গাজীপুরের কালীগঞ্জে গত ৩১ জানুয়ারি রাতে ঘটেছে এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে ছিনতাই, ধস্তাধস্তি এবং মৃত্যুর ঘটনা, যা এখন এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। এক পক্ষ দাবি করছে, এটি আত্মরক্ষার সময় দুর্ঘটনাবশত মৃত্যু; অন্যদিকে স্থানীয়দের একটি অংশ মনে করছে, এটি পরিকল্পিত হত্যা, যার দায় চাপানো হচ্ছে নিরীহ ব্যবসায়ী হানিফ কাজীর ওপর।
ঘটনাস্থল হলো কালীগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরসাদী ইউনিয়নের দক্ষিনবাগ এলাকায় কুড়িল্লারটেক সেতু সংলগ্ন সড়ক। পরদিন ১ ফেব্রুয়ারি সকালে স্থানীয়রা সেতু থেকে প্রায় ৪০০ ফুট দূরে ডোবায় ভাসমান মরদেহ দেখে পুলিশে খবর দেন। পুলিশ নিহতকে রাজমিস্ত্রি ইলিয়াস শেখ হিসেবে শনাক্ত করে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, দোলান বাজারের ব্যবসায়ী হানিফ কাজী রাতের বেলায় দোকান বন্ধ করে নগদ টাকা নিয়ে বাইসাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, কুড়িল্লারটেক সেতু এলাকায় আগে থেকেই একদল দুর্বৃত্ত অবস্থান করছিল। হানিফ কাজীর ভাষ্য অনুযায়ী, পথরোধ করে তার কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তাকে ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়। পরে উঠে আসার পর দুর্বৃত্তরা ছুরি দিয়ে আঘাতের চেষ্টা করলে তিনি আত্মরক্ষার্থে ছুরি নিয়ে পালিয়ে যান।
আহত অবস্থায় হানিফ কাজী আশ্রয় নেন পাশের ছৈলাদী গ্রামের নাহিদের বাড়ি। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।
পরদিন সকালে মৃতদেহটি উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, ইলিয়াস শেখ স্থানীয়ভাবে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। তবে ঘটনার প্রেক্ষিতে এলাকাবাসীর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। দোলান বাজারের ব্যবসায়ী ও স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল মান্নান দাবি করেন, হানিফ কাজী দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করে আসছেন এবং তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক অভিযোগ নেই। তাদের বক্তব্য, “পরিকল্পিতভাবে ইলিয়াসকে হত্যা করে দায় চাপানো হচ্ছে হানিফের ওপর।”
নিহতের মা লাইলী বেগম বলেন, “আমার ছেলের কোনো শত্রু ছিল না। কে বা কারা তাকে হত্যা করেছে, আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।” তিনি আরও জানান, পাঁচ মাস আগে প্রতিবেশী দুলাল ব্যাপারীর মোটর চুরির ঘটনায় ইলিয়াসকে চোর সন্দেহে মারধর করে এলাকা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। পরে তিন মাস তিনি নরসিংদীতে শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করেন এবং দুই মাস আগে বাড়িতে ফিরে রাজমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন।
কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাকির হোসেন বলেন, “নিহত ইলিয়াস এলাকায় দুস্কৃতিকারী ও মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।” এছাড়া তিনি জানান, গ্রেপ্তারকৃত হানিফ কাজী প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন, “সেদিন হয়তো আমিই মারা যেতাম। নিজের জীবন বাঁচাতে ধস্তাধস্তির সময় ছুরি নিয়ে আঘাত করেছি।”
আইনজীবীরা মনে করছেন, যদি আঘাত আত্মরক্ষার্থে করা হয়, তাহলে এটি বৈধ আত্মরক্ষা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে তার প্রমাণের দায়িত্ব অভিযুক্তের ওপরই পড়ে। বিশেষভাবে, মরদেহ ঘটনাস্থল থেকে দূরে ডোবায় পাওয়া যাওয়ায় নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে – আঘাতের পর ইলিয়াস কীভাবে সেখানে গেলেন।
ঘটনার সময় অন্য কোনো প্রত্যক্ষদর্শী উপস্থিত ছিলেন না। ফলে ফরেনসিক রিপোর্ট, সুরতহাল প্রতিবেদন এবং আলামত বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করছে তদন্তের অগ্রগতি। স্থানীয়দের অভিযোগ, কুড়িল্লারটেক সেতু এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসায়ী ও ছিনতাইকারীদের আনাগোনা রয়েছে। রাতের সময় চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ এবং নিয়মিত টহল ও নজরদারির অভাব ঘটনার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। প্রশ্ন এখন, এটি কি সত্যিই আত্মরক্ষার লড়াই, নাকি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড? তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত রহস্য উন্মোচিত হবে না। তবে এলাকাবাসী আশা করছে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
