ঢাকা    মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

দখল-দূষণে মৃতপ্রায় করাঙ্গী নদী, পানিশূন্যতায় বিপর্যস্ত বাহুবল



দখল-দূষণে মৃতপ্রায় করাঙ্গী নদী, পানিশূন্যতায় বিপর্যস্ত বাহুবল
ঐতিহ্যবাহী করাঙ্গী নদী আজ পানিশূন্য হয়ে পড়েছে

এক সময় বর্ষায় খরস্রোতা রূপ ধারণ করা ঐতিহ্যবাহী করাঙ্গী নদী আজ পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের ফলে নদীটি কার্যত মরা খালে পরিণত হয়েছে। এতে দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির মুখে পড়ার পাশাপাশি কৃষি, গৃহস্থালি ও জীববৈচিত্র্যে মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে।

নদীটি হবিগঞ্জ জেলাবাহুবল উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বিভিন্ন হাওরে গিয়ে নিঃশেষ হয়েছে। করাঙ্গী নদী উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আন্তঃসীমান্ত খোয়াই নদীর একটি শাখা নদী। নদীটির উৎপত্তি ভারতের আসাম রাজ্যের একটি নালা থেকে। পরে এটি চুনারুঘাট সীমান্ত অতিক্রম করে বাহুবল উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৮ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ ৩৫ মিটার। এক সময় শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন মাসজুড়ে নদীতে কানায় কানায় পানি থাকলেও বছরের বাকি সময় এটি শুকিয়ে যায়। বর্ষা শেষে নদীর ঢাল দখল করে চাষাবাদ শুরু হয়, যা নাব্যতা সংকট আরও তীব্র করছে।

বর্তমানে কোথাও নদীর মাঝখানে চর জেগে উঠেছে, কোথাও হাঁটুপানি কিংবা কোমরপানি। অনেক স্থানে মানুষ হেঁটে নদী পার হচ্ছে। নদীর তলদেশে ধান চাষ হচ্ছে, আবার কোথাও দোকান, ঘরবাড়ি ও অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন বাজার ও কোম্পানির বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীর তীরে, ফলে পানি ও বাতাস উভয়ই মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।

এক সময় এই নদীর ওপর নির্ভর করে বাহুবল সদর, ভাদেশ্বর ও সাতকাপন ইউনিয়নের হাজারো মানুষ কৃষিকাজ, মাছ ধরা ও গবাদিপশু পালনের কাজ করতেন। এখন নদীতে পানি না থাকায় বোরো ধানের জমি সেচ সংকটে পড়েছে এবং কৃষকরা ব্যয়বহুল সেচযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।

স্থানীয় কৃষক রাসেল মিয়া বলেন, “এক সময় বড় বড় নৌকা চলত করাঙ্গী নদীতে। এখন নৌকা তো দূরের কথা, নদীটাই হারিয়ে যাচ্ছে।”

পরিবেশবিদদের মতে, উজানে অপরিকল্পিত বাঁধ, ড্যাম ও ব্যারাজ নির্মাণ করে নদীর স্বাভাবিক স্রোত বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। এতে পলি জমে নদী ভরাট হয়ে নাব্যতা হারিয়েছে। দেশীয় মাছের প্রজাতি দ্রুত বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সামিউন আসিফ স্বীকার করেন, নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় দেশীয় মাছ হুমকির মুখে। তবে নদী পুনরুদ্ধারে মৎস্য বিভাগের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে তিনি জানান।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালে হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০ কিলোমিটার নদী খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রকল্পটি কার্যত ব্যর্থ হয়। খনন শেষ হলেও নদীর বড় অংশ আজও পানিশূন্য।

সচেতন মহলের মতে, করাঙ্গী নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে দ্রুত দখল উচ্ছেদ, পুনঃখনন ও উজানে অপরিকল্পিত বাঁধ অপসারণ জরুরি। নইলে অচিরেই মানচিত্র ও ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাবে এক সময়ের খরস্রোতা করাঙ্গী নদী।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬


