ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

হুমকির মুখে বিলাসবহুল সুগন্ধির উপাদান ‘মির’ গাছ


আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬

হুমকির মুখে বিলাসবহুল সুগন্ধির উপাদান ‘মির’ গাছ

বিশ্বখ্যাত সুগন্ধি শিল্পে ব্যবহৃত অন্যতম মূল্যবান প্রাকৃতিক উপাদান ‘মির’ এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। আফ্রিকার হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা, পানির তীব্র সংকট, অতিচারণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দ্রুত কমে যাচ্ছে মির উৎপাদনকারী গাছের সংখ্যা। 

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে একসময় বিলীন হয়ে যেতে পারে এই ঐতিহাসিক গাছ, যার সঙ্গে হারিয়ে যাবে হাজারো মানুষের জীবিকা ও প্রাচীন ঐতিহ্য।

মির পাওয়া যায় কমিফোরা মিরা (Commiphora myrrha) নামের গাছ থেকে। এই গাছ প্রধানত ইথিওপিয়া, সোমালিয়া ও আশপাশের শুষ্ক অঞ্চলে জন্মায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গাছের কাণ্ড থেকে নির্গত রেজিন সংগ্রহ করে তা সুগন্ধি, ওষুধ, প্রসাধনী এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহার করা হয়ে আসছে। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায়ও মির ছিল অত্যন্ত মূল্যবান উপাদান।

বর্তমানে ইথিওপিয়ার সোমালি অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় মির গাছ দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। একসময় যেসব এলাকায় ঘন গাছপালা ছিল, এখন সেখানে শুকনো জমি আর বিরান প্রান্তর দেখা যাচ্ছে। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পুরোনো গাছগুলো টিকে থাকলেও নতুন চারাগাছ বড় হতে পারছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খরা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম এবং ২০২৩ সালের ভয়াবহ বন্যার পর মাটির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। এতে রেজিন উৎপাদন কমে গেছে এবং গাছের পুনর্জন্ম প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয় প্রবীণরা জানিয়েছেন, শুধু আবহাওয়াগত সংকট নয়, অতিচারণও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাদ্যের অভাবে গবাদিপশু ছোট চারাগাছ খেয়ে ফেলছে বা পা দিয়ে নষ্ট করছে। ফলে নতুন গাছ জন্মালেও তা টিকে থাকতে পারছে না। এতে প্রতি বছর মির গাছের সংখ্যা কমছে।

পানির সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। অনেক পশুপালককে পানি সংগ্রহের জন্য ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ অতিক্রম করতে হচ্ছে। একটি কূপের চারপাশে শত শত পশুর ভিড় দেখা যায়। সেখানে প্রথমে পশুকে পানি দেওয়া হয়, পরে মানুষ পানি পায়। এমন বাস্তবতায় কৃষি ও বনজ সম্পদ রক্ষা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে।

অন্যদিকে মির সংগ্রহকারীরা ন্যায্য মূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। স্থানীয় সংগ্রাহকেরা প্রতি কেজি মির বিক্রি করে মাত্র ৩ দশমিক ৫০ থেকে ১০ ডলার পান। অথচ এই মির ব্যবহার করে তৈরি সুগন্ধি আন্তর্জাতিক বাজারে ৫০০ ডলার পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়। বিশ্বের নামী ব্র্যান্ডগুলো তাদের বিলাসবহুল পণ্যে এই উপাদান ব্যবহার করে বিপুল মুনাফা অর্জন করছে।

গবেষকদের একটি দল সম্প্রতি অঞ্চলটি পরিদর্শন করে সরাসরি বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে সংগ্রাহকেরা মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই ন্যায্য দামে পণ্য বিক্রি করতে পারেন। তাদের মতে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করা গেলে গাছ সংরক্ষণে আগ্রহও বাড়বে।

পরিবেশবিদদের মতে, মির গাছ রক্ষা করতে হলে খরা মোকাবিলা, পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, চারাগাছ সংরক্ষণ, টেকসই চারণনীতি এবং ন্যায্য বাণিজ্য নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় সুগন্ধি শিল্পের মূল্যবান কাঁচামাল হারানোর পাশাপাশি আফ্রিকার বহু দরিদ্র পরিবারের শেষ আয়ের উৎসও বিলীন হয়ে যাবে।

