রাজধানী ঢাকার দীর্ঘস্থায়ী যানজট নিরসনে ১১ দফা প্রস্তাবনা তুলে ধরেছে ঢাকা যানজট নিরসন কমিটি নামে একটি বেসরকারি সংগঠন।
রোববার (১২ এপ্রিল) জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। সংগঠনটির সভাপতি ইছহাক দুলাল বলেন, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে ঢাকার যানজট পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী রাজধানী ঢাকায় যানজট এখন নগরজীবনের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি। ২০০৭-০৮ সালে ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার থাকলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৫ থেকে ৭ কিলোমিটারে। এতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, বাড়ছে জ্বালানি অপচয়, কমছে উৎপাদনশীলতা এবং নাগরিক জীবনে বাড়ছে দুর্ভোগ।
সংগঠনটির দাবি, সিপিডির এক জরিপ অনুযায়ী ঢাকার যাত্রীদের প্রতি দুই ঘণ্টায় প্রায় ৪৬ মিনিট যানজটে আটকে থাকতে হয়। বছরে জনপ্রতি প্রায় ২৭৬ ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে। এই অচলাবস্থার আর্থিক ক্ষতি বছরে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলেও তারা উল্লেখ করেন।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ঢাকা যানজট নিরসন কমিটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি মিলিয়ে ১১টি প্রস্তাবনা দিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো রাজধানীর চারপাশের খাল সংস্কার করে জলপথে স্পিডবোট, ওয়াটার বাস ও ছোট লঞ্চ চালু করা। এতে সড়কের ওপর চাপ কমবে এবং বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে বলে মত সংগঠনটির।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ঢাকার চারপাশে নদীঘেঁষে ট্রাম রোড বা মিনি রেলপথ নির্মাণ করা যেতে পারে। একইসঙ্গে সেই রেলপথ ঘিরে একটি রিং রোড গড়ে তোলারও সুপারিশ করা হয়েছে। এতে শহরে প্রবেশ ও বের হওয়ার যানবাহন আলাদা রুট পাবে এবং কেন্দ্রীয় সড়কে চাপ কমবে।
বাস টার্মিনাল পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাবও দিয়েছে সংগঠনটি। সায়দাবাদ বাসস্ট্যান্ড কাঁচপুরে, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড টঙ্গীতে এবং বাবুবাজার বাসস্ট্যান্ড কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরের কথা বলা হয়েছে। এতে আন্তঃজেলা পরিবহনের গাড়ি রাজধানীর কেন্দ্রভাগে ঢুকে যানজট বাড়াতে পারবে না বলে মনে করছেন তারা।
কমলাপুর থেকে বাইপাস রেললাইন টঙ্গীর সঙ্গে সংযুক্ত করা অথবা উড়ালসেতু নির্মাণের প্রস্তাবও রয়েছে। সংগঠনটির মতে, এ ধরনের সংযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে শহরের অভ্যন্তরীণ পরিবহন চাপ কমবে।
প্রস্তাবনায় আদালত ও কারাগার অবকাঠামোও পুনর্বিন্যাসের কথা বলা হয়েছে। ঢাকা শহরকে দুই জোনে ভাগ করে কেরানীগঞ্জ ও কাশিমপুর এলাকায় আদালত ভবন স্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক হাজতি ও সংশ্লিষ্ট যানবাহনের চলাচল কমে।
ঢাকার চারপাশে ১০০ কিলোমিটার রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা চালুরও আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে পার্শ্ববর্তী জেলা শহরগুলোর সঙ্গে দ্রুত সংযোগ স্থাপন করা যায়। এতে কর্মজীবী মানুষ ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের চাপ কমাতে পারবেন।
ফুটপাত দখলমুক্ত করে হকারদের পুনর্বাসন, হলিডে মার্কেট চালু, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রশিক্ষণ, চালকদের নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ এবং লেন শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া দুই সিটি করপোরেশনের অধীনে স্বল্পভাড়া ও এসি সুবিধাসম্পন্ন নগর পরিবহন চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে শিল্প উৎপাদন বাড়াতে সিএনজি ছাড়া অন্য গাড়িতে গ্যাস সরবরাহ সীমিত করার কথাও বলা হয়েছে।
সংগঠনটির নেতারা বলেন, যানজট নিরসনে শুধু সড়ক সম্প্রসারণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, বহুমাত্রিক পরিবহন ব্যবস্থা এবং কঠোর বাস্তবায়ন। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে সরকার উদ্যোগ নিলে রাজধানীবাসী দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাবে।
#আরএ
বিষয় : রাজধানী

শনিবার, ০২ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ এপ্রিল ২০২৬
