ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

নেতৃত্ব ও লড়াইয়ের ৪১ বছর: খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অধ্যায়



নেতৃত্ব ও লড়াইয়ের ৪১ বছর: খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অধ্যায়
বেগম খালেদা জিয়া

বাংলাদেশের আধুনিক রাজনীতির এক দীর্ঘ অধ্যায় আজ বন্ধ হয়ে গেল। জাতীয় রাজনীতির প্রবল নেত্রী, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি-র দীর্ঘ দিনের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মঙ্গলবার সকাল ৬টা নাগাদ রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ৮০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন, স্বামী ও রাজনৈতিক সংগঠন বিএনপি-র যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। 

খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে যাত্রা শুরু হয় ১৯৮১ সালে তার স্বামী জিয়াউর রহমানের হত্যার পর, যখন তিনি গৃহবধূত্ব থেকে বেরিয়ে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব নেন। ১৯৮৪ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপি-র চেয়ারম্যান হন এবং টানা ৪১ বছর দলের শীর্ষ পদে থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিকে নির্দিষ্ট রূপ দিয়েছেন। 

খালেদা জিয়া দুই আলাদা মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন — ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত। প্রথমবারের মতো নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দেশের সংবিধান পরিবর্তন, পার্লামেন্টারি ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া এবং শিক্ষা ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। 

তবে তার শাসনামল সমালোচনা ও বিতর্কময় পরিস্থিতিতে কাটে। বিরোধীরা অভিযোগ করেন তার শাসনামলে দুর্নীতি, রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৪ সালে ঢাকা কয়েকটি বড় হামলার ঘটনায় তার সরকারের গুরুত্ব কমেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো নোট করেছে। 

রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ সময়জুড়ে খালেদা জিয়ার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দ্বৈরথ ছিলো শেখ হাসিনার সঙ্গে — বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেত্রী। তাঁরা দুই মেগা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে জাতীয় রাজনীতিকে দুই মেরুতে ভাগ করে রেখেছিলেন, এবং তাদের টানাপোড়েন প্রায় তিন দশক ধরে গণতন্ত্র, নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছিল। 

২০০৭-০৮ সালে দেশ যখন সামরিক সমর্থিত নির্বাহী সরকারের অধীনে থাকলো, তখন খালেদা জিয়া সহ রাজনৈতিক নেতারা কিছু সময়ের জন্য কারাগারে ছিলেন এবং ২০১৮ সালের দুর্নীতি মামলাও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক সৃষ্টি করে। সম্প্রতি ২০২৫-এর জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট তাকে সমাপনী মামলায় অব্যাহতি দিয়েছে, যা তার রাজনৈতিক অবস্থানকে কিছুটা পুনরুত্থান করেছিল। 

স্বাস্থ্যগত কারণে তিনি দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং ২০২৫ সালের মধ্যেই একবার বিদেশে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন। মে ২০২৫-তে তিনি দেশে ফিরে আসেন, যা দেশের রাজনীতি ও নির্বাচনের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, বিশেষত কারণ আইনি বাধা না থাকায় তিনি ২০২৬ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে নাম লেখাতে পারতেন। 

খালেদা জিয়ার ধারাবাহিক নেতৃত্বে বিএনপি বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আন্দোলন, নির্বাচন বর্জন ও রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে দল রাজনীতিতে সক্রিয় উপস্থিতি বজায় রেখেছে। তার নেতৃত্বে দলের লাখো নেতাকর্মী অনুপ্রাণিত হয়েছে, যদিও সমালোচকদের কাছে তিনি ছিলেন কঠোর নীতির এক নেত্রী।

তার মৃত্যু দেশজুড়ে রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা এবং তিনদিনের রাজনীতিক শোক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতারা তাকে গণতন্ত্র ও জাতীয় রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক» হিসেবে অভিহিত করছেন, যদিও তার রাজনৈতিক দর্শন ও সিদ্ধান্তসমূহ নিয়ে নানা সমালোচনা ও বিশ্লেষণও অব্যাহত থাকবে। 


খালেদা জিয়ার ৪১ বছর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিরোধ, আন্দোলন ও ক্ষমতার সংঘাত—সবকিছুরই প্রমাণ হিসেবেই বিবেচিত হবে। তার মৃত্যু কেবল ব্যক্তিগত বিরাম নয়, বরং একটি যুগের সমাপ্তি, যা আগামী নির্বাচনে ও রাজনৈতিক ভূত্বকে নতুন নাটক ও পুনরায় শক্তির পুনর্বিন্যাসের সূচনা করতে পারে। 

