ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

ভুল করে চুরি, অনুশোচনার চিরকুট লিখে সিলিন্ডার ফেরত দিয়ে গেল চোর!


সৈয়দ মইনুল হোসেন
সৈয়দ মইনুল হোসেন
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৬

ভুল করে চুরি, অনুশোচনার চিরকুট লিখে সিলিন্ডার ফেরত দিয়ে গেল চোর!
নিজের ভুল বুঝতে পেরে পাকুন্দিয়ায় গ্যাস সিলিন্ডার ফেরত দিল চোর।

একটি চিরকুট, একটি ফেরত আসা গ্যাস সিলিন্ডার, আর একরাশ অবাক করা অনুশোচনা—এ নিয়েই এখন সরগরম কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার চরফরাদী গ্রাম। অপরাধের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া মানুষের মধ্যেও যে কখনো কখনো বিবেকের প্রদীপ হঠাৎ জ্বলে উঠতে পারে, তারই এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী নজির দেখাল এই এলাকা। ভুল বুঝতে পেরে চুরি করা মালামাল ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি চিরকুটে ক্ষমা চেয়ে এলাকা ছেড়েছে এক ‘নবিশ’ চোর।

ঘটনার শুরু চার দিন আগে। উপজেলার চরফরাদী মাদ্রাসা মোড়ে অবস্থিত কামাল মিয়ার চায়ের দোকানটিই ছিল তার ছোট সংসারের একমাত্র সম্বল। প্রতিদিনের মতো সেদিনও দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরেছিলেন তিনি। কিন্তু রাতের আঁধারে কে বা কারা হানা দেয় তার দোকানে। চোরেরা দোকান থেকে একটি বড় রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারসহ বেশ কিছু মালামাল নিয়ে চম্পট দেয়। ​সকালে দোকান খুলতেই মাথায় হাত পড়ে দরিদ্র চা-দোকানি কামালের। চুরি হওয়া সিলিন্ডারটি শুধু একটি বস্তু ছিল না, ছিল তার প্রতিদিনের রুটি-রুজির প্রধান হাতিয়ার। নিরুপায় হয়ে কামাল মিয়া স্থানীয় এক স্বেচ্ছাসেবী যুব সংগঠনের কাছে যান এবং বিচারের আকুতি জানান। চুরির ঘটনাটি জানাজানি হতেই গ্রামজুড়ে শুরু হয় তোলপাড়। ছোট এক গ্রামে এমন চুরির ঘটনায় সন্দেহের তীর ঘুরতে থাকে নানাজনকে ঘিরে। মুখরোচক গল্প আর গুজবে ভারী হয়ে ওঠে চরফরাদী মোড়ের বাতাস। নির্দোষ অনেককে নিয়েও শুরু হয় কানাঘুষা। এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য যখন এক অদৃশ্য আশঙ্কায় ভঙ্গ হতে বসেছিল, ঠিক তখনই ঘটে সেই অলৌকিক রূপকথার মতো ঘটনা। হঠাৎ করেই এক ভোরে চরফরাদী মাদ্রাসায় মেলে চুরি যাওয়া সেই বড় গ্যাস সিলিন্ডারটি। তবে শুধু সিলিন্ডারই নয়, তার সঙ্গে সাঁটানো ছিল হাতে লেখা একটি চিঠি—একটি অপরাধীর আত্মদাহ ও অনুশোচনার মহাকাব্যিক দলিল। মাদ্রাসার এক শিক্ষক সিলিন্ডার ও চিরকুটটি দেখতে পেয়ে দ্রুত খবর দেন চা-দোকানি কামাল মিয়াকে। ঘটনা জানাজানি হতেই মাদ্রাসায় ভিড় জমান কৌতুহলী গ্রামবাসী। কাগজের বুকে কালির আঁচড়ে ফুটে উঠেছিল এক মানুষের ভুল স্বীকার আর আত্মশুদ্ধির করুণ আকুতি। চিরকুটে লেখা ছিল, ​‘এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, সর্বপ্রথম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমি কোনো পেশাদার চোর নই। কিন্তু ভুল করে চুরি করে ফেলছি। কাজটি করে আমি অনুতপ্ত এবং ভবিষ্যতে এমন হীন কর্মকাণ্ডে জড়াব না, অঙ্গীকার করছি।’ নিজের অন্যায়ের কারণে গ্রামের নির্দোষ মানুষগুলো যেন বিবাদে না জড়ায়, সেই সামাজিক দায়বদ্ধতার কথাও ফুটে উঠেছে তার লেখায়। ​‘এই চুরির বিষয় নিয়ে এলাকার শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে। বিভিন্ন লোককে দোষারোপ করে বিশৃঙ্খলা তৈরির সম্ভাবনা দেখে জিনিসটি ফেরত দিলাম। দয়া করে জিনিসটি প্রকৃত মালিককে ফেরত দিবেন।’ কীভাবে জিনিসটি ফেরত দেওয়া যায়, তা নিয়ে তার ভাবনার বর্ণনা দিয়ে সে আরও লেখে, ​‘জিনিসটি ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর অনেক ভেবে-চিন্তে দেখলাম, প্রকৃত মালিককে কোন কোন উপায়ে ফেরত দেওয়া যায়। অন্য কোনো উপায়ান্তর না দেখে মাদ্রাসায় রেখে গেলাম। তাছাড়া বিশ্বস্ত কোনো লোক বা উপায় পেলাম না।’ চিঠির শেষাংশে মালিকের পরিচয় নিশ্চিত করে আকুল আবেদন জানিয়ে লেখা হয়, ​‘জিনিসটি ঠাকুরবাড়ির চা দোকানদার কামালের। দয়া করে কাগজটি পেলে দেখে ছিঁড়ে ফেলবেন। ক্ষমাপ্রার্থী।’

