সকালের স্নিগ্ধ রোদ তখন কেবলই শহরের রাজপথ ছুঁয়েছে। দশ বছরের ফুটফুটে শিশু তুহিন প্রতিদিনের মতোই নিজের ছোট্ট বাইসাইকেলটি চেপে বের হয়েছিল বন্ধুর বাড়ি যাবে বলে। কিন্তু কে জানত, এই চাকার আবর্তেই লুকিয়ে আছে জীবনের শেষ গন্তব্য! শুক্রবার (২৪ জুলাই) সকাল ১০টা ২০ মিনিটের দিকে কিশোরগঞ্জ শহরের গাইটাল আবদুল ওয়াহেদ জনতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সড়কে ঘাতক এক সিমেন্টবোঝাই ট্রাক কেড়ে নেয় চতুর্থ শ্রেণির এই অবুঝ প্রাণটি। তবে নিয়তির নিষ্ঠুরতম পরিহাসের গল্পটি এখানেই শেষ নয়, যে ঘাতক ট্রাক নিষ্পাপ শিশুটির জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছিল, তার নিথর দেহটি উদ্ধার করতে ডিউটির খাতিরে ঘটনাস্থলে ছুটে যান এক পুলিশ কনস্টেবল। আর সেখানে গিয়েই সেই বাবা মুখোমুখি হন স্বীয় সন্তানের রক্তভেজা নিথর দেহের।
নিহত শিশুর নাম তুহিন (১০)। সে শহরের আবদুল ওয়াহেদ জনতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। তার পিতা সামসুল হক কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় কনস্টেবল হিসেবে কর্মরত। তাদের মূল বাড়ি প্রতিবেশী নেত্রকোনা জেলা সদরে হলেও চাকরির সুবাদে পরিবার নিয়ে তিনি কিশোরগঞ্জেই বসবাস করছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সকালে বাসা থেকে হাসিমুখে সাইকেল নিয়ে বের হয়েছিল তুহিন। গাইটাল জনতা স্কুল রোডে পৌঁছাতেই পেছন থেকে আসা একটি দ্রুতগামী সিমেন্ট বোঝাই ট্রাক তাকে নির্মমভাবে পিষে দেয়। ভারী চাকার তলায় নিষ্পেষিত হয়ে মুহূর্তের মধ্যেই রক্তাপ্লুত হয়ে পড়ে শিশুটি। আশপাশের মানুষ দ্রুত উদ্ধার করতে ছুটে এলেও ততক্ষণে পৃথিবীর সব মায়া কাটিয়ে দূর পরপারে পাড়ি জমায় তুহিন।
অন্যদিকে, সড়ক দুর্ঘটনার খবর পেয়েই রুটিন ডিউটির অংশ হিসেবে থানা থেকে দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে যান কনস্টেবল সামসুল। তিনি তখনো ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেননি, কোন নির্মম নিয়তি অপেক্ষা করছে তার জন্য। তিনি ভেবেছিলেন, দেশের আরও দশটা নাগরিকের সুরক্ষায় যেমনটা করেন, আজকেও হয়তো কোনো এক অচেনা শিশুর দুর্ঘটনাকবলিত লাশ উদ্ধার করতে যাচ্ছেন। কিন্তু দুর্ঘটনাস্থলে জমে থাকা ভিড় ঠেলে রক্তে ভেজা দেহটির ওপর থেকে কাপড় সরাতেই থমকে যায় সময়, স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো চারপাশ। নিজের চোখের সামনে দেখতে পান নিজের বুকজুড়ে থাকা স্নেহের তুহিনের চেনা মুখখানি!
এক মুহূর্তেই একজন কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তা রূপ নেন এক বাকরুদ্ধ, বুকভাঙা পিতায়। নিথর সন্তানের হাত দুটি ধরে রাজপথেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তাঁর সেই বুকফাটা আর্তনাদ ও করুণ চিৎকারে উপস্থিত সর্বস্তরের মানুষ ও সহকর্মী পুলিশ সদস্যদের চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। পুরো গাইটাল এলাকা জুড়ে যেন শোকের এক স্তব্ধ নীরবতা নেমে আসে।
ঘটনার মর্মান্তিকতায় শোকাহত কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম ভূঞা বলেন, "কনস্টেবল সামসুল আমাদের থানার একজন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ও দায়িত্বশীল সদস্য। প্রতিদিনের মতো আজকেও খবর পেয়ে তিনি পেশাগত দায়িত্বে দুর্ঘটনাস্থলে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে নিজের সন্তানের লাশ শনাক্ত করার মতো যে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির মুখোমুখি তিনি হয়েছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এই অপূরণীয় ক্ষতি ও শোকে আমরা পুরো পুলিশ পরিবার গভীরভাবে মর্মাহত।" ওসি আরও জানান, শিশু তুহিনের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ঘাতক সিমেন্টবোঝাই ট্রাকটিকে পুলিশ জব্দ করতে সক্ষম হলেও চালক কৌশলে পালিয়ে গেছে। চালককে গ্রেপ্তারে সাঁড়াশি অভিযান চলছে এবং এ বিষয়ে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ জুলাই ২০২৬
