ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

২১ মাসের বেতন বকেয়া রেখেই ১২ শিক্ষককে ছাঁটাই: হোসেনপুর সরকারি মডেল পাইলট স্কুলে হাহাকার, দিশেহারা পরিবার।


সৈয়দ মইনুল হোসেন
সৈয়দ মইনুল হোসেন
প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০২৬

২১ মাসের বেতন বকেয়া রেখেই ১২ শিক্ষককে ছাঁটাই: হোসেনপুর সরকারি মডেল পাইলট স্কুলে হাহাকার, দিশেহারা পরিবার।
২১ মাসের বেতন বকেয়া রেখেই ১২ শিক্ষককে চাকরিচ্যুত।

রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে যে শিক্ষকরা দিনের পর দিন ক্লাসরুমে আলো ছড়িয়েছেন, তাঁদের জীবন আজ ঘোর অমানিশায় আচ্ছন্ন। শ্রেণিকক্ষে যাঁর মুখে ফুটে উঠত সততা ও আদর্শের পাঠ, আজ বকেয়া বেতনের জন্য তিনি নিজেই দ্বারস্থ হচ্ছেন কর্তৃপক্ষের। কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী হোসেনপুর সরকারি মডেল পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজে ঘটেছে এমন এক মর্মান্তিক ও বিতর্কিত ঘটনা। বকেয়া থাকা দীর্ঘ ২১ মাসের বেতন পরিশোধ না করেই চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির ১২ জন খণ্ডকালীন শিক্ষককে। বছরের পর বছর ধরে ঘাম ঝরানো সেবার প্রতিদান মিলল শূন্য হাতে অবহেলা আর ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে। ​দীর্ঘদিন ধরে বেতন না পেয়ে ধার-দেনা করে পরিবার চালানো এই শিক্ষকেরা এখন সম্পূর্ণ দিশেহারা। বকেয়া পাওনা আদায় এবং এই অন্যায়ের বিচার চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তাঁরা। অন্যদিকে প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের দায় ঠেলাঠেলিতে ঝুলে রয়েছে ১২টি অসচ্ছল পরিবারের ভবিষ্যৎ।

কিশোরগঞ্জের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ হোসেনপুর মডেল পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজটি ২০১৮ সালে সরকারিকরণ করা হয়। সরকারি ঘোষণার পর প্রতিষ্ঠানের পরিধি বৃদ্ধি পেলেও পর্যায়ক্রমে অবসরজনিত কারণে এবং বিভিন্ন শূন্য পদে নিয়মিত শিক্ষকের অভাব দেখা দেয়। শিক্ষার্থীদের পঠন-পাঠন সচল রাখতে কর্তৃপক্ষ সরকারি নিয়ম মেনেই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অস্থায়ী ভিত্তিতে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দেয়। ​কলেজ শাখা, দিবা শাখা এবং প্রভাতী শাখায় এই শিক্ষকেরা সুনামের সাথে শিক্ষকতা করে আসছিলেন। বর্তমানে চাকরিচ্যুত ১২ জন শিক্ষকের মধ্যে কলেজ শাখায় ২ জন, দিবা শাখায় ৫ জন এবং প্রভাতী শাখায় ৫ জন কর্মরত ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটিকে আলোর মুখ দেখাতে এবং সরকারি মানদণ্ড বজায় রাখতে এই খণ্ডকালীন শিক্ষকেরা নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করতেন।

ভুক্তভোগী শিক্ষকদের ভাষ্যমতে, নিয়োগের শুরুর দিকে তাঁদের বেতন ব্যবস্থা তুলনামূলক স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে পরিচালনা পর্ষদ ও অর্থ বিভাগের চরম অনিয়ম প্রকাশ পেতে থাকে। শুরু হয় বেতন ঝুলিয়ে রাখার সংস্কৃতি। দুই মাস, তিন মাস পরপর কোনোমতে এক মাসের বেতন দেওয়া হতো। এভাবেই জমতে জমতে বকেয়া বেতনের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় পাহাড়সম—এক টানা ২১ মাস! ​চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত দীর্ঘ ২১টি মাস বেতন না পেয়েও শিক্ষার্থীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই তাগিদে শিক্ষকেরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। আশা ছিল, সরকারি সহায়তায় কিংবা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ফান্ড থেকে একদিন তাঁদের এই হাড়ভাঙা খাটুনির মূল্য বুঝিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু পাওনা মেটানোর পরিবর্তে তাঁদের ওপর নেমে এলো ছাঁটাইয়ের খড়্গ।

