ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি ৪২ জনের মৃত্যু' ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়' দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩১৪ জন রোগী। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে মোট ১২১ জনের। এরমধ্যে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ৭ দিনেই প্রাণ গেছে ২৪ জন। সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রকাশিত নিয়মিত ডেঙ্গুবিষয়ক বুলেটিনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ৩১৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৪ জন। এ নিয়ে চলতি বছরে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৯০৪ জনে। অন্যদিকে, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পর সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন মোট ৪০ হাজার ৭০৯ জন রোগী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকায় দেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও ক্রমশ বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং জমে থাকা পানি অপসারণসহ জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঘরবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় পানি জমতে না দেওয়া এবং জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ডেঙ্গুর ভয়াবহ ছোবলে ফের উদ্বেগের মুখে দেশ। প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা। সেই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুও। ফলে ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ নিয়ে স্বাস্থ্য খাতে নতুন করে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বরের শুরুতেই আক্রান্ত ও মৃত্যুর যে গতি দেখা যাচ্ছে, তাতে আগামী দিনগুলোতে ডেঙ্গু আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এডিস মশার বিস্তার, বর্ষা-পরবর্তী অনুকূল পরিবেশ এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় একযোগে রোগী বাড়তে থাকায় পরিস্থিতিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
হামের পর এবার ডেঙ্গুর প্রকোপে বিপর্যস্ত ময়মনসিংহ নগরী। ঘরে ঘরে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলা হলেও রোগীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে, ওয়ার্ডের ভেতরে তো নয়ই, বারান্দা কিংবা হাসপাতালের বাইরেও মিলছে না জায়গা। চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক-নার্সরা। অন্যদিকে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ-হতাশা। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, ডেঙ্গু এখন আর শুধু একটি মৌসুমি রোগ হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। বছরের শুরু থেকেই আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তবে বর্ষা মৌসুমের শেষভাগে এসে সংক্রমণের গতি আরও বেড়েছে। বিশেষ করে গত ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ডসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে, সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে?
চলতি বছরও ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়। এ এলাকায় এখন পর্যন্ত ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। রাজধানীতে ঘনবসতি, নির্মাণাধীন ভবন, জমে থাকা পানি, বিভিন্ন স্থাপনার আশপাশে পানি জমে থাকা এবং মশার প্রজননস্থল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। এসব জায়গায় নিয়মিত অভিযান ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। গতকাল থেকে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোর কদমে শুরু করেছে।
ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তারে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর কপালেও এখন স্বাভাবিকভাবেই চিন্তার ভাঁজ। কারণ শুধু রাজধানীতে নয়, দেশের বিভিন্ন বিভাগে একযোগে রোগী বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ সামলানোর পাশাপাশি ডেঙ্গুর উৎস এডিস মশা নিয়ন্ত্রণেও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আগেই কার্যকর ব্যবস্থা জোরদার করার তাগিদ বাড়ছে। ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে সমানতালে ডেঙ্গুসহ নানা রকমের জ্বরাক্রান্ত হচ্ছে সব বয়সী মানুষ। এর মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই বেশি। এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত যথাসময়ে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন না করলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন। অক্টোবরের আগেই সবাইকে সতর্ক ও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাঠপর্যায়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও সচেতনতা তৈরিতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হবে।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকরভাবে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার এবং হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি বাড়ানো না গেলে সামনে রোগীর চাপ আরও বাড়তে পারে। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন শত শত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। রাজধানীর পাশাপাশি খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গুর বিস্তার পরিস্থিতির ব্যাপ্তি আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী ভর্তির হিসাবে সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা বিভাগ (মহানগরীসহ)। এ বিভাগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৫৭ জন। এরপরই রয়েছে খুলনা বিভাগ। সেখানে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ৩৩৪ জন। চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬৯ জন, বরিশালে ১৩৭ জন, রাজশাহীতে ১১২ জন, ময়মনসিংহে ৮৪ জন, রংপুরে ৫৬ জন এবং সিলেট বিভাগে ৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অর্থাৎ রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য বিভাগেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের কাছে এ বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের। কারণ, ডেঙ্গু যখন একই সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় হয়ে ওঠে, তখন রোগী ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোর ওপরও চাপ বাড়ছে। ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে অনেকেই জটিল অবস্থায় হাসপাতালে আসায় চিকিৎসকদের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সময়ে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ।