দখল-দূষণে মৃতপ্রায় করাঙ্গী নদী, পানিশূন্যতায় বিপর্যস্ত বাহুবল

প্রকাশের তারিখ : ০৩ মার্চ ২০২৬

featured Image

এক সময় বর্ষায় খরস্রোতা রূপ ধারণ করা ঐতিহ্যবাহী করাঙ্গী নদী আজ পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের ফলে নদীটি কার্যত মরা খালে পরিণত হয়েছে। এতে দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির মুখে পড়ার পাশাপাশি কৃষি, গৃহস্থালি ও জীববৈচিত্র্যে মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে।

নদীটি হবিগঞ্জ জেলাবাহুবল উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বিভিন্ন হাওরে গিয়ে নিঃশেষ হয়েছে। করাঙ্গী নদী উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আন্তঃসীমান্ত খোয়াই নদীর একটি শাখা নদী। নদীটির উৎপত্তি ভারতের আসাম রাজ্যের একটি নালা থেকে। পরে এটি চুনারুঘাট সীমান্ত অতিক্রম করে বাহুবল উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৮ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ ৩৫ মিটার। এক সময় শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন মাসজুড়ে নদীতে কানায় কানায় পানি থাকলেও বছরের বাকি সময় এটি শুকিয়ে যায়। বর্ষা শেষে নদীর ঢাল দখল করে চাষাবাদ শুরু হয়, যা নাব্যতা সংকট আরও তীব্র করছে।

বর্তমানে কোথাও নদীর মাঝখানে চর জেগে উঠেছে, কোথাও হাঁটুপানি কিংবা কোমরপানি। অনেক স্থানে মানুষ হেঁটে নদী পার হচ্ছে। নদীর তলদেশে ধান চাষ হচ্ছে, আবার কোথাও দোকান, ঘরবাড়ি ও অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন বাজার ও কোম্পানির বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীর তীরে, ফলে পানি ও বাতাস উভয়ই মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।

এক সময় এই নদীর ওপর নির্ভর করে বাহুবল সদর, ভাদেশ্বর ও সাতকাপন ইউনিয়নের হাজারো মানুষ কৃষিকাজ, মাছ ধরা ও গবাদিপশু পালনের কাজ করতেন। এখন নদীতে পানি না থাকায় বোরো ধানের জমি সেচ সংকটে পড়েছে এবং কৃষকরা ব্যয়বহুল সেচযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।

স্থানীয় কৃষক রাসেল মিয়া বলেন, “এক সময় বড় বড় নৌকা চলত করাঙ্গী নদীতে। এখন নৌকা তো দূরের কথা, নদীটাই হারিয়ে যাচ্ছে।”

পরিবেশবিদদের মতে, উজানে অপরিকল্পিত বাঁধ, ড্যাম ও ব্যারাজ নির্মাণ করে নদীর স্বাভাবিক স্রোত বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। এতে পলি জমে নদী ভরাট হয়ে নাব্যতা হারিয়েছে। দেশীয় মাছের প্রজাতি দ্রুত বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সামিউন আসিফ স্বীকার করেন, নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় দেশীয় মাছ হুমকির মুখে। তবে নদী পুনরুদ্ধারে মৎস্য বিভাগের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে তিনি জানান।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালে হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০ কিলোমিটার নদী খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রকল্পটি কার্যত ব্যর্থ হয়। খনন শেষ হলেও নদীর বড় অংশ আজও পানিশূন্য।

সচেতন মহলের মতে, করাঙ্গী নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে দ্রুত দখল উচ্ছেদ, পুনঃখনন ও উজানে অপরিকল্পিত বাঁধ অপসারণ জরুরি। নইলে অচিরেই মানচিত্র ও ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাবে এক সময়ের খরস্রোতা করাঙ্গী নদী।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০২৪১০৯১৭৩০
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: 01711-070054

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