সকালের স্নিগ্ধ রোদ তখন কেবলই শহরের রাজপথ ছুঁয়েছে। দশ বছরের ফুটফুটে শিশু তুহিন প্রতিদিনের মতোই নিজের ছোট্ট বাইসাইকেলটি চেপে বের হয়েছিল বন্ধুর বাড়ি যাবে বলে। কিন্তু কে জানত, এই চাকার আবর্তেই লুকিয়ে আছে জীবনের শেষ গন্তব্য! শুক্রবার (২৪ জুলাই) সকাল ১০টা ২০ মিনিটের দিকে কিশোরগঞ্জ শহরের গাইটাল আবদুল ওয়াহেদ জনতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সড়কে ঘাতক এক সিমেন্টবোঝাই ট্রাক কেড়ে নেয় চতুর্থ শ্রেণির এই অবুঝ প্রাণটি। তবে নিয়তির নিষ্ঠুরতম পরিহাসের গল্পটি এখানেই শেষ নয়, যে ঘাতক ট্রাক নিষ্পাপ শিশুটির জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছিল, তার নিথর দেহটি উদ্ধার করতে ডিউটির খাতিরে ঘটনাস্থলে ছুটে যান এক পুলিশ কনস্টেবল। আর সেখানে গিয়েই সেই বাবা মুখোমুখি হন স্বীয় সন্তানের রক্তভেজা নিথর দেহের।
নিহত শিশুর নাম তুহিন (১০)। সে শহরের আবদুল ওয়াহেদ জনতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। তার পিতা সামসুল হক কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় কনস্টেবল হিসেবে কর্মরত। তাদের মূল বাড়ি প্রতিবেশী নেত্রকোনা জেলা সদরে হলেও চাকরির সুবাদে পরিবার নিয়ে তিনি কিশোরগঞ্জেই বসবাস করছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সকালে বাসা থেকে হাসিমুখে সাইকেল নিয়ে বের হয়েছিল তুহিন। গাইটাল জনতা স্কুল রোডে পৌঁছাতেই পেছন থেকে আসা একটি দ্রুতগামী সিমেন্ট বোঝাই ট্রাক তাকে নির্মমভাবে পিষে দেয়। ভারী চাকার তলায় নিষ্পেষিত হয়ে মুহূর্তের মধ্যেই রক্তাপ্লুত হয়ে পড়ে শিশুটি। আশপাশের মানুষ দ্রুত উদ্ধার করতে ছুটে এলেও ততক্ষণে পৃথিবীর সব মায়া কাটিয়ে দূর পরপারে পাড়ি জমায় তুহিন।
অন্যদিকে, সড়ক দুর্ঘটনার খবর পেয়েই রুটিন ডিউটির অংশ হিসেবে থানা থেকে দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে যান কনস্টেবল সামসুল। তিনি তখনো ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেননি, কোন নির্মম নিয়তি অপেক্ষা করছে তার জন্য। তিনি ভেবেছিলেন, দেশের আরও দশটা নাগরিকের সুরক্ষায় যেমনটা করেন, আজকেও হয়তো কোনো এক অচেনা শিশুর দুর্ঘটনাকবলিত লাশ উদ্ধার করতে যাচ্ছেন। কিন্তু দুর্ঘটনাস্থলে জমে থাকা ভিড় ঠেলে রক্তে ভেজা দেহটির ওপর থেকে কাপড় সরাতেই থমকে যায় সময়, স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো চারপাশ। নিজের চোখের সামনে দেখতে পান নিজের বুকজুড়ে থাকা স্নেহের তুহিনের চেনা মুখখানি!
এক মুহূর্তেই একজন কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তা রূপ নেন এক বাকরুদ্ধ, বুকভাঙা পিতায়। নিথর সন্তানের হাত দুটি ধরে রাজপথেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তাঁর সেই বুকফাটা আর্তনাদ ও করুণ চিৎকারে উপস্থিত সর্বস্তরের মানুষ ও সহকর্মী পুলিশ সদস্যদের চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। পুরো গাইটাল এলাকা জুড়ে যেন শোকের এক স্তব্ধ নীরবতা নেমে আসে।
ঘটনার মর্মান্তিকতায় শোকাহত কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম ভূঞা বলেন, "কনস্টেবল সামসুল আমাদের থানার একজন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ও দায়িত্বশীল সদস্য। প্রতিদিনের মতো আজকেও খবর পেয়ে তিনি পেশাগত দায়িত্বে দুর্ঘটনাস্থলে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে নিজের সন্তানের লাশ শনাক্ত করার মতো যে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির মুখোমুখি তিনি হয়েছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এই অপূরণীয় ক্ষতি ও শোকে আমরা পুরো পুলিশ পরিবার গভীরভাবে মর্মাহত।" ওসি আরও জানান, শিশু তুহিনের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ঘাতক সিমেন্টবোঝাই ট্রাকটিকে পুলিশ জব্দ করতে সক্ষম হলেও চালক কৌশলে পালিয়ে গেছে। চালককে গ্রেপ্তারে সাঁড়াশি অভিযান চলছে এবং এ বিষয়ে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন