ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

একাধিক রিপোর্টে ক্লোজ হলেও বহাল তবিয়তে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা, নেই বিভাগীয় ব্যবস্থা

বগুড়ায় মৃত নারীর উদ্ধারকৃত অর্থ ও স্বর্ণ আত্মসাতের অভিযোগ


মোঃ নাজমুল হাসান নাজির
মোঃ নাজমুল হাসান নাজির
প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬

বগুড়ায় মৃত নারীর উদ্ধারকৃত অর্থ ও স্বর্ণ আত্মসাতের অভিযোগ
বগুড়ায় মৃত নারীর উদ্ধারকৃত অর্থ ও স্বর্ণ আত্মসাতের অভিযোগ, একাধিক রিপোর্টে ক্লোজ হয়েও ফিরে আসেন আগের রূপে নেই কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা...!

বগুড়ায় এক দরিদ্র নারীর মৃত্যুর পর তার ঘর থেকে উদ্ধারকৃত নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত কর্মকর্তা বগুড়া সদর থানার অধীন স্টেডিয়াম পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত উপপরিদর্শক (এসআই) জাহাঙ্গীর আলম।

অভিযোগ রয়েছে, মৃত নারীর ঘর থেকে উদ্ধার করা অর্থ ও স্বর্ণালংকার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর না করে তা আত্মসাৎ করা হয়েছে। যদিও এসআই জাহাঙ্গীর আলম এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

২০ হাজার টাকা ও চার আনা স্বর্ণ উদ্ধারের অভিযোগ

স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের দাবি অনুযায়ী, গত ৬ ডিসেম্বর বগুড়া শহরের জামিল নগর এলাকায় ভাড়াবাসা থেকে সাবিকুন নাহার নামের এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই সময় তার ঘর থেকে ২০ হাজার টাকা নগদ ও চার আনা ওজনের স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

তবে এসব অর্থ ও স্বর্ণ মৃত নারীর স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে।

এসআইয়ের বক্তব্যের সঙ্গে নথির গরমিল

অভিযোগ প্রসঙ্গে এসআই জাহাঙ্গীর আলম দাবি করেন,
“উদ্ধার করা টাকা ও স্বর্ণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।”

কিন্তু এই দাবির সঙ্গে সরকারি নথিপত্রের কোনো মিল পাওয়া যায়নি বলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।

বগুড়া আদালত পুলিশের জেনারেল রেকর্ড অফিসার (জিআরও) সুশান্ত কুমার বলেন,
“এসআই জাহাঙ্গীর আলম জিডি মূলে আদালতে কোনো টাকা বা স্বর্ণ জমা দেননি।”

একই বক্তব্য দেয় সদর থানার একটি বিশ্বস্ত সূত্রও। তারা জানায়, এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কোনো জিডি থানায় নথিভুক্ত করা হয়নি।

জিডিতে নেই অর্থ ও স্বর্ণের কোনো উল্লেখ

থানা সূত্রে জানা গেছে, লাশ উদ্ধারের দিন ৬ ডিসেম্বর রাত ১১টা ২৫ মিনিটে এসআই জাহাঙ্গীর আলম ৫৫৭ নম্বর একটি জিডি করেন। ওই জিডিতে কেবল ‘অপমৃত্যু মামলা’র তথ্য রয়েছে।

উদ্ধার করা অর্থ বা স্বর্ণালংকারের বিষয়ে সেখানে কোনো উল্লেখ নেই। এমনকি ২৪ ডিসেম্বর বিকেল পর্যন্ত জিডিটি অনলাইনেও আপলোড করা হয়নি বলে জানা গেছে।

জব্দ তালিকা না থাকার অভিযোগ

বাড়ির মালিক শাজাহান আলী ও তার স্ত্রী শামিমা বেগম অভিযোগ করে বলেন,
“লাশ মর্গে পাঠানোর পর আমাদের সামনে ঘর তল্লাশি করে টাকা ও স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু কোনো জব্দ তালিকা করা হয়নি, আমাদের স্বাক্ষরও নেওয়া হয়নি।”

আইন অনুযায়ী, কোনো মালামাল উদ্ধার হলে জব্দ তালিকা প্রস্তুত ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর গ্রহণ বাধ্যতামূলক। এ ঘটনায় সেই আইনি প্রক্রিয়া মানা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

