আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি চীনে সামরিক অভ্যুত্থান বা ক্যু হওয়ার গুঞ্জন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দাবিগুলোর পক্ষে এখনো কোনো দৃঢ় প্রমাণ নেই। বরং সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে চীনা সামরিক নেতৃত্বে বড় ধরনের রদবদল এবং ক্ষমতা পুনর্গঠনের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
গত কয়েক মাসে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক জেনারেলকে বরখাস্ত করা হয়েছে কিংবা তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম জেনারেল ঝাং ইউশিয়া। তিনি চীনের সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের (সিএমসি) ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন এবং সামরিক নেতৃত্বের অত্যন্ত প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে পরিচিত। শৃঙ্খলা ও আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তাকে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই তদন্তের পেছনে দুর্নীতি, রাজনৈতিক আনুগত্যের অভাব অথবা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কাজ করতে পারে। যদিও চীনা সরকার একে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে।
‘কাসপিয়ান পোস্ট’-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ঝাং ইউশিয়ার বিরুদ্ধে চীনের পারমাণবিক অস্ত্রসংক্রান্ত গোপন তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ঘুষ গ্রহণ এবং পদোন্নতির বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো চীনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
এই ধরনের উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের অপসারণকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে এটিকে সামরিক ক্যুর পূর্বাভাস হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে সরিয়ে দেওয়ার কোনো সামরিক উদ্যোগ বা সেনা ইউনিটের বিদ্রোহের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে এসব দাবি আপাতত ভিত্তিহীন গুজব হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
চীনের প্রতিবেশী দেশগুলো, বিশেষ করে তাইওয়ান, এই পরিবর্তনের দিকে গভীর নজর রাখছে। তাইওয়ানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব জানিয়েছে, চীনের সামরিক কমান্ড কাঠামোতে এই অস্বাভাবিক রদবদল কোনো অভ্যুত্থানের ইঙ্গিত নয়; বরং এটি নেতৃত্ব পুনর্গঠনের অংশ। তবে তারা সতর্ক করে বলেছে, এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে চীনের সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন ও দিকনির্দেশে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দীর্ঘদিন ধরেই চীনা সেনাবাহিনীর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করার চেষ্টা করছেন। এর অংশ হিসেবে পুরোনো প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিচার ও তদন্ত এবং রাজনৈতিক আনুগত্য যাচাই করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে এই পরিবর্তন মূলত শি জিনপিংয়ের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার কৌশলের অংশ। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত দাবিগুলো প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সেগুলোকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যাচ্ছে না। তবুও এসব পরিবর্তন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চীনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তাইওয়ানসহ আশপাশের অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এবং কঠোর মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের কারণেই এ ধরনের গুজব সহজে ছড়িয়ে পড়ে। বেইজিং সাধারণত এসব সিদ্ধান্ত গোপনীয়ভাবে গ্রহণ করে, যা নানা জল্পনা-কল্পনার জন্ম দেয়।
এদিকে, ঝাং ইউশিয়ার বিরুদ্ধে পারমাণবিক তথ্য ফাঁসের অভিযোগ নিয়ে চীনা কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস জানিয়েছে, শৃঙ্খলা ও আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে, যা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিরই অংশ।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ঝাংয়ের মতো অভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তাদের অপসারণ চীনা সেনাবাহিনীর পেশাগত দক্ষতা ও নেতৃত্ব কাঠামোকে প্রভাবিত করতে পারে। পাশাপাশি শীর্ষ পর্যায়ে ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হলে, তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে কোনো বড় সামরিক সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে শি জিনপিংয়ের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপরই বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে। এতে একদিকে ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত হবে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি চীনে সামরিক অভ্যুত্থান বা ক্যু হওয়ার গুঞ্জন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দাবিগুলোর পক্ষে এখনো কোনো দৃঢ় প্রমাণ নেই। বরং সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে চীনা সামরিক নেতৃত্বে বড় ধরনের রদবদল এবং ক্ষমতা পুনর্গঠনের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
গত কয়েক মাসে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক জেনারেলকে বরখাস্ত করা হয়েছে কিংবা তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম জেনারেল ঝাং ইউশিয়া। তিনি চীনের সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের (সিএমসি) ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন এবং সামরিক নেতৃত্বের অত্যন্ত প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে পরিচিত। শৃঙ্খলা ও আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তাকে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই তদন্তের পেছনে দুর্নীতি, রাজনৈতিক আনুগত্যের অভাব অথবা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কাজ করতে পারে। যদিও চীনা সরকার একে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে।
‘কাসপিয়ান পোস্ট’-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ঝাং ইউশিয়ার বিরুদ্ধে চীনের পারমাণবিক অস্ত্রসংক্রান্ত গোপন তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ঘুষ গ্রহণ এবং পদোন্নতির বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো চীনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
এই ধরনের উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের অপসারণকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে এটিকে সামরিক ক্যুর পূর্বাভাস হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে সরিয়ে দেওয়ার কোনো সামরিক উদ্যোগ বা সেনা ইউনিটের বিদ্রোহের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে এসব দাবি আপাতত ভিত্তিহীন গুজব হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
চীনের প্রতিবেশী দেশগুলো, বিশেষ করে তাইওয়ান, এই পরিবর্তনের দিকে গভীর নজর রাখছে। তাইওয়ানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব জানিয়েছে, চীনের সামরিক কমান্ড কাঠামোতে এই অস্বাভাবিক রদবদল কোনো অভ্যুত্থানের ইঙ্গিত নয়; বরং এটি নেতৃত্ব পুনর্গঠনের অংশ। তবে তারা সতর্ক করে বলেছে, এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে চীনের সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন ও দিকনির্দেশে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দীর্ঘদিন ধরেই চীনা সেনাবাহিনীর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করার চেষ্টা করছেন। এর অংশ হিসেবে পুরোনো প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিচার ও তদন্ত এবং রাজনৈতিক আনুগত্য যাচাই করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে এই পরিবর্তন মূলত শি জিনপিংয়ের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার কৌশলের অংশ। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত দাবিগুলো প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সেগুলোকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যাচ্ছে না। তবুও এসব পরিবর্তন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চীনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তাইওয়ানসহ আশপাশের অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এবং কঠোর মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের কারণেই এ ধরনের গুজব সহজে ছড়িয়ে পড়ে। বেইজিং সাধারণত এসব সিদ্ধান্ত গোপনীয়ভাবে গ্রহণ করে, যা নানা জল্পনা-কল্পনার জন্ম দেয়।
এদিকে, ঝাং ইউশিয়ার বিরুদ্ধে পারমাণবিক তথ্য ফাঁসের অভিযোগ নিয়ে চীনা কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস জানিয়েছে, শৃঙ্খলা ও আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে, যা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিরই অংশ।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ঝাংয়ের মতো অভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তাদের অপসারণ চীনা সেনাবাহিনীর পেশাগত দক্ষতা ও নেতৃত্ব কাঠামোকে প্রভাবিত করতে পারে। পাশাপাশি শীর্ষ পর্যায়ে ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হলে, তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে কোনো বড় সামরিক সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে শি জিনপিংয়ের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপরই বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে। এতে একদিকে ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত হবে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আপনার মতামত লিখুন