অভিযোগ উঠেছে, গত ১৭ ও ১৮ আগস্ট প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. খায়রুল ইসলাম একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের অজুহাত দেখিয়ে ওই ১২ জন খণ্ডকালীন শিক্ষককে একযোগে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেন। আকস্মিক এই সিদ্ধান্তের খবর শুনে হতবাক হয়ে পড়েন শিক্ষকেরা। ​চাকরিচ্যুত করার প্রক্রিয়ায় কোনো আগাম নোটিশ কিংবা পাওনা টাকা পরিশোধের ন্যূনতম আশ্বাস দেওয়া হয়নি। দীর্ঘ ২১ মাসের উপার্জিত অর্থ বকেয়া রেখে এভাবে শিক্ষকদের বের করে দেওয়ার ঘটনাকে শিক্ষক সমাজ ও স্থানীয় সচেতন মহল চরম অমানবিক ও বেআইনি বলে আখ্যা দিয়েছেন। যে সমাজে শিক্ষককে দেওয়া হয় সর্বোচ্চ সম্মান, সেখানে এই ১২ জন শিক্ষক আজ টিকে থাকার লড়াইয়ে চরম অপমান ও কষ্টের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছেন। দীর্ঘ ২১ মাস বেতন না পাওয়ায় অনেকেই দৈনন্দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা, সন্তানদের স্কুলের ফি, বয়োবৃদ্ধ মা-বাবার ওষুধ ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পারছেন না। ​অনেক শিক্ষক লোকলজ্জা ভুলে আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের কাছ থেকে ধার-দেনা করে সংসার চালাচ্ছিলেন এই আশায় যে, এককালীন বকেয়া টাকা পেলে ঋণ শোধ করবেন। কিন্তু এক লহমায় চাকরি হারিয়ে এবং বকেয়া টাকা না পেয়ে তাঁদের জীবনের গল্প এখন করুণ ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে। অশ্রুসিক্ত চোখে চাকরিচ্যুত খণ্ডকালীন শিক্ষক ওবায়দুর রহমান তাঁর ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ​“বেতন বকেয়া রেখে কোনো চাকরিজীবীকে এভাবে এক রাতের সিদ্ধান্তে চাকরিচ্যুত করার কোনো আইনি বিধান আছে বলে আমাদের জানা নেই। শ্রম ও সেবার ন্যূনতম মূল্য না দিয়ে যদি বের করে দেওয়া হয়, তবে এর দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কীভাবে এড়াবে? আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বমুখী নজরদারি ও মানবিক হস্তক্ষেপ প্রার্থনা করছি।” 


পুরো ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দায়িত্বহীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বকেয়া বেতন ও চাকরিচ্যুতির বিষয়ে হোসেনপুর সরকারি মডেল পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. খায়রুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দায় নেওয়ার বদলে পূর্বসূরিদের দিকে আঙুল তোলেন। ​তিনি জানান, তিনি চলতি বছরের ৪ মার্চ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাই শিক্ষকদের এই ২১ মাসের বকেয়া তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বের সময়ের। তবে তাঁর মেয়াদের বেতনের বিষয়ে তিনি দাবি করেন যে, আগামী ৩১ জানুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে তা পরিশোধের কথা দেওয়া হয়েছে। ​তবে প্রতিষ্ঠানের বকেয়া পরিশোধের আর্থিক উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ জানান, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) অর্থ ও নিরীক্ষা শাখার পরিচালক মশিউর রহমানের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়েছে। মাউশি পরিচালক পরামর্শ দিয়েছেন যে, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ফান্ড থেকে আপাতত এই বকেয়া টাকা পরিশোধ করা যেতে পারে এবং ভবিষ্যতে তহবিলের অর্থ থেকে তা সমন্বয় করা সম্ভব। ​প্রশাসনের এমন মন্থর গতি এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির কারণে ক্ষোভ আরও ঘনীভূত হচ্ছে, কারণ অনাহার ও ঋণে জর্জরিত শিক্ষকদের জন্য ২০২৭ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা সম্পূর্ণ অসম্ভব।

এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জের জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শামছুন নাহার মাকছুদার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি জানান, সাংবাদিকদের মাধ্যমেই তিনি প্রথম বিষয়টি জানতে পেরেছেন। কখন নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, কত দিন তারা চাকরি করেছেন বা কীভাবে ছাঁটাই করা হলো—এর কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য তাঁর কাছে ছিল না। ​তবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের "আগের সময়ের দায়ভার না নেওয়ার" যুক্তিকে কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শামছুন নাহার মাকছুদা বলেন, ​“আগের সময় কি শিক্ষকেরা কাজ করেননি? বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কি তাঁদের সেবা দিতে দেখেননি? প্রতিষ্ঠানের বকেয়া থাকতেই পারে, কিন্তু পদে যিনি আসীন থাকবেন, প্রতিষ্ঠান পরিচালনার যাবতীয় দায়ভার ও বকেয়া মেটানোর দায়িত্ব তাঁকেই নিতে হবে। স্কুল ফান্ডে টাকা থাকলে চাকরিচ্যুত করার আগে বা পরে নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষকদের প্রাপ্য সর্বোচ্চ বকেয়া দ্রুত মিটিয়ে দেওয়া উচিত।”

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো পবিত্র জায়গায় এ ধরনের চরম অব্যবস্থাপনা ও অমানবিক আচরণে ক্ষুব্ধ স্থানীয় অভিভাবক ও সুশীল সমাজ। শিক্ষক ছাঁটাইয়ের এই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত পুরো হোসেনপুর উপজেলার শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ​ভুক্তভোগী শিক্ষক ও স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ দাবি করেছেন যে অবিলম্বে স্বনামধন্য এই সরকারি প্রতিষ্ঠানের ফান্ড থেকে ১২ জন শিক্ষকের ২১ মাসের বকেয়া বেতন সম্পূর্ণ পরিশোধ করতে হবে। তাছাড়া কোন্ নিয়মে বা কিসের ভিত্তিতে বকেয়া না মিটিয়ে শিক্ষকদের ছাঁটাই করা হলো, সে বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। এছাড়া অন্যায়ভাবে নেওয়া ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে শিক্ষকদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে।

​একদিকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে প্রান্তিক পর্যায়ের সরকারি স্কুলের শিক্ষকেরা ২১ মাস বেতন না পেয়ে বিনাদোষে চাকরি হারাচ্ছেন—এ যেন প্রদীপের নিচেই ঘোর অন্ধকার। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কি দ্রুত হস্তক্ষেপ করে এই ১২টি পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে এগিয়ে আসবে, নাকি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বলিকাঁঠে হারিয়ে যাবে শিক্ষকদের এই দীর্ঘশ্বাস।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


২১ মাসের বেতন বকেয়া রেখেই ১২ শিক্ষককে ছাঁটাই: হোসেনপুর সরকারি মডেল পাইলট স্কুলে হাহাকার, দিশেহারা পরিবার।

প্রকাশের তারিখ : ২১ আগস্ট ২০২৬

featured Image

রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে যে শিক্ষকরা দিনের পর দিন ক্লাসরুমে আলো ছড়িয়েছেন, তাঁদের জীবন আজ ঘোর অমানিশায় আচ্ছন্ন। শ্রেণিকক্ষে যাঁর মুখে ফুটে উঠত সততা ও আদর্শের পাঠ, আজ বকেয়া বেতনের জন্য তিনি নিজেই দ্বারস্থ হচ্ছেন কর্তৃপক্ষের। কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী হোসেনপুর সরকারি মডেল পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজে ঘটেছে এমন এক মর্মান্তিক ও বিতর্কিত ঘটনা। বকেয়া থাকা দীর্ঘ ২১ মাসের বেতন পরিশোধ না করেই চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির ১২ জন খণ্ডকালীন শিক্ষককে। বছরের পর বছর ধরে ঘাম ঝরানো সেবার প্রতিদান মিলল শূন্য হাতে অবহেলা আর ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে। ​দীর্ঘদিন ধরে বেতন না পেয়ে ধার-দেনা করে পরিবার চালানো এই শিক্ষকেরা এখন সম্পূর্ণ দিশেহারা। বকেয়া পাওনা আদায় এবং এই অন্যায়ের বিচার চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তাঁরা। অন্যদিকে প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের দায় ঠেলাঠেলিতে ঝুলে রয়েছে ১২টি অসচ্ছল পরিবারের ভবিষ্যৎ।