একটি চিরকুট এক মুহূর্তে বদলে দিয়েছে পুরো এলাকার প্রেক্ষাপট। চোরকে শাস্তির আওতায় আনার যে সনাতন দাবি থাকে, এখানে তা রূপ নিয়েছে এক মানবিক সহানুভূতির গল্পে। অপরাধের কুৎসিত চেহারার বদলে মানুষ এখন চোরের ভেতরে জেগে ওঠা ‘মানুষটি’কে নিয়ে চর্চা করছে। ​ক্ষতিগ্রস্ত চা-দোকানি কামাল মিয়া স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলেন, “সিলিন্ডারটি হারিয়ে আমি দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু এভাবে তা ফেরত পাব, কখনো ভাবিনি। যে-ই এই কাজ করুক, সে তার ভুল বুঝতে পেরেছে—এটাই সবচেয়ে বড় বিষয়। আমি তাকে মন থেকে ক্ষমা করে দিয়েছি।” স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে স্বীকার করার শক্তি সবার থাকে না। অপরাধী হলেও ওই ব্যক্তি নিজের ভুল বুঝতে পেরে যে সাহসিকতা ও বিবেকের পরিচয় দিয়েছে, তা সত্যিই বিরল। তাদের প্রত্যাশা, এই অনুশোচনা তাকে চিরতরে অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে এনে এক ভালো মানুষ হিসেবে সমাজে বাঁচার পথ দেখাবে।

​চরফরাদীর বাতাসে এখন আর সন্দেহের বিষবাষ্প নেই, আছে কেবল এক পথভুলো মানুষের আলোর পথে ফিরে আসার গল্প।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


ভুল করে চুরি, অনুশোচনার চিরকুট লিখে সিলিন্ডার ফেরত দিয়ে গেল চোর!

প্রকাশের তারিখ : ১৯ আগস্ট ২০২৬

featured Image

একটি চিরকুট, একটি ফেরত আসা গ্যাস সিলিন্ডার, আর একরাশ অবাক করা অনুশোচনা—এ নিয়েই এখন সরগরম কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার চরফরাদী গ্রাম। অপরাধের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া মানুষের মধ্যেও যে কখনো কখনো বিবেকের প্রদীপ হঠাৎ জ্বলে উঠতে পারে, তারই এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী নজির দেখাল এই এলাকা। ভুল বুঝতে পেরে চুরি করা মালামাল ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি চিরকুটে ক্ষমা চেয়ে এলাকা ছেড়েছে এক ‘নবিশ’ চোর।