দাফনের আগে অর্থ দাবির অভিযোগ

বাড়ির মালিক দম্পতির আরও অভিযোগ, ঘটনার দুই দিন পর তাদের স্টেডিয়াম পুলিশ ফাঁড়িতে ডেকে নিয়ে বলা হয়—
“লাশ দাফনের দায়িত্ব নিতে হলে উদ্ধারকৃত টাকার মধ্য থেকে ১০ হাজার টাকা দিতে হবে।”

টাকা না দেওয়ায় পুলিশ দাফনের দায়িত্ব নেয়নি বলে তারা অভিযোগ করেন। পরে মানবিক সংগঠন আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম মরদেহের দাফন সম্পন্ন করে।

আরেক ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ

এর আগে ২০ ডিসেম্বর রাতে স্টেডিয়াম ফাঁড়ির এসআই জাহাঙ্গীর আলম ও সদর থানার ওসি কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে আরেকটি ঘটনায় গুরুতর অভিযোগ ওঠে।

ভুক্তভোগী মোছা. আলো বেগম জানান, আদালতে মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই পুলিশি হুমকির মাধ্যমে তাকে ও তার মেয়েকে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

তিনি বলেন,
“এই ঘটনায় আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। আত্মহত্যার কথাও মাথায় এসেছে। আমার কোনো অঘটন ঘটলে এর দায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের।”

জনমত ও প্রতিক্রিয়া

ঘটনাগুলো ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বগুড়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এরশাদুল বারী বলেন,
“একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ পুরো প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা জরুরি।”

স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীরাও অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

প্রশ্ন থেকেই যায়

  • উদ্ধারকৃত অর্থ ও স্বর্ণ আদালতে জমা হয়ে থাকলে তার নথিভুক্ত প্রমাণ কোথায়?

  • জব্দ তালিকা ছাড়া কীভাবে মালামাল উদ্ধার করা হলো?

  • একাধিক অভিযোগের পরও কেন কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?

শেষ কথা

একজন মৃত দরিদ্র নারীর শেষ সম্বল ঘিরে ওঠা এই অভিযোগ শুধু একটি ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন—এই নীতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা এখন নিরপেক্ষ তদন্তের ওপরই নির্ভর করছে।

অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে জনস্বার্থে তা প্রকাশ করা হবে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


বগুড়ায় মৃত নারীর উদ্ধারকৃত অর্থ ও স্বর্ণ আত্মসাতের অভিযোগ

প্রকাশের তারিখ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image

বগুড়ায় এক দরিদ্র নারীর মৃত্যুর পর তার ঘর থেকে উদ্ধারকৃত নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত কর্মকর্তা বগুড়া সদর থানার অধীন স্টেডিয়াম পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত উপপরিদর্শক (এসআই) জাহাঙ্গীর আলম।

অভিযোগ রয়েছে, মৃত নারীর ঘর থেকে উদ্ধার করা অর্থ ও স্বর্ণালংকার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর না করে তা আত্মসাৎ করা হয়েছে। যদিও এসআই জাহাঙ্গীর আলম এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

২০ হাজার টাকা ও চার আনা স্বর্ণ উদ্ধারের অভিযোগ

স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের দাবি অনুযায়ী, গত ৬ ডিসেম্বর বগুড়া শহরের জামিল নগর এলাকায় ভাড়াবাসা থেকে সাবিকুন নাহার নামের এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই সময় তার ঘর থেকে ২০ হাজার টাকা নগদ ও চার আনা ওজনের স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

তবে এসব অর্থ ও স্বর্ণ মৃত নারীর স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে।

এসআইয়ের বক্তব্যের সঙ্গে নথির গরমিল

অভিযোগ প্রসঙ্গে এসআই জাহাঙ্গীর আলম দাবি করেন,
“উদ্ধার করা টাকা ও স্বর্ণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।”

কিন্তু এই দাবির সঙ্গে সরকারি নথিপত্রের কোনো মিল পাওয়া যায়নি বলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।