কিশোরগঞ্জের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ হোসেনপুর মডেল পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজটি ২০১৮ সালে সরকারিকরণ করা হয়। সরকারি ঘোষণার পর প্রতিষ্ঠানের পরিধি বৃদ্ধি পেলেও পর্যায়ক্রমে অবসরজনিত কারণে এবং বিভিন্ন শূন্য পদে নিয়মিত শিক্ষকের অভাব দেখা দেয়। শিক্ষার্থীদের পঠন-পাঠন সচল রাখতে কর্তৃপক্ষ সরকারি নিয়ম মেনেই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অস্থায়ী ভিত্তিতে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দেয়। ​কলেজ শাখা, দিবা শাখা এবং প্রভাতী শাখায় এই শিক্ষকেরা সুনামের সাথে শিক্ষকতা করে আসছিলেন। বর্তমানে চাকরিচ্যুত ১২ জন শিক্ষকের মধ্যে কলেজ শাখায় ২ জন, দিবা শাখায় ৫ জন এবং প্রভাতী শাখায় ৫ জন কর্মরত ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটিকে আলোর মুখ দেখাতে এবং সরকারি মানদণ্ড বজায় রাখতে এই খণ্ডকালীন শিক্ষকেরা নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করতেন।


ভুক্তভোগী শিক্ষকদের ভাষ্যমতে, নিয়োগের শুরুর দিকে তাঁদের বেতন ব্যবস্থা তুলনামূলক স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে পরিচালনা পর্ষদ ও অর্থ বিভাগের চরম অনিয়ম প্রকাশ পেতে থাকে। শুরু হয় বেতন ঝুলিয়ে রাখার সংস্কৃতি। দুই মাস, তিন মাস পরপর কোনোমতে এক মাসের বেতন দেওয়া হতো। এভাবেই জমতে জমতে বকেয়া বেতনের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় পাহাড়সম—এক টানা ২১ মাস! ​চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত দীর্ঘ ২১টি মাস বেতন না পেয়েও শিক্ষার্থীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই তাগিদে শিক্ষকেরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। আশা ছিল, সরকারি সহায়তায় কিংবা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ফান্ড থেকে একদিন তাঁদের এই হাড়ভাঙা খাটুনির মূল্য বুঝিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু পাওনা মেটানোর পরিবর্তে তাঁদের ওপর নেমে এলো ছাঁটাইয়ের খড়্গ।


অভিযোগ উঠেছে, গত ১৭ ও ১৮ আগস্ট প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. খায়রুল ইসলাম একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের অজুহাত দেখিয়ে ওই ১২ জন খণ্ডকালীন শিক্ষককে একযোগে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেন। আকস্মিক এই সিদ্ধান্তের খবর শুনে হতবাক হয়ে পড়েন শিক্ষকেরা। ​চাকরিচ্যুত করার প্রক্রিয়ায় কোনো আগাম নোটিশ কিংবা পাওনা টাকা পরিশোধের ন্যূনতম আশ্বাস দেওয়া হয়নি। দীর্ঘ ২১ মাসের উপার্জিত অর্থ বকেয়া রেখে এভাবে শিক্ষকদের বের করে দেওয়ার ঘটনাকে শিক্ষক সমাজ ও স্থানীয় সচেতন মহল চরম অমানবিক ও বেআইনি বলে আখ্যা দিয়েছেন। যে সমাজে শিক্ষককে দেওয়া হয় সর্বোচ্চ সম্মান, সেখানে এই ১২ জন শিক্ষক আজ টিকে থাকার লড়াইয়ে চরম অপমান ও কষ্টের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছেন। দীর্ঘ ২১ মাস বেতন না পাওয়ায় অনেকেই দৈনন্দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা, সন্তানদের স্কুলের ফি, বয়োবৃদ্ধ মা-বাবার ওষুধ ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পারছেন না। ​অনেক শিক্ষক লোকলজ্জা ভুলে আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের কাছ থেকে ধার-দেনা করে সংসার চালাচ্ছিলেন এই আশায় যে, এককালীন বকেয়া টাকা পেলে ঋণ শোধ করবেন। কিন্তু এক লহমায় চাকরি হারিয়ে এবং বকেয়া টাকা না পেয়ে তাঁদের জীবনের গল্প এখন করুণ ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে। অশ্রুসিক্ত চোখে চাকরিচ্যুত খণ্ডকালীন শিক্ষক ওবায়দুর রহমান তাঁর ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ​“বেতন বকেয়া রেখে কোনো চাকরিজীবীকে এভাবে এক রাতের সিদ্ধান্তে চাকরিচ্যুত করার কোনো আইনি বিধান আছে বলে আমাদের জানা নেই। শ্রম ও সেবার ন্যূনতম মূল্য না দিয়ে যদি বের করে দেওয়া হয়, তবে এর দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কীভাবে এড়াবে? আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বমুখী নজরদারি ও মানবিক হস্তক্ষেপ প্রার্থনা করছি।” 


