২০২৫ সালটি আন্তর্জাতিক ইসলামিক অঙ্গনের জন্য ছিল এক শোকভারাক্রান্ত বছর। বিশ্বজুড়ে এমন বহু আলেম এ বছর মৃত্যুবরণ করেছেন, যাদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, নেতৃত্ব ও দাওয়াহ কার্যক্রম মুসলিম উম্মাহর চিন্তাধারাকে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবিত করে এসেছে। ধর্মীয় নির্দেশনা, ফিকহ, হাদিস, আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব, সামাজিক উন্নয়ন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের অবদান ছিল গভীর ও সুদূরপ্রসারী। তাদের মৃত্যু শুধু একটি দেশে নয়, পুরো মুসলিম বিশ্বে অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করেছে।
বছরটি শুরু হয় বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী আধ্যাত্মিক নেতা আগা খান চতুর্থের মৃত্যুতে। তিনি ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন, বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। ইসমায়িলি মুসলিম বিশ্বের এই আধ্যাত্মিক নেতা শুধু ধর্মীয় আদর্শ প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি ও মানবিক উন্নয়নকে কেন্দ্র করে যে নেটওয়ার্ক তিনি গড়ে তুলেছিলেন, তা বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবকল্যাণে উদাহরণ সৃষ্টি করে। আগা খান ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের কাজ তাকে মানবতার অন্যতম দিশারী করে তুলেছিল। তার মৃত্যু আন্তর্জাতিক উন্নয়নক্ষেত্র এবং মুসলিম বিশ্বের জন্য ছিল এক গভীর আঘাত।
এরপর মার্চে মুসলিম বিশ্বের শোককে আরও গভীর করে মিশরের প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ ও ইসলামী বক্তা আবু ইসহাক আল-হুয়াইনির মৃত্যু সংবাদ। ১৭ মার্চ ২০২৫ সালে কাতারে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, বয়স হয়েছিল প্রায় ৬৮ বছর। হাদিস গবেষণায় তার দক্ষতা, বক্তৃতায় প্রাঞ্জলতা এবং সাধারণ মানুষকে ইসলামের মূল উৎসের দিকে ফিরিয়ে আনার আহ্বান তাকে বৈশ্বিক ইসলামী অঙ্গনে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে। আরব বিশ্বে সালাফি ধারার অন্যতম বিশিষ্ট মুফাসসির ও হাদিস বিশ্লেষক হিসেবে তার পরিচিতি দীর্ঘদিন ধরে অটুট ছিল। তার মৃত্যুতে মিশরসহ গোটা আরব বিশ্বে শোকের ছায়া নেমে আসে।
বছরের মাঝামাঝি এসে জুন–জুলাই সময়ে মুসলিম বিশ্ব আবার শোকাহত হয় সালাফি বিশ্বের অন্যতম বিতর্কিত হলেও অত্যন্ত প্রভাবশালী আলেম রাবি’ আল-মাদখালির মৃত্যুতে। তিনি ৯ জুলাই ২০২৫ সালে মদিনায় ইন্তেকাল করেন, বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। আধুনিক সালাফি চিন্তাধারার একটি স্বতন্ত্র শাখা—মদখালিজম—প্রতিষ্ঠায় তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ধর্মীয় কর্তৃত্ব, সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার বিপক্ষে কঠোর অবস্থান তার মতাদর্শকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। বহু দেশেই তার অনুসারীরা ধর্মীয় আলোচনায় প্রভাবশালী ভূমিকা রাখে। তার মৃত্যু সালাফি জগতের বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করে।
বছরটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মৃত্যু ছিল সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি শেইখ আব্দুলআজিজ বিন আব্দুল্লাহ আল-শেইখের। তিনি ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে রিয়াদে মারা যান, বয়স হয়েছিল প্রায় ৮২ বছর। ১৯৯৯ সাল থেকে তিনি সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালন করছিলেন। ইসলামী গবেষণা, ফতোয়া প্রদান, ফিকহীয় জটিলতা নিরসন এবং সমসাময়িক বিষয়গুলোতে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরায় তার ভূমিকা ছিল অসাধারণ। বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ তাকে এক নির্ভরযোগ্য ধর্মীয় কণ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করেছে দীর্ঘদিন। তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংবাদমাধ্যমগুলো গভীর শোকবার্তা প্রকাশ করে।
বাংলাদেশেও ২০২৫ সালের শোকের তালিকায় যুক্ত হয় দেশের কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার অন্যতম প্রধান সংগঠক হাফেজ আহমদুল্লাহর মৃত্যু। তিনি ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন, বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি আঞ্জুমান-ইত্তিহাদুল মাদারিসের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে কওমি শিক্ষা কাঠামোর একাধিক সংস্কার ও উন্নয়ন কাজ পরিচালনা করেন। দেশের ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য, এবং তার মৃত্যুতে দেশের ইসলামি শিক্ষা অঙ্গন গভীর শোকে ভরে ওঠে।
২০২৫ সালের এই মৃত্যুসমূহ দেখিয়ে দিয়েছে—মুসলিম উম্মাহ কত দ্রুত একের পর এক জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বকে হারাচ্ছে। তাদের চিন্তা, শিক্ষা, বক্তৃতা, দাওয়াহ ও কাজের ধরন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে ইসলামী জ্ঞানচর্চার নতুন পথ তৈরি করেছিল। তারা না থাকলেও তাদের রেখে যাওয়া গ্রন্থ, বক্তব্য ও প্রতিষ্ঠান বিশ্ব মুসলিম সমাজকে পথ দেখিয়ে যাবে আরও বহু বছর।
আপনার মতামত লিখুন