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


নেতৃত্ব ও লড়াইয়ের ৪১ বছর: খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অধ্যায়

প্রকাশের তারিখ : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

featured Image

বাংলাদেশের আধুনিক রাজনীতির এক দীর্ঘ অধ্যায় আজ বন্ধ হয়ে গেল। জাতীয় রাজনীতির প্রবল নেত্রী, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি-র দীর্ঘ দিনের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মঙ্গলবার সকাল ৬টা নাগাদ রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ৮০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন, স্বামী ও রাজনৈতিক সংগঠন বিএনপি-র যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। 

খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে যাত্রা শুরু হয় ১৯৮১ সালে তার স্বামী জিয়াউর রহমানের হত্যার পর, যখন তিনি গৃহবধূত্ব থেকে বেরিয়ে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব নেন। ১৯৮৪ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপি-র চেয়ারম্যান হন এবং টানা ৪১ বছর দলের শীর্ষ পদে থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিকে নির্দিষ্ট রূপ দিয়েছেন। 

খালেদা জিয়া দুই আলাদা মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন — ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত। প্রথমবারের মতো নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দেশের সংবিধান পরিবর্তন, পার্লামেন্টারি ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া এবং শিক্ষা ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। 

তবে তার শাসনামল সমালোচনা ও বিতর্কময় পরিস্থিতিতে কাটে। বিরোধীরা অভিযোগ করেন তার শাসনামলে দুর্নীতি, রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৪ সালে ঢাকা কয়েকটি বড় হামলার ঘটনায় তার সরকারের গুরুত্ব কমেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো নোট করেছে। 

রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ সময়জুড়ে খালেদা জিয়ার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দ্বৈরথ ছিলো শেখ হাসিনার সঙ্গে — বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেত্রী। তাঁরা দুই মেগা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে জাতীয় রাজনীতিকে দুই মেরুতে ভাগ করে রেখেছিলেন, এবং তাদের টানাপোড়েন প্রায় তিন দশক ধরে গণতন্ত্র, নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছিল। 

২০০৭-০৮ সালে দেশ যখন সামরিক সমর্থিত নির্বাহী সরকারের অধীনে থাকলো, তখন খালেদা জিয়া সহ রাজনৈতিক নেতারা কিছু সময়ের জন্য কারাগারে ছিলেন এবং ২০১৮ সালের দুর্নীতি মামলাও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক সৃষ্টি করে। সম্প্রতি ২০২৫-এর জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট তাকে সমাপনী মামলায় অব্যাহতি দিয়েছে, যা তার রাজনৈতিক অবস্থানকে কিছুটা পুনরুত্থান করেছিল। 

স্বাস্থ্যগত কারণে তিনি দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং ২০২৫ সালের মধ্যেই একবার বিদেশে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন। মে ২০২৫-তে তিনি দেশে ফিরে আসেন, যা দেশের রাজনীতি ও নির্বাচনের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, বিশেষত কারণ আইনি বাধা না থাকায় তিনি ২০২৬ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে নাম লেখাতে পারতেন। 

খালেদা জিয়ার ধারাবাহিক নেতৃত্বে বিএনপি বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আন্দোলন, নির্বাচন বর্জন ও রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে দল রাজনীতিতে সক্রিয় উপস্থিতি বজায় রেখেছে। তার নেতৃত্বে দলের লাখো নেতাকর্মী অনুপ্রাণিত হয়েছে, যদিও সমালোচকদের কাছে তিনি ছিলেন কঠোর নীতির এক নেত্রী।

তার মৃত্যু দেশজুড়ে রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা এবং তিনদিনের রাজনীতিক শোক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতারা তাকে গণতন্ত্র ও জাতীয় রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক» হিসেবে অভিহিত করছেন, যদিও তার রাজনৈতিক দর্শন ও সিদ্ধান্তসমূহ নিয়ে নানা সমালোচনা ও বিশ্লেষণও অব্যাহত থাকবে। 


খালেদা জিয়ার ৪১ বছর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিরোধ, আন্দোলন ও ক্ষমতার সংঘাত—সবকিছুরই প্রমাণ হিসেবেই বিবেচিত হবে। তার মৃত্যু কেবল ব্যক্তিগত বিরাম নয়, বরং একটি যুগের সমাপ্তি, যা আগামী নির্বাচনে ও রাজনৈতিক ভূত্বকে নতুন নাটক ও পুনরায় শক্তির পুনর্বিন্যাসের সূচনা করতে পারে। 


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