পুরো ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দায়িত্বহীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বকেয়া বেতন ও চাকরিচ্যুতির বিষয়ে হোসেনপুর সরকারি মডেল পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. খায়রুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দায় নেওয়ার বদলে পূর্বসূরিদের দিকে আঙুল তোলেন। ​তিনি জানান, তিনি চলতি বছরের ৪ মার্চ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাই শিক্ষকদের এই ২১ মাসের বকেয়া তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বের সময়ের। তবে তাঁর মেয়াদের বেতনের বিষয়ে তিনি দাবি করেন যে, আগামী ৩১ জানুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে তা পরিশোধের কথা দেওয়া হয়েছে। ​তবে প্রতিষ্ঠানের বকেয়া পরিশোধের আর্থিক উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ জানান, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) অর্থ ও নিরীক্ষা শাখার পরিচালক মশিউর রহমানের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়েছে। মাউশি পরিচালক পরামর্শ দিয়েছেন যে, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ফান্ড থেকে আপাতত এই বকেয়া টাকা পরিশোধ করা যেতে পারে এবং ভবিষ্যতে তহবিলের অর্থ থেকে তা সমন্বয় করা সম্ভব। ​প্রশাসনের এমন মন্থর গতি এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির কারণে ক্ষোভ আরও ঘনীভূত হচ্ছে, কারণ অনাহার ও ঋণে জর্জরিত শিক্ষকদের জন্য ২০২৭ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা সম্পূর্ণ অসম্ভব।

এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জের জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শামছুন নাহার মাকছুদার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি জানান, সাংবাদিকদের মাধ্যমেই তিনি প্রথম বিষয়টি জানতে পেরেছেন। কখন নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, কত দিন তারা চাকরি করেছেন বা কীভাবে ছাঁটাই করা হলো—এর কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য তাঁর কাছে ছিল না। ​তবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের "আগের সময়ের দায়ভার না নেওয়ার" যুক্তিকে কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শামছুন নাহার মাকছুদা বলেন, ​“আগের সময় কি শিক্ষকেরা কাজ করেননি? বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কি তাঁদের সেবা দিতে দেখেননি? প্রতিষ্ঠানের বকেয়া থাকতেই পারে, কিন্তু পদে যিনি আসীন থাকবেন, প্রতিষ্ঠান পরিচালনার যাবতীয় দায়ভার ও বকেয়া মেটানোর দায়িত্ব তাঁকেই নিতে হবে। স্কুল ফান্ডে টাকা থাকলে চাকরিচ্যুত করার আগে বা পরে নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষকদের প্রাপ্য সর্বোচ্চ বকেয়া দ্রুত মিটিয়ে দেওয়া উচিত।”


শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো পবিত্র জায়গায় এ ধরনের চরম অব্যবস্থাপনা ও অমানবিক আচরণে ক্ষুব্ধ স্থানীয় অভিভাবক ও সুশীল সমাজ। শিক্ষক ছাঁটাইয়ের এই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত পুরো হোসেনপুর উপজেলার শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ​ভুক্তভোগী শিক্ষক ও স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ দাবি করেছেন যে অবিলম্বে স্বনামধন্য এই সরকারি প্রতিষ্ঠানের ফান্ড থেকে ১২ জন শিক্ষকের ২১ মাসের বকেয়া বেতন সম্পূর্ণ পরিশোধ করতে হবে। তাছাড়া কোন্ নিয়মে বা কিসের ভিত্তিতে বকেয়া না মিটিয়ে শিক্ষকদের ছাঁটাই করা হলো, সে বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। এছাড়া অন্যায়ভাবে নেওয়া ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে শিক্ষকদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে।


​একদিকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে প্রান্তিক পর্যায়ের সরকারি স্কুলের শিক্ষকেরা ২১ মাস বেতন না পেয়ে বিনাদোষে চাকরি হারাচ্ছেন—এ যেন প্রদীপের নিচেই ঘোর অন্ধকার। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কি দ্রুত হস্তক্ষেপ করে এই ১২টি পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে এগিয়ে আসবে, নাকি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বলিকাঁঠে হারিয়ে যাবে শিক্ষকদের এই দীর্ঘশ্বাস।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