#আরএ

বিষয় : মির গাছ

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


হুমকির মুখে বিলাসবহুল সুগন্ধির উপাদান ‘মির’ গাছ

প্রকাশের তারিখ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

বিশ্বখ্যাত সুগন্ধি শিল্পে ব্যবহৃত অন্যতম মূল্যবান প্রাকৃতিক উপাদান ‘মির’ এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। আফ্রিকার হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা, পানির তীব্র সংকট, অতিচারণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দ্রুত কমে যাচ্ছে মির উৎপাদনকারী গাছের সংখ্যা। 

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে একসময় বিলীন হয়ে যেতে পারে এই ঐতিহাসিক গাছ, যার সঙ্গে হারিয়ে যাবে হাজারো মানুষের জীবিকা ও প্রাচীন ঐতিহ্য।

মির পাওয়া যায় কমিফোরা মিরা (Commiphora myrrha) নামের গাছ থেকে। এই গাছ প্রধানত ইথিওপিয়া, সোমালিয়া ও আশপাশের শুষ্ক অঞ্চলে জন্মায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গাছের কাণ্ড থেকে নির্গত রেজিন সংগ্রহ করে তা সুগন্ধি, ওষুধ, প্রসাধনী এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহার করা হয়ে আসছে। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায়ও মির ছিল অত্যন্ত মূল্যবান উপাদান।

বর্তমানে ইথিওপিয়ার সোমালি অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় মির গাছ দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। একসময় যেসব এলাকায় ঘন গাছপালা ছিল, এখন সেখানে শুকনো জমি আর বিরান প্রান্তর দেখা যাচ্ছে। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পুরোনো গাছগুলো টিকে থাকলেও নতুন চারাগাছ বড় হতে পারছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খরা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম এবং ২০২৩ সালের ভয়াবহ বন্যার পর মাটির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। এতে রেজিন উৎপাদন কমে গেছে এবং গাছের পুনর্জন্ম প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয় প্রবীণরা জানিয়েছেন, শুধু আবহাওয়াগত সংকট নয়, অতিচারণও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাদ্যের অভাবে গবাদিপশু ছোট চারাগাছ খেয়ে ফেলছে বা পা দিয়ে নষ্ট করছে। ফলে নতুন গাছ জন্মালেও তা টিকে থাকতে পারছে না। এতে প্রতি বছর মির গাছের সংখ্যা কমছে।

পানির সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। অনেক পশুপালককে পানি সংগ্রহের জন্য ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ অতিক্রম করতে হচ্ছে। একটি কূপের চারপাশে শত শত পশুর ভিড় দেখা যায়। সেখানে প্রথমে পশুকে পানি দেওয়া হয়, পরে মানুষ পানি পায়। এমন বাস্তবতায় কৃষি ও বনজ সম্পদ রক্ষা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে।

অন্যদিকে মির সংগ্রহকারীরা ন্যায্য মূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। স্থানীয় সংগ্রাহকেরা প্রতি কেজি মির বিক্রি করে মাত্র ৩ দশমিক ৫০ থেকে ১০ ডলার পান। অথচ এই মির ব্যবহার করে তৈরি সুগন্ধি আন্তর্জাতিক বাজারে ৫০০ ডলার পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়। বিশ্বের নামী ব্র্যান্ডগুলো তাদের বিলাসবহুল পণ্যে এই উপাদান ব্যবহার করে বিপুল মুনাফা অর্জন করছে।

গবেষকদের একটি দল সম্প্রতি অঞ্চলটি পরিদর্শন করে সরাসরি বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে সংগ্রাহকেরা মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই ন্যায্য দামে পণ্য বিক্রি করতে পারেন। তাদের মতে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করা গেলে গাছ সংরক্ষণে আগ্রহও বাড়বে।

পরিবেশবিদদের মতে, মির গাছ রক্ষা করতে হলে খরা মোকাবিলা, পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, চারাগাছ সংরক্ষণ, টেকসই চারণনীতি এবং ন্যায্য বাণিজ্য নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় সুগন্ধি শিল্পের মূল্যবান কাঁচামাল হারানোর পাশাপাশি আফ্রিকার বহু দরিদ্র পরিবারের শেষ আয়ের উৎসও বিলীন হয়ে যাবে।

#আরএ


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