ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বা সিপিডির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে সব সময়ই এক ধরনের দৃশ্যমান নিরপেক্ষতার আবরণ বজায় রাখে, যদিও তাদের পেশাগত দক্ষতা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। তবে দীর্ঘদিনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাদের সমালোচনাগুলো প্রায়ই একটি বিশেষ রাজনৈতিক সমীকরণকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। বিগত আওয়ামী শাসনামলে ১৬ বছরে কয়েকশ বিলিয়ন ডলার পাচার হলেও টিআইবির অবস্থান ছিল অত্যন্ত নরম। অথচ ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বিএনপি জোট সরকারকে পরপর কয়েকবার দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করে সংস্থাটি যে পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, তার ফলশ্রুতিতেই এক-এগারোর অগণতান্ত্রিক সরকারের পথ প্রশস্ত হয়েছিল। বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে টিআইবির সর্বশেষ রিপোর্টেও সেই একই ধরনের ‘বুদ্ধিবৃত্তিক চাতুর্য’ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সংস্থাটি একদিকে নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক বলছে, যা আপাতদৃষ্টিতে বিএনপির জন্য ইতিবাচক মনে হতে পারে। অন্যদিকে তারা জাল ভোট বা বুথ দখলের মতো কিছু নমুনাভিত্তিক তথ্য এমনভাবে উপস্থাপন করছে, যা দিয়ে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রাখা হয়েছে।
টিআইবির এই রিপোর্টের সবচেয়ে কৌশলী অংশটি হলো আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক যখন প্রশ্ন তোলেন যে আওয়ামী লীগকে ছাড়া এই নির্বাচন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে, তখন সেটি কেবল একটি মন্তব্য থাকে না বরং এটি হয়ে ওঠে দলটিকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করার একটি বিশেষ বার্তা। এই ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানের মাধ্যমে মূলত প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়। তবে আশার কথা হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বর্তমানে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। নির্বাচনের পরপরই বিজয়ী দলের নেতা তারেক রহমানের পক্ষ থেকে বিজিত বা সমমনা দলের নেতাদের বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ করার যে নজির তৈরি হয়েছে, তা আমাদের রাজনীতির জন্য একটি বিশাল মাইলফলক। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের ঘোষণা এবং বিএনপির পক্ষ থেকে সেটিকে স্বাগত জানানো একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়।
সংসদের শুরুতেই সংবিধান সংস্কার কমিটির শপথ গ্রহণ নিয়ে যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, সেটি মূলত পদ্ধতিগত বিষয়। বিএনপি যেখানে প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতার দাবি তুলছে, সেখানে জামায়াত ও অন্যান্য দল দ্রুত সংস্কার কাজ শুরুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এই প্রাথমিক মতভেদগুলো রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান হওয়া সম্ভব। তবে ইতিহাসের শিক্ষা হলো, কোনো অস্বাভাবিক বিজয় বা পর্দার আড়ালের শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে কোনো দলের জন্যই কল্যাণকর হয় না। ২০০৮ সালের সেই অস্বাভাবিক উত্থান শেষ পর্যন্ত যেমন পতনের কারণ হয়েছিল, বর্তমান ক্ষমতাসীনদেরও সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। নতুন বাংলাদেশের পথচলা টেকসই করতে হলে কোনো বিশেষ প্রতিষ্ঠানের দেওয়া সনদের চেয়ে জনগণের আস্থা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই সবচেয়ে বেশি জরুরি।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বা সিপিডির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে সব সময়ই এক ধরনের দৃশ্যমান নিরপেক্ষতার আবরণ বজায় রাখে, যদিও তাদের পেশাগত দক্ষতা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। তবে দীর্ঘদিনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাদের সমালোচনাগুলো প্রায়ই একটি বিশেষ রাজনৈতিক সমীকরণকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। বিগত আওয়ামী শাসনামলে ১৬ বছরে কয়েকশ বিলিয়ন ডলার পাচার হলেও টিআইবির অবস্থান ছিল অত্যন্ত নরম। অথচ ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বিএনপি জোট সরকারকে পরপর কয়েকবার দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করে সংস্থাটি যে পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, তার ফলশ্রুতিতেই এক-এগারোর অগণতান্ত্রিক সরকারের পথ প্রশস্ত হয়েছিল। বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে টিআইবির সর্বশেষ রিপোর্টেও সেই একই ধরনের ‘বুদ্ধিবৃত্তিক চাতুর্য’ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সংস্থাটি একদিকে নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক বলছে, যা আপাতদৃষ্টিতে বিএনপির জন্য ইতিবাচক মনে হতে পারে। অন্যদিকে তারা জাল ভোট বা বুথ দখলের মতো কিছু নমুনাভিত্তিক তথ্য এমনভাবে উপস্থাপন করছে, যা দিয়ে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রাখা হয়েছে।
টিআইবির এই রিপোর্টের সবচেয়ে কৌশলী অংশটি হলো আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক যখন প্রশ্ন তোলেন যে আওয়ামী লীগকে ছাড়া এই নির্বাচন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে, তখন সেটি কেবল একটি মন্তব্য থাকে না বরং এটি হয়ে ওঠে দলটিকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করার একটি বিশেষ বার্তা। এই ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানের মাধ্যমে মূলত প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়। তবে আশার কথা হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বর্তমানে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। নির্বাচনের পরপরই বিজয়ী দলের নেতা তারেক রহমানের পক্ষ থেকে বিজিত বা সমমনা দলের নেতাদের বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ করার যে নজির তৈরি হয়েছে, তা আমাদের রাজনীতির জন্য একটি বিশাল মাইলফলক। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের ঘোষণা এবং বিএনপির পক্ষ থেকে সেটিকে স্বাগত জানানো একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়।
সংসদের শুরুতেই সংবিধান সংস্কার কমিটির শপথ গ্রহণ নিয়ে যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, সেটি মূলত পদ্ধতিগত বিষয়। বিএনপি যেখানে প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতার দাবি তুলছে, সেখানে জামায়াত ও অন্যান্য দল দ্রুত সংস্কার কাজ শুরুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এই প্রাথমিক মতভেদগুলো রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান হওয়া সম্ভব। তবে ইতিহাসের শিক্ষা হলো, কোনো অস্বাভাবিক বিজয় বা পর্দার আড়ালের শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে কোনো দলের জন্যই কল্যাণকর হয় না। ২০০৮ সালের সেই অস্বাভাবিক উত্থান শেষ পর্যন্ত যেমন পতনের কারণ হয়েছিল, বর্তমান ক্ষমতাসীনদেরও সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। নতুন বাংলাদেশের পথচলা টেকসই করতে হলে কোনো বিশেষ প্রতিষ্ঠানের দেওয়া সনদের চেয়ে জনগণের আস্থা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই সবচেয়ে বেশি জরুরি।

আপনার মতামত লিখুন