স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু হাসপাতাল বাড়িয়ে বা শয্যা বাড়িয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। রোগীর সংখ্যা কমাতে হলে ডেঙ্গুর মূল বাহক এডিস মশার বিস্তার রোধ করতে হবে। এজন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাসাবাড়ির ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র, ফুলের টব, ড্রাম, বালতি কিংবা যেকোনো স্থানে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। তাই শুধু সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রমের ওপর নির্ভর না করে ব্যক্তি পর্যায়েও সতর্কতা বাড়াতে হবে।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, আক্রান্তের সংখ্যা যখন এক দিনে দেড় হাজার ছাড়িয়ে গেছে, তখন পরিস্থিতিকে সতর্কতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া প্রয়োজন। রোগী শনাক্তকরণ, দ্রুত চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, হাসপাতালের শয্যা প্রস্তুত রাখা এবং মৃত্যুঝুঁকিতে থাকা রোগীদের জন্য নিবিড় চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে সামনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েই চলেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় (৬ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে ৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩১৪ জন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২১ জনে। একই সময়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা হয়েছে ৪৩ হাজার ৯০৪ জন। নতুন রোগীদের মধ্যে খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ ২৩৫ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশন ছাড়া) ২২৫ জন এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ১৯৮ জন ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া বরিশালে ১৫৩, রাজশাহীতে ৯৯, ময়মনসিংহে ৮১, রংপুরে ৩৬ এবং সিলেটে পাঁচজন ভর্তি হয়েছেন। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন মোট ৩৯,৪৭৯ জন।

সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি ৪২ জনের মৃত্যু' ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়' দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩১৪ জন রোগী। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে মোট ১২১ জনের। এরমধ্যে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ৭ দিনেই প্রাণ গেছে ২৪ জন। সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রকাশিত নিয়মিত ডেঙ্গুবিষয়ক বুলেটিনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ৩১৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৪ জন। এ নিয়ে চলতি বছরে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৯০৪ জনে। অন্যদিকে, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পর সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন মোট ৪০ হাজার ৭০৯ জন রোগী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকায় দেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও ক্রমশ বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং জমে থাকা পানি অপসারণসহ জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঘরবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় পানি জমতে না দেওয়া এবং জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ডেঙ্গুর ভয়াবহ ছোবলে ফের উদ্বেগের মুখে দেশ। প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা। সেই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুও। ফলে ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ নিয়ে স্বাস্থ্য খাতে নতুন করে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বরের শুরুতেই আক্রান্ত ও মৃত্যুর যে গতি দেখা যাচ্ছে, তাতে আগামী দিনগুলোতে ডেঙ্গু আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এডিস মশার বিস্তার, বর্ষা-পরবর্তী অনুকূল পরিবেশ এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় একযোগে রোগী বাড়তে থাকায় পরিস্থিতিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
হামের পর এবার ডেঙ্গুর প্রকোপে বিপর্যস্ত ময়মনসিংহ নগরী। ঘরে ঘরে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলা হলেও রোগীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে, ওয়ার্ডের ভেতরে তো নয়ই, বারান্দা কিংবা হাসপাতালের বাইরেও মিলছে না জায়গা। চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক-নার্সরা। অন্যদিকে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ-হতাশা। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, ডেঙ্গু এখন আর শুধু একটি মৌসুমি রোগ হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। বছরের শুরু থেকেই আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তবে বর্ষা মৌসুমের শেষভাগে এসে সংক্রমণের গতি আরও বেড়েছে। বিশেষ করে গত ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ডসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে, সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে?
