বাংলাদেশ বর্তমানে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে উঠে আসা বৈশ্বিক ভূরাজনীতির গোপন চাল, অন্যদিকে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বর্ণিত টিকটক-ফেসবুকের ভার্চুয়াল যুদ্ধক্ষেত্র—সব মিলিয়ে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল একটি ভোট নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের আদর্শ ও সার্বভৌমত্বের এক কঠিন পরীক্ষা।
গত ২২ জানুয়ারি ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একসময়ের নিষিদ্ধ দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’ করতে আগ্রহী। একজন মার্কিন কূটনীতিকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, “আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক।”
তবে এই বন্ধুত্ব যে নিছক শুভেচ্ছার নয়, বরং গভীর কৌশলগত হিসাবের, তা স্পষ্ট। ওয়াশিংটন মনে করছে, শেখ হাসিনা পরবর্তী রাজনৈতিক শূন্যতায় জামায়াত সবচেয়ে সংগঠিত শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু এই ‘বন্ধুত্ব’ শর্তহীন নয়। প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, জামায়াত যদি কট্টর শরিয়া আইনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে যুক্তরাষ্ট্র পোশাক রপ্তানিতে শুল্ক আরোপ বা বাজার সুবিধা বন্ধের মতো অর্থনৈতিক ‘লিভার’ ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি করবে।
এই সমীকরণটি দিল্লির জন্য চরম অস্বস্তির। ভারতের আশঙ্কা, জামায়াতের উত্থান তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যখন এমনিতেই ‘ভিসা যুদ্ধ’ ও শেখ হাসিনাকে ফেরত না দেওয়ার প্রশ্নে শীতল, তখন যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান ওয়াশিংটন-দিল্লি সম্পর্কেও নতুন ফাটল তৈরি করতে পারে।
মাঠের রাজনীতির সমান্তরালে এবার সবচেয়ে বড় যুদ্ধ চলছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘আল জাজিরা’র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, পোস্টার আর মাইকের চেয়ে এখন ‘টিকটক’, ‘ফেসবুক’ ও ‘ইউটিউব’ বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ‘জেন-জি’ বা তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে রাজনৈতিক দলগুলো মিম, ১৫ সেকেন্ডের ভিডিও এবং ভাইরাল গান ব্যবহার করছে।
বিএনপি: দলটি তাদের নীতিগুলোকে সহজ গ্রাফিক্স ও ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা ‘ফার্মার কার্ড’-এর মতো নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।
জামায়াত ও এনসিপি: তারা আবেগ এবং পরিচয় রাজনীতিকে প্রাধান্য দিচ্ছে। ছন্দময় গান ও মিমের মাধ্যমে তারা তরুণ প্রজন্মের মগজধোলাইয়ের চেষ্টা করছে।
সরকার: অন্তর্বর্তী সরকারও বসে নেই। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা গণভোটের পক্ষে তারা অনলাইনে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে। সরকারের যুক্তি—মানুষ এখন পুরোনো গণমাধ্যম ছেড়ে স্ক্রিনেই তথ্য খোঁজে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে জাতীয় নির্বাচন এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ভোটারদের বড় একটি অংশ (প্রায় ৪৪ শতাংশ) তরুণ, যারা গত তিনটি নির্বাচনে (২০১৪, ২০১৮, ২০২৪) সঠিকভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। এই তরুণরাই এখন নির্বাচনের প্রধান নির্ণায়ক।
ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিলেও চ্যালেঞ্জ অনেক। একদিকে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিদের নীরব হস্তক্ষেপের চেষ্টা, অন্যদিকে অনলাইন জগতের ভুল তথ্য বা ‘ডিসইনফরমেশন’—এই দুইয়ের চাপে ভোটাররা কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়।
শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য এক ‘নির্ণায়ক মোড়’। কূটনীতির মারপ্যাঁচ বা অ্যালগরিদমের কারসাজি যা-ই থাকুক না কেন, দেশের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত ব্যালটেই নির্ধারিত হবে। ডিজিটাল রাজনীতি হয়তো জনমত গড়তে সাহায্য করে, কিন্তু সেই মত কতটুকু গভীর আর কতটা হুজুগে, তার প্রমাণ মিলবে ভোটের দিন। বাংলাদেশ নিজের ভবিষ্যৎ নিজে লিখবে, নাকি অন্যের খসড়া অনুযায়ী চলবে—১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালটই হবে তার চূড়ান্ত জবাব।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশ বর্তমানে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে উঠে আসা বৈশ্বিক ভূরাজনীতির গোপন চাল, অন্যদিকে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বর্ণিত টিকটক-ফেসবুকের ভার্চুয়াল যুদ্ধক্ষেত্র—সব মিলিয়ে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল একটি ভোট নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের আদর্শ ও সার্বভৌমত্বের এক কঠিন পরীক্ষা।