রাজধানী ঢাকার দীর্ঘস্থায়ী যানজট নিরসনে ১১ দফা প্রস্তাবনা তুলে ধরেছে ঢাকা যানজট নিরসন কমিটি নামে একটি বেসরকারি সংগঠন।
রোববার (১২ এপ্রিল) জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। সংগঠনটির সভাপতি ইছহাক দুলাল বলেন, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে ঢাকার যানজট পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী রাজধানী ঢাকায় যানজট এখন নগরজীবনের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি। ২০০৭-০৮ সালে ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার থাকলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৫ থেকে ৭ কিলোমিটারে। এতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, বাড়ছে জ্বালানি অপচয়, কমছে উৎপাদনশীলতা এবং নাগরিক জীবনে বাড়ছে দুর্ভোগ।
সংগঠনটির দাবি, সিপিডির এক জরিপ অনুযায়ী ঢাকার যাত্রীদের প্রতি দুই ঘণ্টায় প্রায় ৪৬ মিনিট যানজটে আটকে থাকতে হয়। বছরে জনপ্রতি প্রায় ২৭৬ ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে। এই অচলাবস্থার আর্থিক ক্ষতি বছরে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলেও তারা উল্লেখ করেন।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ঢাকা যানজট নিরসন কমিটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি মিলিয়ে ১১টি প্রস্তাবনা দিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো রাজধানীর চারপাশের খাল সংস্কার করে জলপথে স্পিডবোট, ওয়াটার বাস ও ছোট লঞ্চ চালু করা। এতে সড়কের ওপর চাপ কমবে এবং বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে বলে মত সংগঠনটির।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ঢাকার চারপাশে নদীঘেঁষে ট্রাম রোড বা মিনি রেলপথ নির্মাণ করা যেতে পারে। একইসঙ্গে সেই রেলপথ ঘিরে একটি রিং রোড গড়ে তোলারও সুপারিশ করা হয়েছে। এতে শহরে প্রবেশ ও বের হওয়ার যানবাহন আলাদা রুট পাবে এবং কেন্দ্রীয় সড়কে চাপ কমবে।
বাস টার্মিনাল পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাবও দিয়েছে সংগঠনটি। সায়দাবাদ বাসস্ট্যান্ড কাঁচপুরে, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড টঙ্গীতে এবং বাবুবাজার বাসস্ট্যান্ড কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরের কথা বলা হয়েছে। এতে আন্তঃজেলা পরিবহনের গাড়ি রাজধানীর কেন্দ্রভাগে ঢুকে যানজট বাড়াতে পারবে না বলে মনে করছেন তারা।
কমলাপুর থেকে বাইপাস রেললাইন টঙ্গীর সঙ্গে সংযুক্ত করা অথবা উড়ালসেতু নির্মাণের প্রস্তাবও রয়েছে। সংগঠনটির মতে, এ ধরনের সংযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে শহরের অভ্যন্তরীণ পরিবহন চাপ কমবে।
প্রস্তাবনায় আদালত ও কারাগার অবকাঠামোও পুনর্বিন্যাসের কথা বলা হয়েছে। ঢাকা শহরকে দুই জোনে ভাগ করে কেরানীগঞ্জ ও কাশিমপুর এলাকায় আদালত ভবন স্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক হাজতি ও সংশ্লিষ্ট যানবাহনের চলাচল কমে।
ঢাকার চারপাশে ১০০ কিলোমিটার রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা চালুরও আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে পার্শ্ববর্তী জেলা শহরগুলোর সঙ্গে দ্রুত সংযোগ স্থাপন করা যায়। এতে কর্মজীবী মানুষ ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের চাপ কমাতে পারবেন।
ফুটপাত দখলমুক্ত করে হকারদের পুনর্বাসন, হলিডে মার্কেট চালু, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রশিক্ষণ, চালকদের নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ এবং লেন শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া দুই সিটি করপোরেশনের অধীনে স্বল্পভাড়া ও এসি সুবিধাসম্পন্ন নগর পরিবহন চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে শিল্প উৎপাদন বাড়াতে সিএনজি ছাড়া অন্য গাড়িতে গ্যাস সরবরাহ সীমিত করার কথাও বলা হয়েছে।
সংগঠনটির নেতারা বলেন, যানজট নিরসনে শুধু সড়ক সম্প্রসারণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, বহুমাত্রিক পরিবহন ব্যবস্থা এবং কঠোর বাস্তবায়ন। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে সরকার উদ্যোগ নিলে রাজধানীবাসী দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাবে।
#আরএ

আপনার মতামত লিখুন