টানা কয়েক দিনের অবিরাম বৃষ্টিতে নারায়ণগঞ্জের জনজীবন অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রচণ্ড গরম থেকে নগরবাসী কিছুটা স্বস্তি পেলেও সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষ। জলাবদ্ধতা, কাদা আর রাস্তায় মানুষের চলাচল কমে যাওয়ায় দিনমজুর, রিকশাচালক ও ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয়-রোজগার প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বৃষ্টির কারণে সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছেন দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল শ্রমজীবী মানুষ। দিনের উপার্জন দিয়েই যাদের সংসার চলে, তাদের কাছে টানা বর্ষণ যেন নতুন এক দুঃসহ বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নগরীর চাষাঢ়া এলাকায় ঝুড়িতে করে কলা বিক্রি করেন ৬০ বছর বয়সী দুলাল। ২০১০ সালে বরিশাল থেকে পরিবার নিয়ে নারায়ণগঞ্জে আসেন তিনি। ছেলে একটি গার্মেন্টসে চাকরি করলেও সংসারের বাড়তি খরচ মেটাতে এই বয়সেও রাস্তায় নেমে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে তাকে।
দুলাল বলেন, "বৃষ্টির কারণে কাস্টমার একদম নেই। আগে পুলিশ লাইনের পাশে একটি ফাস্টফুডের দোকানে কাজ করতাম। ব্যবসা কমে যাওয়ায় এখন কলা বিক্রি করছি। কিন্তু এই বৃষ্টিতে সেটাও ঠিকমতো করতে পারছি না।"
একই চিত্র দেখা যায় চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে। সেখানে মানিব্যাগ বিক্রি করেন কিশোর হকার রাজিব। টানা দুই দিনের বৃষ্টিতে নিয়মিত দোকানই খুলতে পারেননি তিনি। দোকান বাঁচাতে একটি বড় ছাতা প্রয়োজন হলেও সেটি কেনার সামর্থ্য নেই।
রাজিবের ভাষায়, "আগে দিনে দুই থেকে তিন হাজার টাকার বিক্রি হতো। এখন তা নেমে এসেছে দেড় থেকে দুই হাজার টাকায়। একটা বড় ছাতা খুব দরকার। আজ যদি এক হাজার আর কাল পাঁচশ টাকা আয় করতে পারি, তাহলে ছাতাটা কিনব।"
বৃষ্টির দুর্ভোগের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে নগরীর করিম মার্কেট এলাকায়। সেখানে বিকল হয়ে যাওয়া একটি ব্যাটারিচালিত মিশুক একাই টেনে গ্যারেজে নিয়ে যাচ্ছিলেন ষাটোর্ধ্ব তাইজুল ইসলাম। কুমিল্লা থেকে এসে আট বছর ধরে নারায়ণগঞ্জে বসবাস করছেন তিনি। দীর্ঘ ২০ বছর রিকশা চালানোর পর বয়সের ভারে এখন মিশুক চালিয়েই সংসার চালান।
তিনি জানান, দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে গাড়ির পিকআপ ও মোটরে পানি ঢুকে মিশুকটি বিকল হয়ে যায়। এরপর প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে একাই সেটি গ্যারেজে নেওয়ার চেষ্টা করেন। অন্য চালকদের ১০০ থেকে ১৫০ টাকা ভাড়া দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও হাঁটুসমান পানির কারণে কেউ সাহায্য করতে রাজি হননি।
তাইজুল ইসলাম বলেন, "আজ সারাদিনে মাত্র ১২০ টাকা আয় করেছি। অথচ প্রতিদিন গ্যারেজ মালিককে ৫০০ টাকা জমা দিতে হয়। আজ জমার টাকাই উঠেনি।"
অশ্রুসজল চোখে তিনি আরও বলেন, "ঘরে স্ত্রী অসুস্থ, মেয়েরা মাদ্রাসায় পড়ে। পুরো সংসারটাই এই মিশুকের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। আমার কোনো ছেলে নেই যে এসে সাহায্য করবে। আজ বৃষ্টি আমার সেই রোজগারও কেড়ে নিয়েছে।"
শুধু দুলাল, রাজিব কিংবা তাইজুল ইসলাম নন, টানা বর্ষণে নারায়ণগঞ্জের হাজারো নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন-জীবিকা এখন চরম অনিশ্চয়তায়। বিভিন্ন সড়কে পানি জমে থাকায় মানুষের চলাচল কমে গেছে। ফলে ফুটপাতের ব্যবসা থেকে শুরু করে রিকশা ও মিশুক চালানো, দিনমজুরের কাজ, সব ক্ষেত্রেই নেমে এসেছে স্থবিরতা।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, প্রতিদিনের আয় দিয়েই তাদের পরিবারের খাবার জোটে। তাই একদিন কাজ না থাকলে বা আয় কমে গেলে পুরো পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হয়।
তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত আবহাওয়া স্বাভাবিক হবে, পানি নেমে যাবে এবং আবারও প্রাণ ফিরে পাবে নগরীর কর্মচাঞ্চল্য। সেই সঙ্গে সচল হবে খেটে খাওয়া মানুষের জীবিকার চাকা।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুলাই ২০২৬
