার মূল কারণ। সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে সীমিত পরিমাণ চিনি গ্রহণ সাধারণত ক্ষতিকর নয়, কিন্তু প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত মিষ্টিজাত দ্রব্য নিয়মিত খেলে ঝুঁকি বাড়ে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, যারা অতিরিক্ত চিনি গ্রহণে অভ্যস্ত, তাদের ক্ষেত্রে ওজন বৃদ্ধি, ইনসুলিন প্রতিরোধ, হৃদরোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
চিনির এই ‘নীরব প্রভাব’ থেকে বাঁচতে খাদ্যাভ্যাসে সচেতনতা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো, প্রাকৃতিক খাবার গ্রহণ বাড়ানো এবং লেবেল দেখে চিনির পরিমাণ যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সবশেষে বলা যায়, চিনি সরাসরি মাদক না হলেও এর প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে মাদকাসক্তির মতো আচরণ তৈরি করতে পারে। তাই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করতে চিনির গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করা এখন সময়ের দাবি।
#আরএ
বিষয় : চিনি

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬
প্রতিদিনের খাবারের সঙ্গে অজান্তেই আমরা যে উপাদানটি সবচেয়ে বেশি গ্রহণ করি, সেটি হলো চিনি। চা, কফি, কোমল পানীয়, প্রক্রিয়াজাত খাবার—প্রায় সবকিছুতেই রয়েছে এর উপস্থিতি। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত বলছে, এই সাধারণ খাদ্য উপাদানটি শরীরের ওপর এমন প্রভাব ফেলতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রে মাদকের সঙ্গে তুলনীয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার এন্ডোক্রিনোলজি বিভাগের এমেরিটাস অধ্যাপক ও শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. রবার্ট লাস্টিগের মতে, চিনির প্রতি আসক্তি শুধু তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং বাস্তব সমস্যা। একটি পডকাস্টে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে খাদ্য আসক্তির হার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা অনেক ক্ষেত্রে অ্যালকোহল আসক্তির সমতুল্য।
ইয়েল ফুড অ্যাডিকশন স্কেলের একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ১৪ শতাংশ এবং শিশুদের মধ্যে ১২ শতাংশ খাদ্যের প্রতি আসক্ত। এই হার মদ্যপানে আসক্ত মানুষের সংখ্যার সঙ্গে প্রায় সমান। গবেষকরা বলছেন, এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয় যে চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি নির্ভরশীলতা একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করেন, চিনি ও অ্যালকোহল শরীরে অনেকটা একই ধরনের বিপাকীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। বিশেষ করে চিনির ফ্রুকটোজ এবং অ্যালকোহলের ইথানল কোষের মাইটোকন্ড্রিয়ায় একই ধরনের প্রভাব ফেলে। এর ফলে লিভারের ওপর চাপ বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।
ডা. লাস্টিগের মতে, এ কারণেই বর্তমানে শিশুদের মধ্যেও টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারের মতো রোগ বাড়ছে। তারা অ্যালকোহল গ্রহণ না করলেও অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের ফলে একই ধরনের শারীরিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে। বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ শিশুদের খাদ্যাভ্যাসে এখন উচ্চমাত্রার চিনি সহজলভ্য।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, চিনি মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’-কে সক্রিয় করে, যা আনন্দ অনুভূতির সঙ্গে জড়িত। ফলে বারবার মিষ্টি খাবার খেতে ইচ্ছা করে এবং ধীরে ধীরে এটি অভ্যাসে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়াটি অনেকাংশে মাদকাসক্তির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যেখানে ডোপামিন নিঃসরণের মাধ্যমে আনন্দের অনুভূতি তৈরি হয়।
তবে সব বিশেষজ্ঞ একমত নন যে চিনি সরাসরি মাদক হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। তাদের মতে, চিনি নিজে এককভাবে ক্ষতিকর নয়; বরং অতিরিক্ত গ্রহণই সমস্যার মূল কারণ। সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে সীমিত পরিমাণ চিনি গ্রহণ সাধারণত ক্ষতিকর নয়, কিন্তু প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত মিষ্টিজাত দ্রব্য নিয়মিত খেলে ঝুঁকি বাড়ে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, যারা অতিরিক্ত চিনি গ্রহণে অভ্যস্ত, তাদের ক্ষেত্রে ওজন বৃদ্ধি, ইনসুলিন প্রতিরোধ, হৃদরোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
চিনির এই ‘নীরব প্রভাব’ থেকে বাঁচতে খাদ্যাভ্যাসে সচেতনতা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো, প্রাকৃতিক খাবার গ্রহণ বাড়ানো এবং লেবেল দেখে চিনির পরিমাণ যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সবশেষে বলা যায়, চিনি সরাসরি মাদক না হলেও এর প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে মাদকাসক্তির মতো আচরণ তৈরি করতে পারে। তাই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করতে চিনির গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করা এখন সময়ের দাবি।
#আরএ

আপনার মতামত লিখুন