মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী ও নোবেলজয়ী অং সান সু চিকে ২০২২ সালে সামরিক আদালতে শুনানির শেষ পর্বের পর আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। প্রায় চার বছর ধরে বন্দি থাকা এই নেত্রীর বর্তমান অবস্থা ও অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তার পরিবার, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক এবং আঞ্চলিক নেতারা সু চি জীবিত আছেন কি না, তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ (প্রুফ অব লাইফ) প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।
৮১ বছর বয়সী সু চির ছোট ছেলে কিম আরিস সম্প্রতি লন্ডনে এক অনুষ্ঠানে বলেন, তার মা কার্যত জনসমক্ষ থেকে "নিখোঁজ" হয়ে গেছেন। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে সু চির আইনজীবীদেরও তার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। ফলে তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
মিয়ানমারের সামরিক সরকার চলতি বছরের শুরুতে দাবি করেছিল, সু চিকে কারাগার থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি রাখা হয়েছে। তবে সেই দাবির পক্ষে তারা কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। জান্তা সরকারের প্রকাশ করা একটি ছবিতে সু চিকে এক পুলিশ ও এক সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেলেও ছবিটি কবে তোলা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
কিম আরিস ওই ছবির সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তার দাবি, এটি সাম্প্রতিক সময়ের ছবি কি না, তা যাচাই করার কোনো উপায় নেই। এছাড়া নেপিডোতে সু চির সরকারি বাসভবন ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং ইয়াঙ্গুনের পুরোনো বাড়িতেও তাকে রাখা হয়নি বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। ফলে তিনি বর্তমানে কোথায় আছেন, সেটিও অজানা।
সু চির বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। গত মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমারের জান্তা প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের কাছে সু চির প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। এর আগে মে মাসে জাতিসংঘের বিশেষ দূত জুলি বিশপও সু চির সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি চেয়েছিলেন। তবে এখন পর্যন্ত জান্তা সরকার এসব অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
কূটনীতিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সু চির নাম উচ্চারণ করা হলে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং বিরক্তি প্রকাশ করেন। ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আসিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাম্প্রতিক বৈঠকেও সু চির স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সু চিকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখা সামরিক সরকারের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। তারা মনে করেন, সু চি মুক্তি পেলে জান্তাবিরোধী বিভিন্ন সশস্ত্র ও গণতন্ত্রপন্থী গোষ্ঠীর মধ্যে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সু চির নেতৃত্বে অহিংস গণআন্দোলন আবারও জোরদার হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে, যা জান্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
দীর্ঘদিন বন্দি থাকলেও মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের কাছে সু চির জনপ্রিয়তা এখনো অটুট। গত ১৯ জুন তার ৮১তম জন্মদিনে জান্তার কড়াকড়ি উপেক্ষা করে অনেক সমর্থক গোপনে তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে প্রার্থনা করেন।
বর্তমানে মিয়ানমারের বিভিন্ন কারাগারে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার রাজনৈতিক বন্দি রয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর অবহেলা ও চিকিৎসার অভাবে অন্তত ৬০ জন রাজনৈতিক বন্দির মৃত্যু হয়েছে। কিম আরিস শুধু তার মায়ের মুক্তির দাবিই নয়, বরং এসব রাজনৈতিক বন্দির দুর্দশার বিষয়টিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরছেন।
এদিকে সু চির দীর্ঘ অনুপস্থিতির মধ্যেই ঘটে গেছে একটি আবেগঘন ঘটনা। ২০১০ সালে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার পর কিম আরিস তার মাকে 'তাইচিতো' নামে একটি পোষা কুকুর উপহার দিয়েছিলেন। প্রায় ১৫ বছর ধরে সু চির ফেরার অপেক্ষায় থাকা সেই কুকুরটি গত মাসে মারা গেছে। ঘটনাটি সু চির দীর্ঘ বন্দিদশা ও পরিবারের বিচ্ছিন্নতার প্রতীক হিসেবে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুলাই ২০২৬
মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী ও নোবেলজয়ী অং সান সু চিকে ২০২২ সালে সামরিক আদালতে শুনানির শেষ পর্বের পর আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। প্রায় চার বছর ধরে বন্দি থাকা এই নেত্রীর বর্তমান অবস্থা ও অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তার পরিবার, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক এবং আঞ্চলিক নেতারা সু চি জীবিত আছেন কি না, তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ (প্রুফ অব লাইফ) প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।
৮১ বছর বয়সী সু চির ছোট ছেলে কিম আরিস সম্প্রতি লন্ডনে এক অনুষ্ঠানে বলেন, তার মা কার্যত জনসমক্ষ থেকে "নিখোঁজ" হয়ে গেছেন। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে সু চির আইনজীবীদেরও তার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। ফলে তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
মিয়ানমারের সামরিক সরকার চলতি বছরের শুরুতে দাবি করেছিল, সু চিকে কারাগার থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি রাখা হয়েছে। তবে সেই দাবির পক্ষে তারা কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। জান্তা সরকারের প্রকাশ করা একটি ছবিতে সু চিকে এক পুলিশ ও এক সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেলেও ছবিটি কবে তোলা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
কিম আরিস ওই ছবির সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তার দাবি, এটি সাম্প্রতিক সময়ের ছবি কি না, তা যাচাই করার কোনো উপায় নেই। এছাড়া নেপিডোতে সু চির সরকারি বাসভবন ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং ইয়াঙ্গুনের পুরোনো বাড়িতেও তাকে রাখা হয়নি বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। ফলে তিনি বর্তমানে কোথায় আছেন, সেটিও অজানা।
সু চির বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। গত মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমারের জান্তা প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের কাছে সু চির প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। এর আগে মে মাসে জাতিসংঘের বিশেষ দূত জুলি বিশপও সু চির সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি চেয়েছিলেন। তবে এখন পর্যন্ত জান্তা সরকার এসব অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
কূটনীতিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সু চির নাম উচ্চারণ করা হলে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং বিরক্তি প্রকাশ করেন। ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আসিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাম্প্রতিক বৈঠকেও সু চির স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সু চিকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখা সামরিক সরকারের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। তারা মনে করেন, সু চি মুক্তি পেলে জান্তাবিরোধী বিভিন্ন সশস্ত্র ও গণতন্ত্রপন্থী গোষ্ঠীর মধ্যে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সু চির নেতৃত্বে অহিংস গণআন্দোলন আবারও জোরদার হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে, যা জান্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
দীর্ঘদিন বন্দি থাকলেও মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের কাছে সু চির জনপ্রিয়তা এখনো অটুট। গত ১৯ জুন তার ৮১তম জন্মদিনে জান্তার কড়াকড়ি উপেক্ষা করে অনেক সমর্থক গোপনে তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে প্রার্থনা করেন।
বর্তমানে মিয়ানমারের বিভিন্ন কারাগারে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার রাজনৈতিক বন্দি রয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর অবহেলা ও চিকিৎসার অভাবে অন্তত ৬০ জন রাজনৈতিক বন্দির মৃত্যু হয়েছে। কিম আরিস শুধু তার মায়ের মুক্তির দাবিই নয়, বরং এসব রাজনৈতিক বন্দির দুর্দশার বিষয়টিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরছেন।
এদিকে সু চির দীর্ঘ অনুপস্থিতির মধ্যেই ঘটে গেছে একটি আবেগঘন ঘটনা। ২০১০ সালে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার পর কিম আরিস তার মাকে 'তাইচিতো' নামে একটি পোষা কুকুর উপহার দিয়েছিলেন। প্রায় ১৫ বছর ধরে সু চির ফেরার অপেক্ষায় থাকা সেই কুকুরটি গত মাসে মারা গেছে। ঘটনাটি সু চির দীর্ঘ বন্দিদশা ও পরিবারের বিচ্ছিন্নতার প্রতীক হিসেবে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া।

আপনার মতামত লিখুন