গত ২২ জানুয়ারি ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একসময়ের নিষিদ্ধ দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’ করতে আগ্রহী। একজন মার্কিন কূটনীতিকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, “আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক।”
তবে এই বন্ধুত্ব যে নিছক শুভেচ্ছার নয়, বরং গভীর কৌশলগত হিসাবের, তা স্পষ্ট। ওয়াশিংটন মনে করছে, শেখ হাসিনা পরবর্তী রাজনৈতিক শূন্যতায় জামায়াত সবচেয়ে সংগঠিত শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু এই ‘বন্ধুত্ব’ শর্তহীন নয়। প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, জামায়াত যদি কট্টর শরিয়া আইনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে যুক্তরাষ্ট্র পোশাক রপ্তানিতে শুল্ক আরোপ বা বাজার সুবিধা বন্ধের মতো অর্থনৈতিক ‘লিভার’ ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি করবে।
এই সমীকরণটি দিল্লির জন্য চরম অস্বস্তির। ভারতের আশঙ্কা, জামায়াতের উত্থান তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যখন এমনিতেই ‘ভিসা যুদ্ধ’ ও শেখ হাসিনাকে ফেরত না দেওয়ার প্রশ্নে শীতল, তখন যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান ওয়াশিংটন-দিল্লি সম্পর্কেও নতুন ফাটল তৈরি করতে পারে।
মাঠের রাজনীতির সমান্তরালে এবার সবচেয়ে বড় যুদ্ধ চলছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘আল জাজিরা’র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, পোস্টার আর মাইকের চেয়ে এখন ‘টিকটক’, ‘ফেসবুক’ ও ‘ইউটিউব’ বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ‘জেন-জি’ বা তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে রাজনৈতিক দলগুলো মিম, ১৫ সেকেন্ডের ভিডিও এবং ভাইরাল গান ব্যবহার করছে।
বিএনপি: দলটি তাদের নীতিগুলোকে সহজ গ্রাফিক্স ও ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা ‘ফার্মার কার্ড’-এর মতো নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।
জামায়াত ও এনসিপি: তারা আবেগ এবং পরিচয় রাজনীতিকে প্রাধান্য দিচ্ছে। ছন্দময় গান ও মিমের মাধ্যমে তারা তরুণ প্রজন্মের মগজধোলাইয়ের চেষ্টা করছে।
সরকার: অন্তর্বর্তী সরকারও বসে নেই। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা গণভোটের পক্ষে তারা অনলাইনে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে। সরকারের যুক্তি—মানুষ এখন পুরোনো গণমাধ্যম ছেড়ে স্ক্রিনেই তথ্য খোঁজে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে জাতীয় নির্বাচন এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ভোটারদের বড় একটি অংশ (প্রায় ৪৪ শতাংশ) তরুণ, যারা গত তিনটি নির্বাচনে (২০১৪, ২০১৮, ২০২৪) সঠিকভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। এই তরুণরাই এখন নির্বাচনের প্রধান নির্ণায়ক।
ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিলেও চ্যালেঞ্জ অনেক। একদিকে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিদের নীরব হস্তক্ষেপের চেষ্টা, অন্যদিকে অনলাইন জগতের ভুল তথ্য বা ‘ডিসইনফরমেশন’—এই দুইয়ের চাপে ভোটাররা কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়।
শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য এক ‘নির্ণায়ক মোড়’। কূটনীতির মারপ্যাঁচ বা অ্যালগরিদমের কারসাজি যা-ই থাকুক না কেন, দেশের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত ব্যালটেই নির্ধারিত হবে। ডিজিটাল রাজনীতি হয়তো জনমত গড়তে সাহায্য করে, কিন্তু সেই মত কতটুকু গভীর আর কতটা হুজুগে, তার প্রমাণ মিলবে ভোটের দিন। বাংলাদেশ নিজের ভবিষ্যৎ নিজে লিখবে, নাকি অন্যের খসড়া অনুযায়ী চলবে—১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালটই হবে তার চূড়ান্ত জবাব।

আপনার মতামত লিখুন