টানা কয়েক দিনের অবিরাম বৃষ্টিতে নারায়ণগঞ্জের জনজীবন অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রচণ্ড গরম থেকে নগরবাসী কিছুটা স্বস্তি পেলেও সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষ। জলাবদ্ধতা, কাদা আর রাস্তায় মানুষের চলাচল কমে যাওয়ায় দিনমজুর, রিকশাচালক ও ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয়-রোজগার প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বৃষ্টির কারণে সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছেন দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল শ্রমজীবী মানুষ। দিনের উপার্জন দিয়েই যাদের সংসার চলে, তাদের কাছে টানা বর্ষণ যেন নতুন এক দুঃসহ বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নগরীর চাষাঢ়া এলাকায় ঝুড়িতে করে কলা বিক্রি করেন ৬০ বছর বয়সী দুলাল। ২০১০ সালে বরিশাল থেকে পরিবার নিয়ে নারায়ণগঞ্জে আসেন তিনি। ছেলে একটি গার্মেন্টসে চাকরি করলেও সংসারের বাড়তি খরচ মেটাতে এই বয়সেও রাস্তায় নেমে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে তাকে।
দুলাল বলেন, "বৃষ্টির কারণে কাস্টমার একদম নেই। আগে পুলিশ লাইনের পাশে একটি ফাস্টফুডের দোকানে কাজ করতাম। ব্যবসা কমে যাওয়ায় এখন কলা বিক্রি করছি। কিন্তু এই বৃষ্টিতে সেটাও ঠিকমতো করতে পারছি না।"
একই চিত্র দেখা যায় চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে। সেখানে মানিব্যাগ বিক্রি করেন কিশোর হকার রাজিব। টানা দুই দিনের বৃষ্টিতে নিয়মিত দোকানই খুলতে পারেননি তিনি। দোকান বাঁচাতে একটি বড় ছাতা প্রয়োজন হলেও সেটি কেনার সামর্থ্য নেই।
রাজিবের ভাষায়, "আগে দিনে দুই থেকে তিন হাজার টাকার বিক্রি হতো। এখন তা নেমে এসেছে দেড় থেকে দুই হাজার টাকায়। একটা বড় ছাতা খুব দরকার। আজ যদি এক হাজার আর কাল পাঁচশ টাকা আয় করতে পারি, তাহলে ছাতাটা কিনব।"
বৃষ্টির দুর্ভোগের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে নগরীর করিম মার্কেট এলাকায়। সেখানে বিকল হয়ে যাওয়া একটি ব্যাটারিচালিত মিশুক একাই টেনে গ্যারেজে নিয়ে যাচ্ছিলেন ষাটোর্ধ্ব তাইজুল ইসলাম। কুমিল্লা থেকে এসে আট বছর ধরে নারায়ণগঞ্জে বসবাস করছেন তিনি। দীর্ঘ ২০ বছর রিকশা চালানোর পর বয়সের ভারে এখন মিশুক চালিয়েই সংসার চালান।
তিনি জানান, দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে গাড়ির পিকআপ ও মোটরে পানি ঢুকে মিশুকটি বিকল হয়ে যায়। এরপর প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে একাই সেটি গ্যারেজে নেওয়ার চেষ্টা করেন। অন্য চালকদের ১০০ থেকে ১৫০ টাকা ভাড়া দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও হাঁটুসমান পানির কারণে কেউ সাহায্য করতে রাজি হননি।
তাইজুল ইসলাম বলেন, "আজ সারাদিনে মাত্র ১২০ টাকা আয় করেছি। অথচ প্রতিদিন গ্যারেজ মালিককে ৫০০ টাকা জমা দিতে হয়। আজ জমার টাকাই উঠেনি।"
অশ্রুসজল চোখে তিনি আরও বলেন, "ঘরে স্ত্রী অসুস্থ, মেয়েরা মাদ্রাসায় পড়ে। পুরো সংসারটাই এই মিশুকের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। আমার কোনো ছেলে নেই যে এসে সাহায্য করবে। আজ বৃষ্টি আমার সেই রোজগারও কেড়ে নিয়েছে।"
শুধু দুলাল, রাজিব কিংবা তাইজুল ইসলাম নন, টানা বর্ষণে নারায়ণগঞ্জের হাজারো নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন-জীবিকা এখন চরম অনিশ্চয়তায়। বিভিন্ন সড়কে পানি জমে থাকায় মানুষের চলাচল কমে গেছে। ফলে ফুটপাতের ব্যবসা থেকে শুরু করে রিকশা ও মিশুক চালানো, দিনমজুরের কাজ, সব ক্ষেত্রেই নেমে এসেছে স্থবিরতা।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, প্রতিদিনের আয় দিয়েই তাদের পরিবারের খাবার জোটে। তাই একদিন কাজ না থাকলে বা আয় কমে গেলে পুরো পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হয়।
তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত আবহাওয়া স্বাভাবিক হবে, পানি নেমে যাবে এবং আবারও প্রাণ ফিরে পাবে নগরীর কর্মচাঞ্চল্য। সেই সঙ্গে সচল হবে খেটে খাওয়া মানুষের জীবিকার চাকা।

আপনার মতামত লিখুন