গাজীপুরের কালীগঞ্জে গত ৩১ জানুয়ারি রাতে ঘটেছে এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে ছিনতাই, ধস্তাধস্তি এবং মৃত্যুর ঘটনা, যা এখন এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। এক পক্ষ দাবি করছে, এটি আত্মরক্ষার সময় দুর্ঘটনাবশত মৃত্যু; অন্যদিকে স্থানীয়দের একটি অংশ মনে করছে, এটি পরিকল্পিত হত্যা, যার দায় চাপানো হচ্ছে নিরীহ ব্যবসায়ী হানিফ কাজীর ওপর।
ঘটনাস্থল হলো কালীগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরসাদী ইউনিয়নের দক্ষিনবাগ এলাকায় কুড়িল্লারটেক সেতু সংলগ্ন সড়ক। পরদিন ১ ফেব্রুয়ারি সকালে স্থানীয়রা সেতু থেকে প্রায় ৪০০ ফুট দূরে ডোবায় ভাসমান মরদেহ দেখে পুলিশে খবর দেন। পুলিশ নিহতকে রাজমিস্ত্রি ইলিয়াস শেখ হিসেবে শনাক্ত করে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, দোলান বাজারের ব্যবসায়ী হানিফ কাজী রাতের বেলায় দোকান বন্ধ করে নগদ টাকা নিয়ে বাইসাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, কুড়িল্লারটেক সেতু এলাকায় আগে থেকেই একদল দুর্বৃত্ত অবস্থান করছিল। হানিফ কাজীর ভাষ্য অনুযায়ী, পথরোধ করে তার কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তাকে ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়। পরে উঠে আসার পর দুর্বৃত্তরা ছুরি দিয়ে আঘাতের চেষ্টা করলে তিনি আত্মরক্ষার্থে ছুরি নিয়ে পালিয়ে যান।
আহত অবস্থায় হানিফ কাজী আশ্রয় নেন পাশের ছৈলাদী গ্রামের নাহিদের বাড়ি। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।
পরদিন সকালে মৃতদেহটি উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, ইলিয়াস শেখ স্থানীয়ভাবে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। তবে ঘটনার প্রেক্ষিতে এলাকাবাসীর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। দোলান বাজারের ব্যবসায়ী ও স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল মান্নান দাবি করেন, হানিফ কাজী দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করে আসছেন এবং তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক অভিযোগ নেই। তাদের বক্তব্য, “পরিকল্পিতভাবে ইলিয়াসকে হত্যা করে দায় চাপানো হচ্ছে হানিফের ওপর।”
নিহতের মা লাইলী বেগম বলেন, “আমার ছেলের কোনো শত্রু ছিল না। কে বা কারা তাকে হত্যা করেছে, আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।” তিনি আরও জানান, পাঁচ মাস আগে প্রতিবেশী দুলাল ব্যাপারীর মোটর চুরির ঘটনায় ইলিয়াসকে চোর সন্দেহে মারধর করে এলাকা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। পরে তিন মাস তিনি নরসিংদীতে শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করেন এবং দুই মাস আগে বাড়িতে ফিরে রাজমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন।
কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাকির হোসেন বলেন, “নিহত ইলিয়াস এলাকায় দুস্কৃতিকারী ও মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।” এছাড়া তিনি জানান, গ্রেপ্তারকৃত হানিফ কাজী প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন, “সেদিন হয়তো আমিই মারা যেতাম। নিজের জীবন বাঁচাতে ধস্তাধস্তির সময় ছুরি নিয়ে আঘাত করেছি।”
আইনজীবীরা মনে করছেন, যদি আঘাত আত্মরক্ষার্থে করা হয়, তাহলে এটি বৈধ আত্মরক্ষা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে তার প্রমাণের দায়িত্ব অভিযুক্তের ওপরই পড়ে। বিশেষভাবে, মরদেহ ঘটনাস্থল থেকে দূরে ডোবায় পাওয়া যাওয়ায় নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে – আঘাতের পর ইলিয়াস কীভাবে সেখানে গেলেন।
ঘটনার সময় অন্য কোনো প্রত্যক্ষদর্শী উপস্থিত ছিলেন না। ফলে ফরেনসিক রিপোর্ট, সুরতহাল প্রতিবেদন এবং আলামত বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করছে তদন্তের অগ্রগতি। স্থানীয়দের অভিযোগ, কুড়িল্লারটেক সেতু এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসায়ী ও ছিনতাইকারীদের আনাগোনা রয়েছে। রাতের সময় চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ এবং নিয়মিত টহল ও নজরদারির অভাব ঘটনার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। প্রশ্ন এখন, এটি কি সত্যিই আত্মরক্ষার লড়াই, নাকি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড? তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত রহস্য উন্মোচিত হবে না। তবে এলাকাবাসী আশা করছে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।

আপনার মতামত লিখুন