চলতি বছরও ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়। এ এলাকায় এখন পর্যন্ত ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। রাজধানীতে ঘনবসতি, নির্মাণাধীন ভবন, জমে থাকা পানি, বিভিন্ন স্থাপনার আশপাশে পানি জমে থাকা এবং মশার প্রজননস্থল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। এসব জায়গায় নিয়মিত অভিযান ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। গতকাল থেকে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোর কদমে শুরু করেছে।
ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তারে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর কপালেও এখন স্বাভাবিকভাবেই চিন্তার ভাঁজ। কারণ শুধু রাজধানীতে নয়, দেশের বিভিন্ন বিভাগে একযোগে রোগী বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ সামলানোর পাশাপাশি ডেঙ্গুর উৎস এডিস মশা নিয়ন্ত্রণেও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আগেই কার্যকর ব্যবস্থা জোরদার করার তাগিদ বাড়ছে। ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে সমানতালে ডেঙ্গুসহ নানা রকমের জ্বরাক্রান্ত হচ্ছে সব বয়সী মানুষ। এর মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই বেশি। এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত যথাসময়ে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন না করলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন। অক্টোবরের আগেই সবাইকে সতর্ক ও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাঠপর্যায়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও সচেতনতা তৈরিতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হবে।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকরভাবে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার এবং হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি বাড়ানো না গেলে সামনে রোগীর চাপ আরও বাড়তে পারে। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন শত শত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। রাজধানীর পাশাপাশি খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গুর বিস্তার পরিস্থিতির ব্যাপ্তি আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী ভর্তির হিসাবে সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা বিভাগ (মহানগরীসহ)। এ বিভাগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৫৭ জন। এরপরই রয়েছে খুলনা বিভাগ। সেখানে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ৩৩৪ জন। চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬৯ জন, বরিশালে ১৩৭ জন, রাজশাহীতে ১১২ জন, ময়মনসিংহে ৮৪ জন, রংপুরে ৫৬ জন এবং সিলেট বিভাগে ৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অর্থাৎ রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য বিভাগেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের কাছে এ বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের। কারণ, ডেঙ্গু যখন একই সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় হয়ে ওঠে, তখন রোগী ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোর ওপরও চাপ বাড়ছে। ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে অনেকেই জটিল অবস্থায় হাসপাতালে আসায় চিকিৎসকদের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সময়ে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ।
স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু হাসপাতাল বাড়িয়ে বা শয্যা বাড়িয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। রোগীর সংখ্যা কমাতে হলে ডেঙ্গুর মূল বাহক এডিস মশার বিস্তার রোধ করতে হবে। এজন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাসাবাড়ির ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র, ফুলের টব, ড্রাম, বালতি কিংবা যেকোনো স্থানে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। তাই শুধু সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রমের ওপর নির্ভর না করে ব্যক্তি পর্যায়েও সতর্কতা বাড়াতে হবে।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, আক্রান্তের সংখ্যা যখন এক দিনে দেড় হাজার ছাড়িয়ে গেছে, তখন পরিস্থিতিকে সতর্কতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া প্রয়োজন। রোগী শনাক্তকরণ, দ্রুত চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, হাসপাতালের শয্যা প্রস্তুত রাখা এবং মৃত্যুঝুঁকিতে থাকা রোগীদের জন্য নিবিড় চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে সামনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েই চলেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় (৬ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে ৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩১৪ জন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২১ জনে। একই সময়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা হয়েছে ৪৩ হাজার ৯০৪ জন। নতুন রোগীদের মধ্যে খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ ২৩৫ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশন ছাড়া) ২২৫ জন এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ১৯৮ জন ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া বরিশালে ১৫৩, রাজশাহীতে ৯৯, ময়মনসিংহে ৮১, রংপুরে ৩৬ এবং সিলেটে পাঁচজন ভর্তি হয়েছেন। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন মোট ৩৯,৪৭৯ জন।

আপনার মতামত লিখুন