ঘটনার শুরু চার দিন আগে। উপজেলার চরফরাদী মাদ্রাসা মোড়ে অবস্থিত কামাল মিয়ার চায়ের দোকানটিই ছিল তার ছোট সংসারের একমাত্র সম্বল। প্রতিদিনের মতো সেদিনও দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরেছিলেন তিনি। কিন্তু রাতের আঁধারে কে বা কারা হানা দেয় তার দোকানে। চোরেরা দোকান থেকে একটি বড় রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারসহ বেশ কিছু মালামাল নিয়ে চম্পট দেয়। ​সকালে দোকান খুলতেই মাথায় হাত পড়ে দরিদ্র চা-দোকানি কামালের। চুরি হওয়া সিলিন্ডারটি শুধু একটি বস্তু ছিল না, ছিল তার প্রতিদিনের রুটি-রুজির প্রধান হাতিয়ার। নিরুপায় হয়ে কামাল মিয়া স্থানীয় এক স্বেচ্ছাসেবী যুব সংগঠনের কাছে যান এবং বিচারের আকুতি জানান। চুরির ঘটনাটি জানাজানি হতেই গ্রামজুড়ে শুরু হয় তোলপাড়। ছোট এক গ্রামে এমন চুরির ঘটনায় সন্দেহের তীর ঘুরতে থাকে নানাজনকে ঘিরে। মুখরোচক গল্প আর গুজবে ভারী হয়ে ওঠে চরফরাদী মোড়ের বাতাস। নির্দোষ অনেককে নিয়েও শুরু হয় কানাঘুষা। এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য যখন এক অদৃশ্য আশঙ্কায় ভঙ্গ হতে বসেছিল, ঠিক তখনই ঘটে সেই অলৌকিক রূপকথার মতো ঘটনা। হঠাৎ করেই এক ভোরে চরফরাদী মাদ্রাসায় মেলে চুরি যাওয়া সেই বড় গ্যাস সিলিন্ডারটি। তবে শুধু সিলিন্ডারই নয়, তার সঙ্গে সাঁটানো ছিল হাতে লেখা একটি চিঠি—একটি অপরাধীর আত্মদাহ ও অনুশোচনার মহাকাব্যিক দলিল। মাদ্রাসার এক শিক্ষক সিলিন্ডার ও চিরকুটটি দেখতে পেয়ে দ্রুত খবর দেন চা-দোকানি কামাল মিয়াকে। ঘটনা জানাজানি হতেই মাদ্রাসায় ভিড় জমান কৌতুহলী গ্রামবাসী। কাগজের বুকে কালির আঁচড়ে ফুটে উঠেছিল এক মানুষের ভুল স্বীকার আর আত্মশুদ্ধির করুণ আকুতি। চিরকুটে লেখা ছিল, ​‘এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, সর্বপ্রথম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমি কোনো পেশাদার চোর নই। কিন্তু ভুল করে চুরি করে ফেলছি। কাজটি করে আমি অনুতপ্ত এবং ভবিষ্যতে এমন হীন কর্মকাণ্ডে জড়াব না, অঙ্গীকার করছি।’ নিজের অন্যায়ের কারণে গ্রামের নির্দোষ মানুষগুলো যেন বিবাদে না জড়ায়, সেই সামাজিক দায়বদ্ধতার কথাও ফুটে উঠেছে তার লেখায়। ​‘এই চুরির বিষয় নিয়ে এলাকার শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে। বিভিন্ন লোককে দোষারোপ করে বিশৃঙ্খলা তৈরির সম্ভাবনা দেখে জিনিসটি ফেরত দিলাম। দয়া করে জিনিসটি প্রকৃত মালিককে ফেরত দিবেন।’ কীভাবে জিনিসটি ফেরত দেওয়া যায়, তা নিয়ে তার ভাবনার বর্ণনা দিয়ে সে আরও লেখে, ​‘জিনিসটি ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর অনেক ভেবে-চিন্তে দেখলাম, প্রকৃত মালিককে কোন কোন উপায়ে ফেরত দেওয়া যায়। অন্য কোনো উপায়ান্তর না দেখে মাদ্রাসায় রেখে গেলাম। তাছাড়া বিশ্বস্ত কোনো লোক বা উপায় পেলাম না।’ চিঠির শেষাংশে মালিকের পরিচয় নিশ্চিত করে আকুল আবেদন জানিয়ে লেখা হয়, ​‘জিনিসটি ঠাকুরবাড়ির চা দোকানদার কামালের। দয়া করে কাগজটি পেলে দেখে ছিঁড়ে ফেলবেন। ক্ষমাপ্রার্থী।’

একটি চিরকুট এক মুহূর্তে বদলে দিয়েছে পুরো এলাকার প্রেক্ষাপট। চোরকে শাস্তির আওতায় আনার যে সনাতন দাবি থাকে, এখানে তা রূপ নিয়েছে এক মানবিক সহানুভূতির গল্পে। অপরাধের কুৎসিত চেহারার বদলে মানুষ এখন চোরের ভেতরে জেগে ওঠা ‘মানুষটি’কে নিয়ে চর্চা করছে। ​ক্ষতিগ্রস্ত চা-দোকানি কামাল মিয়া স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলেন, “সিলিন্ডারটি হারিয়ে আমি দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু এভাবে তা ফেরত পাব, কখনো ভাবিনি। যে-ই এই কাজ করুক, সে তার ভুল বুঝতে পেরেছে—এটাই সবচেয়ে বড় বিষয়। আমি তাকে মন থেকে ক্ষমা করে দিয়েছি।” স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে স্বীকার করার শক্তি সবার থাকে না। অপরাধী হলেও ওই ব্যক্তি নিজের ভুল বুঝতে পেরে যে সাহসিকতা ও বিবেকের পরিচয় দিয়েছে, তা সত্যিই বিরল। তাদের প্রত্যাশা, এই অনুশোচনা তাকে চিরতরে অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে এনে এক ভালো মানুষ হিসেবে সমাজে বাঁচার পথ দেখাবে।


​চরফরাদীর বাতাসে এখন আর সন্দেহের বিষবাষ্প নেই, আছে কেবল এক পথভুলো মানুষের আলোর পথে ফিরে আসার গল্প।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