ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

পরিবর্তনের প্রতীক থেকে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু বালেন শাহ


নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২৬

পরিবর্তনের প্রতীক থেকে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু বালেন শাহ
ছবি: সংগৃহীত

ক্ষমতায় আসার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র (বালেন) শাহ তীব্র জনঅসন্তোষের মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে যে ‘জেন জি’ বা তরুণ প্রজন্ম তাকে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে ক্ষমতায় এনেছিল, তারাই এখন সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছে।

বস্তি উচ্ছেদ অভিযান, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং পার্কিং নিয়ে বিরোধের জেরে এক রাইড-শেয়ারিং চালকের আত্মাহুতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানী কাঠমান্ডুসহ বিভিন্ন এলাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

রোববার (১২ জুলাই) রাজধানীর সিংহদরবার সচিবালয়ের সামনে শত শত বিক্ষোভকারী সমবেত হয়ে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে গরিব মানুষের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধ, মানবাধিকার নিশ্চিত, অবৈধ গ্রেফতার বন্ধ এবং উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানানো হয়।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গত ২৭ মার্চ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বালেন শাহের রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) বিপুল জনসমর্থন নিয়ে প্রতিনিধি সভায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে।

প্রথাগত রাজনীতির বাইরে নতুন নেতৃত্বের প্রত্যাশায় তরুণরা বালেন শাহকে বেছে নিয়েছিল। তবে ক্ষমতায় আসার মাত্র ১০০ দিনের মাথায় সেই আস্থায় বড় ধরনের ভাটা পড়েছে।

বর্তমান অসন্তোষের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে নদীতীরবর্তী অবৈধ বস্তি উচ্ছেদ অভিযানকে। কাঠমান্ডু উপত্যকার নদীতীর এলাকায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভূমিহীন পরিবার বসবাস করে। নেপালের আইন অনুযায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ করা যায় না। কিন্তু উচ্ছেদ হওয়া ২ হাজার ৬০০ পরিবারের মধ্যে মাত্র ৩২৫টি পরিবার অস্থায়ী আশ্রয় পেয়েছে।

এরপর গত ২ জুলাই আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা বাকি পরিবারগুলোকেও সেখান থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। উচ্ছেদের প্রতিবাদে অংশ নেওয়া কয়েকজন যুব অধিকারকর্মীকে গ্রেফতার করার ঘটনায় নাগরিক সমাজও সরকারের সমালোচনায় সরব হয়। তাদের অভিযোগ, সরকারের পদক্ষেপ সংবিধান ও নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী।

এরই মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয় পার্কিং সংক্রান্ত বিরোধে এক তরুণ রাইড-শেয়ারিং চালকের মৃত্যুর ঘটনা। কাঠমান্ডুর পাসপোর্ট দপ্তরের সামনে জরিমানা নিয়ে মিউনিসিপ্যাল পুলিশের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে ২৫ বছর বয়সী গণেশ নেপালি নিজের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

ঘটনার পর দগ্ধ অবস্থায় তাকে স্ট্রেচারের বদলে সাধারণ গাড়িতে হাসপাতালে নেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। পরে প্রশাসন নিহতের পরিবারের সঙ্গে ৯ দফা সমঝোতা এবং তদন্ত কমিটি গঠনের আশ্বাস দিলেও জনরোষ কমেনি। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছে।

নির্বাচনের আগে বালেন শাহ প্রশাসন সুশাসন ও অর্থনৈতিক সংস্কারের লক্ষ্যে ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে সমালোচকদের দাবি, সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বরং দুর্নীতি দমন ও উচ্ছেদের নামে আইনি প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ উঠছে।

এ ছাড়া নির্বাচনের পর নিজের নির্বাচনী এলাকায় না যাওয়া এবং সংসদীয় কার্যক্রমে অনিয়মিত উপস্থিতি নিয়েও সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

যে তরুণ প্রজন্ম একসময় বালেন শাহকে নেপালের নতুন আশার প্রতীক হিসেবে দেখেছিল, আজ সেই তরুণদের বড় একটি অংশই তার প্রশাসনের কর্তৃত্ববাদী আচরণের অভিযোগ তুলে রাজপথে আন্দোলনে নেমেছে।