বগুড়া আদালত পুলিশের জেনারেল রেকর্ড অফিসার (জিআরও) সুশান্ত কুমার বলেন,
“এসআই জাহাঙ্গীর আলম জিডি মূলে আদালতে কোনো টাকা বা স্বর্ণ জমা দেননি।”

একই বক্তব্য দেয় সদর থানার একটি বিশ্বস্ত সূত্রও। তারা জানায়, এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কোনো জিডি থানায় নথিভুক্ত করা হয়নি।

জিডিতে নেই অর্থ ও স্বর্ণের কোনো উল্লেখ

থানা সূত্রে জানা গেছে, লাশ উদ্ধারের দিন ৬ ডিসেম্বর রাত ১১টা ২৫ মিনিটে এসআই জাহাঙ্গীর আলম ৫৫৭ নম্বর একটি জিডি করেন। ওই জিডিতে কেবল ‘অপমৃত্যু মামলা’র তথ্য রয়েছে।

উদ্ধার করা অর্থ বা স্বর্ণালংকারের বিষয়ে সেখানে কোনো উল্লেখ নেই। এমনকি ২৪ ডিসেম্বর বিকেল পর্যন্ত জিডিটি অনলাইনেও আপলোড করা হয়নি বলে জানা গেছে।

জব্দ তালিকা না থাকার অভিযোগ

বাড়ির মালিক শাজাহান আলী ও তার স্ত্রী শামিমা বেগম অভিযোগ করে বলেন,
“লাশ মর্গে পাঠানোর পর আমাদের সামনে ঘর তল্লাশি করে টাকা ও স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু কোনো জব্দ তালিকা করা হয়নি, আমাদের স্বাক্ষরও নেওয়া হয়নি।”

আইন অনুযায়ী, কোনো মালামাল উদ্ধার হলে জব্দ তালিকা প্রস্তুত ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর গ্রহণ বাধ্যতামূলক। এ ঘটনায় সেই আইনি প্রক্রিয়া মানা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

দাফনের আগে অর্থ দাবির অভিযোগ

বাড়ির মালিক দম্পতির আরও অভিযোগ, ঘটনার দুই দিন পর তাদের স্টেডিয়াম পুলিশ ফাঁড়িতে ডেকে নিয়ে বলা হয়—
“লাশ দাফনের দায়িত্ব নিতে হলে উদ্ধারকৃত টাকার মধ্য থেকে ১০ হাজার টাকা দিতে হবে।”

টাকা না দেওয়ায় পুলিশ দাফনের দায়িত্ব নেয়নি বলে তারা অভিযোগ করেন। পরে মানবিক সংগঠন আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম মরদেহের দাফন সম্পন্ন করে।

আরেক ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ

এর আগে ২০ ডিসেম্বর রাতে স্টেডিয়াম ফাঁড়ির এসআই জাহাঙ্গীর আলম ও সদর থানার ওসি কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে আরেকটি ঘটনায় গুরুতর অভিযোগ ওঠে।

ভুক্তভোগী মোছা. আলো বেগম জানান, আদালতে মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই পুলিশি হুমকির মাধ্যমে তাকে ও তার মেয়েকে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

তিনি বলেন,
“এই ঘটনায় আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। আত্মহত্যার কথাও মাথায় এসেছে। আমার কোনো অঘটন ঘটলে এর দায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের।”

জনমত ও প্রতিক্রিয়া

ঘটনাগুলো ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বগুড়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এরশাদুল বারী বলেন,
“একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ পুরো প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা জরুরি।”

স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীরাও অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

প্রশ্ন থেকেই যায়

  • উদ্ধারকৃত অর্থ ও স্বর্ণ আদালতে জমা হয়ে থাকলে তার নথিভুক্ত প্রমাণ কোথায়?

  • জব্দ তালিকা ছাড়া কীভাবে মালামাল উদ্ধার করা হলো?

  • একাধিক অভিযোগের পরও কেন কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?

শেষ কথা

একজন মৃত দরিদ্র নারীর শেষ সম্বল ঘিরে ওঠা এই অভিযোগ শুধু একটি ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন—এই নীতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা এখন নিরপেক্ষ তদন্তের ওপরই নির্ভর করছে।

অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে জনস্বার্থে তা প্রকাশ করা হবে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