সূত্র: ফার্স্টপোস্ট।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


পরিবর্তনের প্রতীক থেকে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু বালেন শাহ

প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুলাই ২০২৬

featured Image

ক্ষমতায় আসার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র (বালেন) শাহ তীব্র জনঅসন্তোষের মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে যে ‘জেন জি’ বা তরুণ প্রজন্ম তাকে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে ক্ষমতায় এনেছিল, তারাই এখন সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছে।

বস্তি উচ্ছেদ অভিযান, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং পার্কিং নিয়ে বিরোধের জেরে এক রাইড-শেয়ারিং চালকের আত্মাহুতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানী কাঠমান্ডুসহ বিভিন্ন এলাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

রোববার (১২ জুলাই) রাজধানীর সিংহদরবার সচিবালয়ের সামনে শত শত বিক্ষোভকারী সমবেত হয়ে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে গরিব মানুষের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধ, মানবাধিকার নিশ্চিত, অবৈধ গ্রেফতার বন্ধ এবং উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানানো হয়।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গত ২৭ মার্চ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বালেন শাহের রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) বিপুল জনসমর্থন নিয়ে প্রতিনিধি সভায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে।

প্রথাগত রাজনীতির বাইরে নতুন নেতৃত্বের প্রত্যাশায় তরুণরা বালেন শাহকে বেছে নিয়েছিল। তবে ক্ষমতায় আসার মাত্র ১০০ দিনের মাথায় সেই আস্থায় বড় ধরনের ভাটা পড়েছে।

বর্তমান অসন্তোষের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে নদীতীরবর্তী অবৈধ বস্তি উচ্ছেদ অভিযানকে। কাঠমান্ডু উপত্যকার নদীতীর এলাকায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভূমিহীন পরিবার বসবাস করে। নেপালের আইন অনুযায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ করা যায় না। কিন্তু উচ্ছেদ হওয়া ২ হাজার ৬০০ পরিবারের মধ্যে মাত্র ৩২৫টি পরিবার অস্থায়ী আশ্রয় পেয়েছে।

এরপর গত ২ জুলাই আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা বাকি পরিবারগুলোকেও সেখান থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। উচ্ছেদের প্রতিবাদে অংশ নেওয়া কয়েকজন যুব অধিকারকর্মীকে গ্রেফতার করার ঘটনায় নাগরিক সমাজও সরকারের সমালোচনায় সরব হয়। তাদের অভিযোগ, সরকারের পদক্ষেপ সংবিধান ও নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী।

এরই মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয় পার্কিং সংক্রান্ত বিরোধে এক তরুণ রাইড-শেয়ারিং চালকের মৃত্যুর ঘটনা। কাঠমান্ডুর পাসপোর্ট দপ্তরের সামনে জরিমানা নিয়ে মিউনিসিপ্যাল পুলিশের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে ২৫ বছর বয়সী গণেশ নেপালি নিজের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

ঘটনার পর দগ্ধ অবস্থায় তাকে স্ট্রেচারের বদলে সাধারণ গাড়িতে হাসপাতালে নেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। পরে প্রশাসন নিহতের পরিবারের সঙ্গে ৯ দফা সমঝোতা এবং তদন্ত কমিটি গঠনের আশ্বাস দিলেও জনরোষ কমেনি। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছে।

নির্বাচনের আগে বালেন শাহ প্রশাসন সুশাসন ও অর্থনৈতিক সংস্কারের লক্ষ্যে ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে সমালোচকদের দাবি, সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বরং দুর্নীতি দমন ও উচ্ছেদের নামে আইনি প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ উঠছে।

এ ছাড়া নির্বাচনের পর নিজের নির্বাচনী এলাকায় না যাওয়া এবং সংসদীয় কার্যক্রমে অনিয়মিত উপস্থিতি নিয়েও সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

যে তরুণ প্রজন্ম একসময় বালেন শাহকে নেপালের নতুন আশার প্রতীক হিসেবে দেখেছিল, আজ সেই তরুণদের বড় একটি অংশই তার প্রশাসনের কর্তৃত্ববাদী আচরণের অভিযোগ তুলে রাজপথে আন্দোলনে নেমেছে।

সূত্র: ফার্স্টপোস্ট।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